
বলিউডের কোনো তারকা জিম থেকে বের হচ্ছেন। হাতে হয়তো কফির কাপ, পরনে সাধারণ পোশাক। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সামনে হাজির ক্যামেরা। তারকা হয়তো একবার তাকালেন, হালকা হাত নাড়লেন, তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। দর্শকের চোখে পুরো ঘটনাটি ১০ সেকেন্ডের বেশি নয়। কিন্তু ওই ১০ সেকেন্ডের ছবি বা ভিডিও পেতে একজন পাপারাজ্জিকে হয়তো পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। কখনো মোটরবাইকে ছুটতে হয়েছে মুম্বাইয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, কখনো না খেয়ে থাকতে হয়েছে, কখনো শেষ হয়ে গেছে মুঠোফোনের চার্জ। কোনো কোনো দিন আবার তারকার বাড়ির সামনে রাত কাটাতে হয়েছে।
ইনস্টাগ্রাম ও শর্ট ভিডিওর যুগে পাপারাজ্জি–সংস্কৃতি বদলে গেছে আমূল। একসময় তারকাদের ছবি তোলা হতো মূলত পত্রিকা বা ওয়েবসাইটের জন্য। এখন সেটিই হয়ে উঠেছে দ্রুতগতির এক কনটেন্ট ব্যবসা। তিন সেকেন্ডের একটি ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে লাখো মানুষের পর্দায়। বিমানবন্দরে তারকার পোশাক হয়ে উঠতে পারে খবরের শিরোনাম। জিম থেকে বের হওয়ার দৃশ্য পেতে পারে লাখো ভিউ।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতটা স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয় এই দৃশ্যগুলো, বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে বেশ গোছানো এক ব্যবস্থা—পিআর টিমের ফোন, নির্দিষ্ট লোকেশন, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ক্যামেরার দল, বেতন, ব্র্যান্ড প্রচার, চলচ্চিত্রের বিপণন এবং কখনো কখনো তারকা ও পাপারাজ্জিদের মধ্যে অলিখিত কিছু সমঝোতা।
ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে মুম্বাইয়ের কয়েকজন পাপারাজ্জির সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছে, এই ব্যবসা আসলে কীভাবে চলে। আট বছরের বেশি সময় ধরে এ পেশায় থাকা বিশাল এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন পাপারাজ্জির অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে বলিউডের এমন এক জগতের গল্প, যা দর্শকের চোখের সামনে প্রতিদিন ঘটলেও এর ভেতরের হিসাব খুব কমই জানা যায়।
শুরুটা হয় তারকার অবস্থান জানা দিয়ে
ইনস্টাগ্রামে কোনো তারকাকে হঠাৎ দেখা গেলেই যে পাপারাজ্জিরা সেখানে পৌঁছে যান, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিশালের ভাষ্য, বর্তমানে প্রায় প্রতিটি তারকারই আলাদা পিআর টিম আছে। তারাই অনেক সময় পাপারাজ্জিদের ফোন করে জানায়, কোথায় কখন তারকাকে পাওয়া যেতে পারে।
তবে শুধু ফোনের অপেক্ষায় বসে থাকলে চলে না। পাপারাজ্জিদের নিজেদেরও খোঁজখবর রাখতে হয়। আগে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ও জুহু ছিল তারকাদের আনাগোনার প্রধান এলাকা। এখন সেই তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আন্ধেরিও। কোন তারকা কোন জিমে যান, কখন যান, কোন গাড়িতে চলাফেরা করেন—এসব তথ্য পাপারাজ্জিদের কাজেরই অংশ।
বিশালের পাঁচ সদস্যের একটি দল আছে। কখনো কোনো তারকার বাড়ির সামনে গাড়ি আছে কি না, সেটি দেখে তাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেন, তারকা বাড়িতে আছেন কি না। বান্দ্রার তারকাপ্রিয় ক্যাফেগুলোও তাঁদের নজরে থাকে। তারকা সেখানে যাবেন—এমন খবর কেউ না দিলেও কোন ক্যাফেতে কারা আসেন, কোন গাড়ি কার, এসব তাঁরা জানেন।
অর্থাৎ, পাপারাজ্জিদেরও নিজস্ব ‘বিট’ আছে। পার্থক্য হলো, পুলিশের মতো থানার সামনে বসে নয়, তাঁদের হয়তো কোনো জিমের বাইরে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় একজন তারকা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য বেরিয়ে আসবেন বলে।
পাপারাজ্জিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক তারকার পিআর টিমই তাঁদের নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে নেয়। তবে তথ্যের মাত্রা সব সময় এক রকম হয় না। কখনো নির্দিষ্ট ঠিকানা জানানো হয়, কখনো শুধু বলা হয় তারকা বিমানবন্দরে থাকবেন, আবার কখনো কোনো তথ্যই দেওয়া হয় না।
কাজটিও এখন আর শুধু ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রথমে ওয়েবসাইটের জন্য ছবি, পরে ইনস্টাগ্রামের জন্য মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও, আর এখন ফোরকে ক্যামেরায় তোলা ক্লোজআপ ফুটেজের চাহিদা বেড়েছে। বিশাল দাবি করেন, তারকাদের ফোরকে কাভারেজ শুরু করার ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ।
ফোরকে ফুটেজে তারকার মুখের মেকআপ, ত্বকের খুঁটিনাটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। দর্শকের কাছে এটি আকর্ষণীয় হলেও তারকাদের একটি অংশ এতে বিরক্ত। বিশালের দাবি, করিশমা কাপুর ও টেলিভিশন অভিনেত্রী মাহিরা শর্মার মতো তারকারা এ ধরনের অতিরিক্ত জুম করা কাভারেজ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে ফোরকে ক্যামেরার আরেকটি সমস্যা আছে। মুঠোফোনের মতো এটি মুহূর্তেই চালু করে ছবি তোলা যায় না। ক্যামেরা প্রস্তুত করতে সময় লাগে। ফলে পাপারাজ্জিদের হাতে সুযোগ থাকে মাত্র তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ডের।
‘এই তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ডের খেলায়’ তারকাকে ওই সময়ের মধ্যে ক্যামেরায় ধরতে পারলেই সাফল্য। না হলে পুরো অপেক্ষাই বৃথা। বৃষ্টি নামলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়।
তিন সেকেন্ডের তারকা, পাঁচ ঘণ্টার অপেক্ষা
এই সময়ের তারকাসংস্কৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্যগুলোর একটি হলো—তারকা ক্যামেরার সামনে এসেও যেন ক্যামেরাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। একবার তাকালেন, সামান্য হাত নাড়লেন, তারপর চলে গেলেন। কখনো এমনও হয়, যে তারকা ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চান না বলে মনে হচ্ছে, তিনিই আগে পাপারাজ্জিদের খবর দিয়েছেন।
বিশালের মতে, এখন ‘পোজ না দেওয়া’ বা ক্যামেরাকে উপেক্ষা করে চলে যাওয়াও একধরনের ট্রেন্ড। একসময় বড় তারকারাই এমন করতেন। এখন অপেক্ষাকৃত নতুন প্রজন্মের অভিনেতারাও একই কৌশল অনুসরণ করছেন। কারণ, অনলাইনে এ ধরনের ভিডিও অনেক সময় বেশি ভিউ পায়।
তবে ব্যতিক্রমও আছে। বিশালের অভিজ্ঞতায় সালমান খান এখনো কখনো কখনো পাপারাজ্জিদের সঙ্গে ঠিকঠাক কথা বলেন, পোজ দেন। একটি রিয়েলিটি শোর শুটিংয়ে সালমানকে ধারণ করতে ডাকা হয়েছিল পাপারাজ্জিদের। শুটিং শেষ করে তিনি পোজ দেবেন বলে জানিয়েছিলেন।
বাইরে থেকে পাপারাজ্জিজগতকে বিশৃঙ্খল মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে যথেষ্ট গোছানো ব্যবসা। ভাইরাল ভায়ানি, মানব মঙ্গলানি, যোগেন শাহ, বরিন্দর চাওলা, ভুমপ্লা, ফিল্মি জ্ঞান ও ইনস্ট্যান্ট বলিউডের মতো প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম ও নামের সঙ্গে বিভিন্নভাবে কাজ করেন পাপারাজ্জিরা। কেউ সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন, কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করেন, আবার কারও সঙ্গে থাকে নিয়মিত পেশাগত যোগাযোগ।
অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য এই পেশায় খুবই জরুরি। একজন পাপারাজ্জি পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করে হয়তো ৩০ সেকেন্ডের ফুটেজ পান। দীপাবলির সময় অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়। তারকারা একের পর এক পার্টি করলে পাপারাজ্জিরা সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত বাড়ির সামনে অবস্থান করতে পারেন।
মনীশ মালহোত্রা, রমেশ তৌরানি, কারিনা কাপুর খান, মালাইকা অরোরা ও রণবীর কাপুরের মতো তারকারা দীপাবলির সময়ে নিয়মিত এমন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন বলে জানিয়েছেন বিশাল।
এই পেশায় ছুটিও নেই। দীপাবলি, জন্মদিন, কোনো অনুষ্ঠান—এমনকি মৃত্যুর আনুষ্ঠানিকতাতেও পাপারাজ্জিদের কাজ করতে হয়।
কে বেশি ভিউ পান—আলিয়া, নাকি রিয়েলিটি শোর তারকা?
পাপারাজ্জি ব্যবসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো—সবচেয়ে বড় তারকাই সব সময় সবচেয়ে বেশি ভিউ এনে দেন না।
জিম থেকে বের হওয়ার ভিডিও এখনো জনপ্রিয়। তবে রিয়েলিটি শো ও টেলিভিশনের তারকারা অনেক সময় বলিউডের বড় তারকাদেরও ছাড়িয়ে যান। বিশালের মতে, ‘লক আপ’ ও ‘স্প্লিটসভিলা’র মতো অনুষ্ঠানের প্রতিযোগীদের ভিডিও বর্তমানে ভালো এনগেজমেন্ট পায়।
একসময় শেহনাজ গিল ও সিদ্ধার্থ শুক্লাকে ঘিরে এমন আগ্রহ ছিল যে তাঁদের ছবি পেতে মুম্বাইয়ের বাইরেও পাপারাজ্জিরা যেতেন। পরে করণ কুন্দ্রা ও তেজস্বী প্রকাশও হয়ে ওঠেন আলোচিত মুখ।
এখন বিশালের হিসাবে, আকাঙ্ক্ষা চৌধুরীর একটি ভিডিও কখনো কখনো আলিয়া ভাটের ভিডিওর চেয়েও বেশি ভিউ পেতে পারে।
এই ব্যবসা কেবল তারকার জনপ্রিয়তার ওপর চলে না। চলে দর্শকের আগ্রহের ওপর। অর্থাৎ, ক্যামেরা আসলে অনুসরণ করে দর্শককে।
টাকা আসে কোথা থেকে?
বাইরে থেকে পাপারাজ্জিজগতকে বিশৃঙ্খল মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে যথেষ্ট গোছানো ব্যবসা। ভাইরাল ভায়ানি, মানব মঙ্গলানি, যোগেন শাহ, বরিন্দর চাওলা, ভুমপ্লা, ফিল্মি জ্ঞান ও ইনস্ট্যান্ট বলিউডের মতো প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম ও নামের সঙ্গে বিভিন্নভাবে কাজ করেন পাপারাজ্জিরা। কেউ সরাসরি এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন, কেউ স্বাধীনভাবে কাজ করেন, আবার কারও সঙ্গে থাকে নিয়মিত পেশাগত যোগাযোগ।
প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত পাপারাজ্জিরা নির্দিষ্ট বেতন পেতে পারেন। এর বাইরে ইনস্টাগ্রাম প্রচার, ব্র্যান্ডের সঙ্গে সমন্বিত কনটেন্ট এবং পিআর এজেন্সির কাজ থেকেও আয় হয়। আরও একটি বড় আয়ের ক্ষেত্র হলো সিনেমার প্রচার।
বিশালের দাবি, ধর্মা প্রোডাকশনস, টি-সিরিজ, যশরাজ ফিল্মস এবং পিআর প্রতিষ্ঠান স্পাইসের মতো সংস্থা পোস্টার, ট্রেলার ও গানের প্রচারের জন্য পাপারাজ্জিদের অর্থ দেয়।
অর্থাৎ, জিমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যামেরাম্যানটি কেবল একটি ছবি বা ভিডিও বিক্রি করেই আয় করছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার, ব্র্যান্ড এবং চলচ্চিত্রের বিপণন—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে একটি বড় অর্থনৈতিক কাঠামো।
মাসে আয় ৩০-৩৫ হাজার রুপি
এই ঝলমলে জগতের পেছনে থাকা পাপারাজ্জিদের ব্যক্তিগত আয় অবশ্য ততটা ঝলমলে নয়।
বিশালসহ অন্য পাপারাজ্জিদের হিসাবে, মুম্বাইয়ে একজন পাপারাজ্জির সর্বোচ্চ মাসিক আয় সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার রুপি। এর মধ্যে নির্দিষ্ট বেতনের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাবার, জ্বালানি বা সরঞ্জামের সুবিধাও থাকে।
বিশালের নিজের সর্বোচ্চ মাসিক আয় ছিল প্রায় ২৫ হাজার রুপি—যদিও তিনি আট বছরের বেশি সময় ধরে এ পেশায় আছেন।
এই পেশায় ঢোকার ক্ষেত্রেও স্থানীয় হওয়ার সুবিধা রয়েছে। মুম্বাইয়ের ভূগোল জানা, তারকাদের বাড়ির অবস্থান জানা এবং বিনোদনজগতের আনাগোনা সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। তাই প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত মুম্বাইয়ের স্থানীয় বাসিন্দাদেরই বেশি পছন্দ করে বলে জানিয়েছেন এক পাপারাজ্জি।
ভক্ত হিসেবে কোনো তারকার ছবি বা ভিডিও পাঠিয়ে দেওয়া আর পেশাদার পাপারাজ্জি হওয়া এক বিষয় নয়। পেশাদারদের জানতে হয়, কখন ক্যামেরা সামনে রাখতে হবে, আবার কখন নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে।
তারকারাই কখনো ডাকেন পাপারাজ্জিদের
পাপারাজ্জি–সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় গোপন বিষয়গুলোর একটি হলো—সব ‘ক্যান্ডিড’ ছবি আসলে কাকতালীয় নয়।
পাপারাজ্জিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক তারকার পিআর টিমই তাঁদের নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে নেয়। তবে তথ্যের মাত্রা সব সময় এক রকম হয় না। কখনো নির্দিষ্ট ঠিকানা জানানো হয়, কখনো শুধু বলা হয় তারকা বিমানবন্দরে থাকবেন, আবার কখনো কোনো তথ্যই দেওয়া হয় না।
মুম্বাই বিমানবন্দর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সাধারণত সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা এবং বিকেল ৫টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দুই শিফটে সেখানে পাপারাজ্জিরা কাজ করেন। কে আসছেন, কে যাচ্ছেন—সেটিই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। বিমানবন্দরের কর্মীরাও কখনো কখনো তারকা আসার খবর দেন। তবে অনেক বিমানবন্দর-সাক্ষাৎও আগে থেকে জানানো থাকে।
পাপারাজ্জিদের কয়েকজনের দাবি, ভূমি পেড়নেকর, শেহনাজ গিল ও অনিল কাপুর বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে কখনো কখনো তাঁদের খবর দিয়েছেন। করণ জোহরও ভ্রমণের সময় অদ্ভুত সময়ে পাপারাজ্জিদের জানিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি তাঁদের।
বড় তারকার ক্ষেত্রে আবার তথ্য খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে দেওয়া হয়। পিআর টিম হয়তো সরাসরি বের হওয়ার সময় বা জায়গা না জানিয়ে শুধু ফ্লাইট নম্বর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনার কাউকে জানায়।
আবার কেউ কেউ ক্যামেরা এড়াতে মরিয়া
সব তারকা অবশ্য ক্যামেরার সামনে থাকতে চান না। পাপারাজ্জিদের মতে, শাহরুখ খান, আমির খান, ঐশ্বরিয়া রাই ও সালমান খান সাধারণত নিজেরা পাপারাজ্জিদের খবর দেন না। রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোনও নিয়মিত এমন করেন না। তবে কোনো কোনো সময় দীপিকার টিম তাঁর আগমন ক্যামেরাবন্দী করার আগ্রহ দেখিয়েছে।
শাহরুখ খান ক্যামেরা এড়াতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান বলে জানিয়েছেন বিশাল। তাঁর ভাষ্য, সম্প্রতি লন্ডন থেকে পরিবারের সঙ্গে ফেরার সময় শাহরুখ বিমানবন্দরের একাধিক বের হওয়ার পথের সামনে গাড়ি রাখেন। পাপারাজ্জিরা চারটি পথে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু শাহরুখ অন্য একটি পথ দিয়ে বেরিয়ে যান।
দক্ষিণ ভারতীয় তারকাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা ধরন। পাপারাজ্জিদের মতে, রাম চরণ অতীতে কখনো কখনো তাঁদের খবর দিয়েছেন। অন্যদিকে যশ, মহেশ বাবু ও আল্লু অর্জুন সাধারণত তা করেন না।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও নিক জোনাসও ভারতে এলে সাধারণত পাপারাজ্জিদের খবর দেন না। তবে তাঁদের নিজেদের ইনস্টাগ্রাম পোস্ট থেকেই কখনো কখনো তাঁরা কোথায় আছেন, তার আভাস পেয়ে যান ফটোগ্রাফাররা।
তারকাদের পেছন বা পাশ থেকে ছবি তুলে তাঁদের পরিচয় জানতে চাওয়ার নতুন ধরনের কনটেন্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পাপারাজ্জিদের বক্তব্য, পেছন থেকে ছবি তোলার চল নতুন নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এসব ছবি পরিকল্পিতভাবে এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। অজয়ের দাবি, পেশাদার পাপারাজ্জিরা সাধারণত এমন ছবি নিজেদের পেজে অনুপযুক্তভাবে প্রকাশ করতে চান না। কারণ, তাঁদের নিয়মিত তারকাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। কিন্তু এখানেও দায়িত্বের প্রশ্ন থেকে যায়। একজন ফটোগ্রাফার যদি জানেন, তাঁর তোলা নির্দিষ্ট একটি অ্যাঙ্গেল পরে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা আপত্তিকর কনটেন্টে ব্যবহার করা হবে, তাহলে দায় কোথায় শেষ হবে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ, পাপারাজ্জি ব্যবসা এখন আর শুধু ছবি তোলার ব্যবসা নয়। কোন ছবিটি সবচেয়ে বেশি ভিউ আনবে, সেটি বুঝে ওঠার ব্যবসাও।
‘কাকতালীয়’ সাক্ষাতের নেপথ্যে সূত্র
সব ছবি যে পিআর টিমের কাছ থেকে আসে, তা-ও নয়। পাপারাজ্জিদের নিজেদের সূত্র ও যোগাযোগও থাকে। বিদেশি তারকারা মুম্বাইয়ে এলে তাঁদের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও চলাফেরার খোঁজ নেওয়া হয়। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের পাপারাজ্জিরা তারকার হোটেলের আশপাশে লোক রাখেন।
টম হল্যান্ডের মুম্বাই সফরের উদাহরণ দিয়ে বিশাল জানিয়েছেন, পাপারাজ্জিরা জানতেন যে তিনি কোলাবার তাজ হোটেলে ছিলেন এবং শহরের কোথায় যাচ্ছেন, সেটিও অনুসরণ করছিলেন।
এভাবেই বিশাল দাবি করেন, প্রেমের সম্পর্কের সময় তিনিই প্রথম কেএল রাহুল ও আথিয়া শেঠিকে আলাদাভাবে লোয়ার পারেলের একটি জায়গা থেকে বের হতে দেখেছিলেন। হার্দিক পান্ডিয়া ও নাতাশা স্তানকোভিচকেও বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্স থেকে বের হওয়ার সময় প্রথম ছবি তোলার দাবি করেছেন তিনি।
এ ধরনের ‘এক্সক্লুসিভ’ ছবি প্রকাশ করলে তারকাদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয় কি না—প্রায় সব পাপারাজ্জিই বলেছেন, তেমনটা হয় না।
কারণ, দুই পক্ষই এই ব্যবস্থার মূল্য বোঝে। একজন তারকা যখন প্রচার চান, তখন পাপারাজ্জি তাঁর সহযোগী। আবার তারকা যখন আড়ালে থাকতে চান, তখন সেই একই পাপারাজ্জিই খবরটি প্রকাশ করতে পারেন।
সন্তানদের ছবি নিয়ে আলাদা সমঝোতা
পাপারাজ্জিদের কাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা তারকাদের সন্তানদের ছবি তোলা। অজয় নামের এক পাপারাজ্জির দাবি, সন্তান জন্মের পর বেশ কয়েকটি তারকা পরিবার ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের অনুরোধ করেছে, যেন শিশুর ছবি না তোলা হয়। দীপিকা পাড়ুকোন ও রণবীর সিং, আথিয়া শেঠি ও সুনীল শেঠির পরিবার এবং রানি মুখার্জির মতো তারকারা এমন অনুরোধ করেছেন বলে তাঁর দাবি।
বিরাট কোহলি পাপারাজ্জিদের উপহার পাঠিয়ে সঙ্গে নোট দিয়ে সন্তানদের ছবি না তোলার অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কখনো বিষয়টি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় মেটে। আবার কখনো আইনি নোটিশ পর্যন্ত গড়ায়। অজয়ের দাবি, অনুমতি ছাড়া তারকাদের সন্তানদের ছবি প্রকাশ করলে পাপারাজ্জি পেজে কপিরাইট নোটিশ আসতে পারে। রণবীর কাপুর ও আলিয়া ভাটের মেয়ে রাহার ছবি প্রকাশ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও তিনি স্মরণ করেছেন।
বিশালের ভাষ্য, তাঁর দল কোনো শিশুকে ভুল করে হলেও ক্যামেরায় পেয়ে গেলে ফুটেজ সম্পাদনা করে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ, তারকারা শেষ পর্যন্ত জেনে যেতে পারেন যে কে শিশুটির ছবি তুলেছে, আর সেখান থেকে বড় ঝামেলা তৈরি হতে পারে।
রণবীর ও আলিয়া একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছিলেন, তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে ছবি তোলা যেতে পারে। বিশালের দল এখন সেই সমঝোতা মেনে চলে।
ক্যামেরার পেছনের মানুষগুলোও হয়ে ওঠেন পরিচিত
প্রতিদিন একই তারকার পেছনে ছুটতে ছুটতে পাপারাজ্জিদের সঙ্গে তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও তৈরি হয়।
রণবীর সিং ও রণবীর কাপুরকে বন্ধুসুলভ বলে বর্ণনা করেছেন আরেক পাপারাজ্জি বরুণ। তাঁর দাবি, রণবীর কাপুর কখনো কখনো তাঁর পরিবারের খোঁজও নেন। বরুণ ধাওয়ান একবার বিশালের ফোন ভেঙে যেতে দেখেছিলেন। পরে তাঁকে ডেকে নতুন ফোন উপহার দেন বলে জানিয়েছেন বিশাল।
জহির ইকবাল একবার একটি ক্যাফের বাইরে প্রায় ১৫ জন পাপারাজ্জিকে অপেক্ষা করতে দেখে তাঁদের জন্য কফি পাঠিয়েছিলেন। সোনাক্ষী সিনহাকেও পাপারাজ্জিদের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করতে দেখা যায় বলে দাবি বিশালের। এমনকি গাড়ি থামিয়ে পোজও দিয়েছেন তিনি।
এই সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ হতে পারে যে পাপারাজ্জিরা কখনো কখনো তারকাদের মোটরবাইকে করে পৌঁছে দেন। কোনো বিরোধ তৈরি হলে তারকারা কখনো কখনো তাঁদের পক্ষও নেন।
তাই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো তারকার কাছে পাপারাজ্জি সব সময় অচেনা কেউ নন। অনেক সময় প্রতিদিন দেখা পরিচিত মুখ। আর সে কারণেই ক্যামেরার পেছনের মানুষের সঙ্গে তারকার বিরোধও কখনো কখনো ব্যক্তিগত মনে হয়।
সোনাক্ষী, জয়া বচ্চন ও সীমারেখার প্রশ্ন
সম্প্রতি পাপারাজ্জিদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে আলোচনায় এসেছিলেন সোনাক্ষী সিনহা। তবে বরুণের মতে, ভাইরাল হওয়া সেই ঘটনার পেছনে কিছুটা ভিন্ন বাস্তবতা আছে।
তাঁর অভিযোগ, নতুন কিছু পাপারাজ্জি তারকারা স্পষ্টভাবে ছবি না তুলতে বলার পরও ক্যামেরা চালু রাখেন। তাঁর নিজের দলের বেশির ভাগ সদস্য অবশ্য জোর করে কারও ছবি তোলেন না বলে দাবি করেন তিনি।
সোনাক্ষী সম্পর্কে তাঁর বর্ণনাও ভাইরাল ভিডিওর তুলনায় আলাদা। তাঁর দাবি, সোনাক্ষী সাধারণত পাপারাজ্জিদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। এমনকি বিয়ের দিনও কখন বাইরে আসবেন, তা জানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে ফটোগ্রাফারদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়।
জয়া বচ্চনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। পাপারাজ্জিদের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বাগ্বিতণ্ডা বহুবার আলোচনায় এসেছে।
বরুণের মতে, শেষকৃত্য বা প্রার্থনা সভার মতো সংবেদনশীল জায়গায় পাপারাজ্জিরা কখনো কখনো খুব বেশি শব্দ করেন, যা নিয়ে আপত্তি থাকাটা স্বাভাবিক। তবে জয়া বচ্চনের কিছু মন্তব্যও সীমা ছাড়িয়ে যায় বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
বিশাল ও অজয়ের দাবি, তাঁরা সম্মিলিতভাবে আর জয়া বচ্চনের ছবি তোলেন না। পরিবারের ও পিআর টিমের চাপ এবং তাঁর রাগের ভিডিও নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন। এমনকি এ নিয়ে পাপারাজ্জিরা হুমকিও পেয়েছেন বলে তাঁদের বক্তব্য।
এখন কোথাও জয়া বচ্চনকে দেখলে ক্যামেরা নামিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানানো হয়—এমনটাই দাবি তাঁদের।
হাসপাতাল, মৃত্যু আর যে ছবি কেউ নিজের বলে মানতে চান না
অসুস্থতা, মৃত্যু বা শোকের মুহূর্তে তারকাদের ছবি ও ভিডিও করা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েন পাপারাজ্জিরা।
বিশাল, অজয় ও বরুণের যুক্তি, ক্যামেরায় ধারণ করা এবং সেই ফুটেজ দিয়ে অনলাইনে গল্প তৈরি করা—দুটি বিষয় এক নয়। তাঁদের দাবি, পাপারাজ্জিরা অনেক সময় শুধু দৃশ্যটি ধারণ করেন। পরে অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ সেটি কেটে, আবেগঘন শিরোনাম ও থাম্বনেইল দিয়ে ভাইরাল করে।
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পরের কাভারেজের উদাহরণ দিয়ে বিশাল বলেন, পাপারাজ্জিরা দৃশ্য ধারণ করেছিলেন, কিন্তু পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নানা ধরনের বয়ান ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলো তাঁরা তৈরি করেননি।
সিদ্ধার্থ শুক্লার মৃত্যু ও পরে শেফালি জারিওয়ালার মৃত্যুর সময়ও একই প্রশ্ন উঠেছিল।
পাপারাজ্জিদের যুক্তি, শেষকৃত্য বা জনসমাগম অন্য সংবাদমাধ্যমও কাভার করে। তাহলে শুধু পাপারাজ্জিদেরই কেন আলাদা করে দায়ী করা হবে?
