তিনি আর দশটা তারকার চেয়ে আলাদা। ছবির প্রচারে সেভাবে পাওয়া যায় না, সাক্ষাৎকার দেন না বললেই চলে। পর্দার বাইরে তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। এই সময়ে এসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগ দিয়েছেন মাত্র বছর কয়েক আগে। সেখানেও তাঁর উপস্থিতি সক্রিয় নয়। এমনকি সিনেমার স্টিলের বাইরে তাঁর ছবিও পাওয়া যায় না। সেই বিজয় যখন রাজনীতিতে যোগ দিলেন, অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। রাজনীতি মানেই তো যোগাযোগ, বক্তৃতা, সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া। নিজেকে একরকম খোলসবন্দী করে রাখা, বিজয় কি সেটা পারবেন? তিনি যে পেরেছেন, সেটা নিশ্চয় এতক্ষণে জানা হয়ে গেছে আপনার। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পথে বিজয়ের দল। তিনিই হয়তো রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হবেন। নায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী, চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়ের জীবন যেন সিনেমার মতোই।
শিশুশিল্পী থেকে নায়ক
টানা ৩৩ বছর অভিনয় করেছেন। ১৯৮০-এর দশকে শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু। ১৯৯২ সালে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। প্রথম ছবি ব্যর্থ হলেও থেমে যাননি। পরবর্তী তিন দশকে প্রায় ৭০টি ছবিতে অভিনয় করে তিনি ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
লাইট-সাউন্ড-ক্যামেরা-অ্যাকশন শব্দগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন তিনি। ১০ বছর বয়সে তামিল চলচ্চিত্র ‘ভেত্রি’তে শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন থালাপতি বিজয়। ১৮ বছর বয়সে ‘নালাইয়া থেরপু’ (১৯৯২) ছবিতে প্রথম নায়ক তিনি। ‘পুভ উনাক্কাগা’, ‘কাধলুক্কু মারিয়াধাই’, ‘থুল্লাথা মানামুম থুল্লুম’, ‘কুশি’, ‘প্রিয়মানভালে’, ‘থিরুমলাই’, ‘ঘিলি’, ‘থিরুপাচি’, ‘পোক্কিরি’, ‘থুপ্পাক্কি’, ‘মারসেল’, ‘সরকার’, ‘মাস্টার’ একের পর ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
বিশ্লেষণ করলে তাঁর ক্যারিয়ারের সিনেমাকে নানাভাবে ভাগ করা যায়। নব্বইয়ের দশকে তিনি ছিলেন রোমান্টিক নায়ক।
২০০০-এর দশক: ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’, ২০১২-এর পর থেকে পর্দায় তাঁকে দেখা গেছে সমাজ বদলের নায়ক হিসেবেই। এই সময়ে ‘কাথি’-তে কৃষকের দুর্দশা, ‘মারসেল’-এ স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, ‘বিগিল’-এ খেলাধুলায় নারীদের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। এসব বিষয় তুলে ধরে তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক বার্তার নায়ক হয়ে ওঠেন।
কত টাকার মালিক বিজয়
তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে দেওয়া হলফনামায় উঠে এসেছে তাঁর আর্থিক অবস্থার বিস্তারিত চিত্র। হলফনামা অনুযায়ী, বিজয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ ৬০৩ কোটি রুপি। বিজয়ের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মধ্যে বড় অংশই অস্থাবর—প্রায় ৪০৪ দশমিক ৫৮ কোটি রুপি। বাকি ১৯৮ দশমিক ৬২ কোটি রুপি স্থাবর সম্পদ। তাঁর সম্পদের তালিকায় রয়েছে কোদাইকানালে কৃষিজমি আর চেন্নাইসহ বিভিন্ন জায়গায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক সম্পত্তি। নগদ অর্থ হিসেবে হাতে রয়েছে প্রায় দুই লাখ রুপি। পাশাপাশি ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে জমা রয়েছে ২১৩ কোটির বেশি। সোনা-রুপার অলংকারও আছে—মোট ৮৮৩ গ্রাম, যার মূল্য প্রায় ১৫ লাখ রুপি। বিলাসবহুল গাড়ির তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বিএমডব্লিউ, টয়োটার কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিজয়ের মোট আয় ছিল ১৮৪ দশমিক ৫৩ কোটি রুপি। তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে স্বনিযুক্ত কাজ, সুদের আয় এবং সম্পত্তি থেকে ভাড়া। হলফনামায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে—বিজয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ব্যক্তিগত ঋণ দিয়েছেন। এর মধ্যে স্ত্রী সংগীতাকে দিয়েছেন ১২ দশমিক ৬ কোটি রুপি। এ ছাড়া তাঁর বাবা এস এ চন্দ্রশেখর, মা শোভা শেখর, ছেলে জেসন সঞ্জয় এবং মেয়ে দিব্যা সাশাকেও ঋণ দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রসঙ্গে বিজয় উল্লেখ করেছেন, ১৯৮৯ ও ১৯৯১ সালে যথাক্রমে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণি পাস করেন। পরে বিএসসি পড়তে ভর্তি হলেও সেই পড়াশোনা শেষ করেননি।
বিজয় দক্ষিণি ছবির অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক অর্জনকারী অভিনেতা ছিলেন। ছবিপ্রতি ২৫ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিতেন।
সিনেমা থেকেই রাজনীতির ভিত
