
তাঁর হয়তো শাহরুখ খান, সালমান খানের মতো তারকাখ্যাতি নেই, কিন্তু কমেডি থেকে শুরু করে নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রে রাজপাল যাদবের যা অভিনয়, তাতে তাঁকে সমীহ না করে উপায় কী! সম্প্রতি দেনার দায়ে অভিনেতাকে জেলে যেতে হয়েছে। এই প্রথম নয়; বৈচিত্র্যময় জীবনে এর আগেও জেল খেটেছেন রাজপাল যাদব।
শুরুর গল্প
১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ ভারতের উত্তর প্রদেশের কুন্দ্রায় জন্ম রাজপাল যাদবের। ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে অভিনয়ের পাঠ নিয়ে রাজপাল টিভি সিরিয়াল দিয়ে অভিনয় শুরু করেন। ২০০০ সালে রামগোপাল ভার্মার ‘জংলি’ সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান।
পরে কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। গত দুই যুগে তাঁকে দেখা গেছে ‘মুঝছে শাদি করোগি’, ‘ফির হেরা ফিরি’, ‘পার্টনার’, ‘কৃশ ৩’, ‘ভুল ভুলাইয়া ২’, ‘মালামাল উইকলি’ ইত্যাদি সিনেমা দিয়ে পরিচিতি পান। তবে অভিনয়ের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। ব্যক্তিগত জীবনেও পড়েছেন নানা সংকটের মধ্যে।
স্ত্রীর মৃত্যু, নতুন সংগ্রাম
রাজপালের প্রথম স্ত্রী যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর। সাক্ষাৎকারে তাঁকে বলতে শোনা যায়, তাঁর প্রথম কন্যাসন্তান জন্মের পরেই তাঁর স্ত্রী মারা যান। অভিনয়ে ২৫ বছর পূর্ণ করা উপলক্ষে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য লাল্লানটপের সঙ্গে কথা বলেছিলেন অভিনেতা। সেখানেই তিনি এ তথ্য জানান। রাজপাল বলেন, ‘আগেকার দিনে আপনি যদি একটা ঠিকঠাক চাকরি পেয়ে যান, তাহলেই পরিবার আপনার বিয়ে দিয়ে দিত। আমারও তা-ই হয়েছিল।
বাবা বিয়ে দিয়ে দেন ২০ বছর বয়সেই। আমার প্রথম স্ত্রী বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে মারা যান। আমার পরের দিন ওকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। আর সেদিন আমি ওর লাশ কাঁধে নিয়ে শ্মশানে যাই। তবে আমার পরিবারকে, আমার মাকে, আমার শ্যালিকাকে অনেক ধন্যবাদ আমার মা মরা মেয়েটাকে ভালোবেসে বড় করার জন্য। ওকে মায়ের অভাব বুঝতে না দেওয়ার জন্য।’
এ সাক্ষাৎকারেই রাজপাল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রাধা যাদব সম্পর্কে কথা বলেন, যাঁকে রাজপাল বিয়ে করেন ২০০৩ সালে। রাজপাল বলেন, ‘আমি কোনো দিন ওকে বলে দিইনি—শাড়ি পরো বা অন্য কিছু। আমি আমার মায়ের সঙ্গে যেভাবে কথা বলি, ও নিজেও সেভাবে কথা বলে। ও নিজে থেকে আমাদের গ্রামের ভাষা শিখেছে। ওকে গ্রামে দেখলে কেউ বুঝতেও পারবে না যে ও পাঁচটা ভাষা জানে। একদিন গ্রামে গিয়ে দেখি, ও মুখ ঢেকে বসে আছে। আসলে গ্রামের কিছু নিজস্ব নিয়মনীতি আছে। ও সেগুলো মেনে চলে। আমার গুরুর পর আমার মা–বাবা, আর তারপর ও আমাকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছে। ১০০ শতাংশ। রাধা আমার প্রথম স্ত্রী থেকে আমার যে মেয়ে আছে, তাকেও ও নিজের করে নিয়েছে। এখন সেই মেয়ে বিয়ে করে লক্ষ্ণৌতে সংসার করছে। আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। সবটা আমার পরিবারের আর আমার স্ত্রীর। আমি শুধু মাধ্যমমাত্র।’
জেলজীবন
এর আগেও রাজপালের আছে জেল খাটার অভিজ্ঞতাও। ২০১৮ সালে ৫ কোটি টাকা ঋণ শোধ করতে না পারার জন্য তিন মাসের জন্য জেলে গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন মাস পর যখন জেল থেকে বের হচ্ছিলাম, জেল কর্তৃপক্ষ ও কর্মীরা আমাকে একটির পরিবর্তে দুটি সার্টিফিকেট দিয়েছিল। তিনি বলেন, জায়গাটি খুবই ঐতিহাসিক এবং আমরা সারা জীবনে আপনার মতো কাউকে দেখিনি। আমরা আপনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হই। আমরা ভেবেছিলাম, প্রতিদিন আপনার কাছ থেকে অভিযোগ শুনব। কিন্তু এই তিন মাসে আপনি এই দেয়ালগুলোকে জীবন দিয়েছেন।’
আবার জেলে
২০১০ সালে রাজপাল যাদব তাঁর পরিচালনায় প্রথম ছবি ‘আতা পাতা লাপাতা’ নির্মাণের জন্য দিল্লিভিত্তিক মুরলি প্রোজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে ৫ কোটি রুপি ঋণ নেন। ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এর ফলে ঋণ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয় এবং শুরু হয় আইনি লড়াই।
ঋণ পরিশোধের অংশ হিসেবে দেওয়া সাতটি চেক বাউন্স হওয়ার পর, ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে একটি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী রাজপাল যাদব ও তাঁর স্ত্রী রাধা যাদবকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত তাঁদের ছয় মাসের সাধারণ কারাদণ্ড দেন। ২০১৯ সালের শুরুতে একটি সেশনস কোর্টও এই রায় বহাল রাখেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ রাজপাল যাদব দুটি ডিমান্ড ড্রাফটের মাধ্যমে ৭৫ লাখ রুপি জমা দেন। কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এটি মোট দায়ের তুলনায় খুবই সামান্য। এরপর গত ডিসেম্বরে ৪০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন অভিনেতা। তিনি জানান যে ২০২৬ সালের শুরুতে বাকি টাকা শোধ করে দেবেন। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই পূরণ করা হয়নি।
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে রাজপালের আইনজীবী নতুন করে ২৫ লাখ রুপির চেক এবং নতুন পরিশোধসূচি প্রস্তাব করেন। কিন্তু আদালত আত্মসমর্পণের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। সেদিনই বিকেল চারটায় রাজপাল যাদব তিহার জেলে আত্মসমর্পণ করেন; তাঁর ছয় মাসের সাজা কার্যকর হয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে