ছোটবেলায় মহেশ বাবু। এক্স থেকে
ছোটবেলায় মহেশ বাবু। এক্স থেকে

সেদিনের ছোট শিশুটি আজ বড় তারকা, ৪০০ কোটি টাকার মালিক

তাঁর সিনেমা মানেই ‘বড় কিছু’। পর্দায় নায়কোচিত উপস্থিতি, অ্যাকশন থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকের বিনোদনের জন্য সবকিছুই থাকে। দর্শকেরাও নিরাশ করেন না; নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই হলে ভিড় করেন। এই দক্ষিণি তারকা আর কেউ নন, মহেশ বাবু। আজ এই অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ার।

শুরুর গল্প
মহেশ বাবুর জন্ম ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট, চেন্নাইয়ে। তবে তাঁর শিকড় পশ্চিম তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশে। অভিনয় যেন রক্তেই ছিল তাঁর। বাবা ঘট্টামানেনি কৃষ্ণা ছিলেন তেলেগু ছবির সুপরিচিত অভিনেতা, যিনি প্রায় ৩৫০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। বড় ভাই রমেশ বাবু ছিলেন অভিনেতা ও পরবর্তী সময়ে প্রযোজক। শুধু পরিবার নয়, তাঁর শৈশবের বন্ধুরাও আজ দক্ষিণের তারকা। যেমন অভিনেতা বিজয়, যিনি তামিল সিনেমার পোস্টারবয় বলে খ্যাত। আর কার্তিক শিবকুমারকে তো সবাই এক নামে চেনেন। এই দুই তারকা মহেশ বাবুর স্কুল জীবনের বন্ধু।

চার বছর বয়সে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান মহেশ। বাবার প্রযোজনায় নির্মিত ‘নিদ’ (১৯৭৯) ছবিতে ছোট্ট এক চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর একে একে শিশুশিল্পী হিসেবে আরও আটটি ছবিতে কাজ করেন। তখন থেকেই তাঁর সংলাপ মুখস্থ করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল।

২০ বছরের বেশি রাজত্ব
একজন অভিনেতার ক্যারিয়ার যদি তাঁর ছবির সংখ্যা, হিটের পরিমাণ, দর্শকের ভালোবাসা আর পুরস্কার দিয়ে মাপা হয়, তাহলে মহেশ বাবু নিঃসন্দেহে সেরা সারির তারকাদের একজন। তিনি অভিনয় করেছেন ৬০টির বেশি ছবিতে। উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে ‘মুরারি’, ‘অথাডু’, ‘পোকিরি’, ‘বিজু’, ‘ডোকাডু’, ‘সীতামা ভাকিতলো সিরিমাল্লে চেট্টু’, ‘ব্রহ্মোৎসবম’, ‘ভারসুডু’, ‘মহর্ষি’, ‘সারিলেরু নিকেভভারু’ প্রভৃতি । ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পোকিরি’ ছবিটি পরবর্তী সময়ে সালমান খানের ‘ওয়ান্টেড’ নামে হিন্দিতে রিমেক হয়। অথচ মহেশ বাবু নিজে এখনো একটিও রিমেক ছবিতে অভিনয় করেননি, এটি ব্যতিক্রমী রেকর্ড। মহেশ বাবু পেয়েছেন ৯টি নন্দী অ্যাওয়ার্ড, যা তেলেগু ছবির সর্বোচ্চ সম্মান। এ ছাড়া পেয়েছেন পাঁচটি ফিল্মফেয়ার সাউথ অ্যাওয়ার্ড, তিনটি সাউথ ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল মুভি অ্যাওয়ার্ড, একটি আইফা পুরস্কারসহ অনেক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

মহেশ বাবু। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

ভক্তদের আদরের প্রিন্স
মহেশ বাবু মানেই এক স্টাইল স্টেটমেন্ট। ঝলমলে কোনো কিছু নয়; বরং তাঁর সৌম্য চেহারা, সংযত অভিনয় আর দারুণ স্ক্রিন প্রেজেন্সই তাঁকে করেছে অন্য রকম। ভক্তরা আদর করে তাঁকে ডাকেন ‘প্রিন্স’। কেউ বলেন ‘তেলেগু ছবির রাজপুত্র’। ২০১০ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ‘৫০ মোস্ট ডিজায়ারেবল মেন অব ইন্ডিয়া’ তালিকায় মহেশ বাবুর অবস্থান ছিল ১২ নম্বরে। এক বছর পরের তালিকায় তিনি পেছনে ফেলেছিলেন হৃতিক রোশন, সালমান খান ও শাহরুখ খানদের। ২০১৯ সালে তিনি হয়ে ওঠেন প্রথম তেলেগু অভিনেতা, যাঁর মোমের মূর্তি স্থান পায় মাদাম তুসো মিউজিয়ামে।

ভাষা জানেন না, তবু রাজত্ব
একটি চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হলো, তাঁর মাতৃভাষা তেলেগু হলেও মহেশ বাবু পড়তে বা লিখতে পারেন না এই ভাষা। ছোটবেলা থেকে চেন্নাইয়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়েছেন, ফলে তামিল ও ইংরেজিতেই দক্ষতা গড়ে ওঠে তাঁর; কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামাতে পারেনি।

২০১০ সালে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ‘৫০ মোস্ট ডিজায়ারেবল মেন অব ইন্ডিয়া’ তালিকায় মহেশ বাবুর অবস্থান ছিল ১২ নম্বরে। এক বছর পরের তালিকায় তিনি পেছনে ফেলেছিলেন হৃতিক রোশন, সালমান খান ও শাহরুখ খানদের। তিনি শুনে শুনেই সংলাপ মুখস্থ করেন এবং সাবলীলভাবে ক্যামেরার সামনে বলেন। তাঁর উচ্চারণে কোথাও ত্রুটি ধরা পড়ে না, এটাই বড় কৃতিত্ব। এই তারকার ১৮টির বেশি ছবি হিন্দিতে ডাব হয়েছে। অনেক সময় হিন্দি চ্যানেলে তাঁর ছবি প্রচারিত হলে টিআরপি থাকে একদম শীর্ষে। কিছু ছবির টিভি ভিউয়ারশিপ হিন্দি মূল ছবিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
নায়ক হিসেবে মহেশ যতটা জনপ্রিয়, ব্যক্তিজীবনে তিনি ততটাই বিনয়ী ও দায়িত্বশীল। বিভিন্ন সময় সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন মহেশ। শিশুস্বাস্থ্য, ক্যানসার চিকিৎসা, গ্রামীণ শিক্ষায় সহায়তা, নারী অধিকার—সবখানেই তাঁর ছোঁয়া রয়েছে।

মহেশ বাবু। ইনস্টাগ্রাম থেকে

রঙিন পর্দার বাইরেও মানবিক মানুষ
নায়ক হিসেবে তিনি যতটা জনপ্রিয়, ব্যক্তিজীবনে তিনি ততটাই বিনয়ী ও দায়িত্বশীল। বিভিন্ন সময় সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন মহেশ। শিশুস্বাস্থ্য, ক্যানসার চিকিৎসা, গ্রামীণ শিক্ষায় সহায়তা, নারী অধিকার—সবখানেই তাঁর ছোঁয়া রয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে তেলেঙ্গানার দুটি স্কুল এবং অন্ধ্র প্রদেশের দুটি হাসপাতালের জন্য বিশাল অঙ্কের অনুদান দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী নম্রতা শিরোদকার নিজেও সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় এবং তাঁরা দুজন মিলে গড়েছেন হিল স্পিরিট ফাউন্ডেশন।

ভারতের তেলেঙ্গানার একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় মহেশের নাম। প্রতিষ্ঠানটির শুভেচ্ছাদূত ছিলেন তিনি। অভিযোগ ওঠে, তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে অনেকেই সেখানে বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি।

কত টাকার মালিক মহেশ বাবু
মহেশ বাবুর মোট সম্পদের নির্ভুল সরকারি হিসাব প্রকাশিত হয়নি। তাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘নেট ওয়ার্থ’ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশি টাকায় তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকার বেশি। তাঁর আয়ের বড় উৎস সিনেমার পারিশ্রমিক ও বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন ভারতীয় প্রতিবেদনে ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট থেকে তাঁর আয়ের বড় অঙ্কের কথা বলা হয়েছে।

২০১৪ সালে মহেশ বাবু প্রতিষ্ঠা করেন জি মহেশ বাবু এন্টারটেইনমেন্ট। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে ‘শ্রীমন্তুডু’, ‘মেজর’, ‘সারিলেরু নেক্কেভারু’র মতো সিনেমায় তিনি যুক্ত ছিলেন। ব্যবসার আরেকটি বড় ক্ষেত্র সিনেমা প্রদর্শন। ২০১৮ সালে এশিয়ান সিনেমাসের সঙ্গে অংশীদারত্বে তিনি হায়দরাবাদে এএমবি সিনেমাস চালু করেন। এটি একটি প্রিমিয়াম মাল্টিপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে ‘এএমবি ক্লাসিক’ নামেও নতুন মাল্টিপ্লেক্স চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বিতর্কেও নাম
আর দশজন ভারতীয় তারকার মতো মহেশ বাবুকেও বিতর্ক ছাড়েনি। সম্প্রতি ভারতের তেলেঙ্গানার একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় মহেশের নাম। প্রতিষ্ঠানটির শুভেচ্ছাদূত ছিলেন তিনি। অভিযোগ ওঠে, তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে অনেকেই সেখানে বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। ইডির (ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) পক্ষ থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল; কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর সহযোগিতার কথাও জানানো হয়েছে।

‘বারানসি’ সিনেমায় মহেশ বাবু। এক্স থেকে

রাজামৌলির সঙ্গে আড়ম্বরযাত্রা
সব বিতর্ক পাশ কাটিয়ে বর্তমানে মহেশ বাবু আলোচনায় এসেছেন ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছবির কারণে। ‘বাহুবলী’খ্যাত এস এস রাজামৌলি পরিচালনা করছেন নতুন সিনেমা ‘বারানসি’। মহেশ বাবুর সঙ্গে এই সিনেমায় আছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারন। মহেশ বাবু অভিনয় করছেন রুদ্র চরিত্রে। ছবিটির গল্পের বিস্তারও সাধারণ ভারতীয় সিনেমার তুলনায় অনেক বড়। ভারতের পাশাপাশি অ্যান্টার্কটিকা, আফ্রিকা ও প্রাচীন রোমের মতো বিভিন্ন সময় ও স্থানের প্রেক্ষাপটে গল্প এগিয়েছে বলে পরিচালক রাজামৌলি জানিয়েছেন। ছবিটির বড় অংশ আইম্যাক্স ফরম্যাটে ধারণ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ছবিটির নতুন দুটি স্থিরচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত এসব ছবিতে মহেশ বাবুর রুদ্র চরিত্রকে রাজামৌলি বর্ণনা করেছেন বুদ্ধিদীপ্ত, সংবেদনশীল এবং একই সঙ্গে দুর্ধর্ষ হিসেবে।

‘বারানসি’কে ঘিরে এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে এটি শুধু অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা নয়; সময় ও ভূগোলের বিস্তৃত পরিসরে তৈরি এক মহাকাব্যিক অভিযান। নতুন প্রকাশিত কাহিনি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রুদ্রকে পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ এক গ্রহাণু-হুমকির মুখোমুখি হতে দেখা যাবে। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মান্দাকিনীর ভূমিকায়। আর পৃথ্বীরাজ অভিনয় করছেন প্রযুক্তিবিদ ভিলেন কুম্ভ চরিত্রে।

রাজামৌলির সিনেমায় যেমন বড় পরিসরের অ্যাকশন, আবেগ, পৌরাণিক ইঙ্গিত ও দর্শনীয় ভিজ্যুয়াল থাকে, ‘বারানসি’তেও তারই আরও বড় আয়োজন দেখা যেতে পারে। ছবিটির শুটিং এখনো চলছে। জুলাইয়ে রাজামৌলি জানিয়েছিলেন, বড় অ্যাকশন অংশের শুটিং শেষ হলেও আরও প্রায় ৮০ দিনের শুটিং বাকি ছিল। ছবিটি ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির লক্ষ্যে এগোচ্ছে।

ইন্ডিয়া টুডে ও ডেকান ক্রনিকল অবলম্বনে