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয় রাজনীতিতে নামার অনেক আগেই তাঁর সিনেমা সেই প্রস্তুতি তৈরি করে দিয়েছে। তাঁর ছবির অডিও প্রকাশের অনুষ্ঠান হয়ে উঠত ‘সফট রাজনৈতিক ভাষণ’। ভক্তকুল—যাঁরা আগে শুধু সিনেমা উদ্যাপন করত, ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে। ২০১০-এর দশকের শেষ এবং ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে তাঁর সমালোচনা এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান।
ভক্তদের সঙ্গে সভা এবং নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে পরীক্ষার চাপ, তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আলোচনা হতে থাকে। এ কথাগুলো নতুন ভোটার ও শহরের স্বপ্নবান তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
ভক্তদের শক্তি: উৎসব থেকে ভোটে? বিজয়ের ভক্তরা আলাদা মাত্রার। মধ্যরাতের শো, কাটআউটে দুধ ঢালা, ঢাক-ঢোল সব মিলিয়ে তাঁর সিনেমা মুক্তি যেন এক সামাজিক উৎসব। এই আবেগ কি ভোটে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। এম জে রামচন্দ্রন অভিনেতা হিসেবে যে ভক্তকুল পেয়েছিলেন, তাঁদের ভালোবাসাকে রাজনীতিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। পরে জনকল্যাণমূলক কাজ করে ভোটারদের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন তিনি।
এর পর থেকে কোনো অভিনেতাই লাখ লাখ ভক্ত নিয়েও নির্বাচনের সেই শেষ বৈতরণি পার হতে পারেননি। এমনকি জয়ললিতার মতো বড় তারকাও নিজে কোনো নতুন দল গড়ে মুখ্যমন্ত্রী হননি। বরং তিনি এমজিআরের গড়া দল সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগামের (এআইএডিএমকে) উত্তরাধিকারী হয়ে দলটিকে আরও সুসংহত করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের একক নিয়ন্ত্রণে এনে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। এবার সেই অচলায়তন ভাঙছেন থালাপতি বিজয়। তাঁর এই উত্থান অবাক করার মতো। কারণ, খুব অল্প সময়ে ও সুপরিকল্পিতভাবে তিনি এই জায়গায় পৌঁছেছেন। আগের অভিনেতাদের মতো তিনি অভিনয়জগৎকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতির ময়দানে নামেননি।
কেন সিনেমা ছাড়লেন বিজয়
বিজয়ের যুক্তি স্পষ্ট—রাজনীতি আংশিকভাবে করা যায় না। জনগণ পূর্ণ সময়ের নেতা চায়। তামিল রাজনীতির ইতিহাসও সেটাই বলে। এমজিআর ও জয়ললিতা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অভিনয় ছেড়েছিলেন। বিপরীতে কমল হাসানের মতো যাঁরা একসঙ্গে সিনেমা ও রাজনীতি করেছেন, তাঁদের সাফল্য সীমিত। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বিজয়ের সিদ্ধান্ত—পুরোদমে রাজনীতি। মালয়েশিয়ায় এইচ বিনোথের ‘জানা নায়গান’ ছবির গানমুক্তির অনুষ্ঠানে এই অবসরের ঘোষণা করেন বিজয়। তাই ‘জানা নায়গান’ অভিনেতার শেষ ছবি হতে চলেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মঞ্চে গানের তালে কোমরও দোলান তিনি। সেদিন নীরবতা ভেঙে অনেক কথাই বলেন তিনি। অভিনয়জীবন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বিজয় জানান, ৩৩ বছর ধরে তিনি সমালোচনার শিকার। নানা সমালোচকদের আক্রমণ সামলেছেন। ‘নেতিবাচক-ইতিবাচক—সব ধরনের সমালোচনার তির বিঁধেছে আমাকে। পাশাপাশি, ভক্তদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। তাঁদের মুখ চেয়েই আমি এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম।’ অভিনেতা-রাজনীতিবিদের কথায়, ‘অনুরাগীরা ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। তাই আগামী ৩৩ বছর তাঁদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি রাজনীতিবিদ হিসেবে বাকি জীবন কাটাতে চাইছি। আমাকে ভক্তদের ঋণ শোধ করতে হবে।’
তামিলনাড়ুর এবারের ভোটারদের বড় অংশ জেন–জেড। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনীতিতে ক্লান্ত এই তরুণদের একটি অংশ নতুন বিকল্প হিসেবে বিজয়কে দেখছে।
‘জানা নায়াগান’: সিনেমা নাকি রাজনৈতিক বার্তা? আগামী ৮ মে প্রায় ৫ হাজার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাওয়া ‘জানা নায়াগান’ বা ‘জনগণের নায়ক’ শুধু একটি সিনেমা নয়—এটি যেন রাজনৈতিক ঘোষণা। ছবিতে আছে জাঁকজমকপূর্ণ অ্যাকশন, ভিএফএক্স, আর সংলাপ—‘রাজনীতিতে এসেছি লুটপাট করতে নয়, সেবা করতে।’ এই সংলাপ যেন সরাসরি বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। মুক্তির আগে অবশ্য সিনেমাটি বারবার পিছিয়েছে। ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ড আপত্তি জানিয়েছে, নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এমনকি মুক্তির আগে সিনেমাটির এইচডি প্রিন্টও ফাঁস হয়েছে অনলাইনে। তবু ভক্তের উৎসাহে কমতি নেই। বিজয়ের দল যদি সত্যই জিতে যায়, সিনেমাটি দেখতে নিশ্চিতভাবে ভিড় করবেন ভক্তরা। ‘জন নায়গান’–এ জনগণের নায়ককে দেখতে।
বিবিসি, এনডিটিভি ও আইএমডিবি অবলম্বনে