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ছবি তোলা এবং সেটিকে পণ্য বানানোর সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে। ক্যামেরাম্যান হয়তো শুধু ভিডিও ধারণ করেছেন। অন্য একটি পেজ সেটিকে কেটে, আবেগঘন শিরোনাম দিয়ে, নির্দিষ্ট থাম্বনেইল বসিয়ে লাখো ভিউয়ের কনটেন্ট বানিয়ে ফেলতে পারে।
যে ব্যক্তি ক্যামেরার বোতাম চাপছেন আর যে ব্যক্তি গল্পটি তৈরি করছেন—তাঁরা সব সময় একই মানুষ নন।
ক্যামেরার কোণ যখন বিতর্কের কারণ
তারকাদের পেছন বা পাশ থেকে ছবি তুলে তাঁদের পরিচয় জানতে চাওয়ার নতুন ধরনের কনটেন্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পাপারাজ্জিদের বক্তব্য, পেছন থেকে ছবি তোলার চল নতুন নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এসব ছবি পরিকল্পিতভাবে এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
অজয়ের দাবি, পেশাদার পাপারাজ্জিরা সাধারণত এমন ছবি নিজেদের পেজে অনুপযুক্তভাবে প্রকাশ করতে চান না। কারণ, তাঁদের নিয়মিত তারকাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।
কিন্তু এখানেও দায়িত্বের প্রশ্ন থেকে যায়। একজন ফটোগ্রাফার যদি জানেন, তাঁর তোলা নির্দিষ্ট একটি অ্যাঙ্গেল পরে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা আপত্তিকর কনটেন্টে ব্যবহার করা হবে, তাহলে দায় কোথায় শেষ হবে—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
কারণ, পাপারাজ্জি ব্যবসা এখন আর শুধু ছবি তোলার ব্যবসা নয়। কোন ছবিটি সবচেয়ে বেশি ভিউ আনবে, সেটি বুঝে ওঠার ব্যবসাও।
তারকাদের সন্তানেরা কি সত্যিই উদ্ধত?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলিউডের তারকাসন্তানদের নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা আছে—তাঁরা অহংকারী, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকেন, পাপারাজ্জিদের পাত্তা দেন না।
কিন্তু বিশালের অভিজ্ঞতা বলছে, বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। তিনি নতুন প্রজন্মের তারকাসন্তানদের ‘খুবই মিষ্টি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বাবা-মায়ের সতর্কতার কারণে অনেকেই ক্যামেরার সামনে বরং সাবধানী। অনলাইনে যে ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য তাঁদের শুনতে হয়, সেটিও তাঁদের প্রভাবিত করে।
সোহেল খানের ছেলে নির্বাণ, মালাইকা অরোরার ছেলে আরহান এবং অমিতাভ বচ্চনের নাতি অগস্ত্য নন্দার নাম উল্লেখ করে তিনি তাঁদের ভদ্র আচরণের কথা বলেছেন। সুহানা খানের সঙ্গেও তাঁর অভিজ্ঞতা ভালো বলে জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, বড় সমস্যা উদ্ধত আচরণ নয়; বরং ভয়। মা–বাবা অনেক সময় সন্তানদের পাপারাজ্জিদের সামনে না যেতে বলেন। একই সঙ্গে অনলাইনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ভয়ও থাকে।
তাই ক্যামেরার সামনে অস্বস্তিতে থাকা কোনো তারকাসন্তানকে শুধু অহংকার দিয়ে বিচার করা হয়তো ঠিক নয়। তাঁদের জন্য একটি ছবি শুধু মুহূর্তের ছবি নয়—এটি ইন্টারনেটে স্থায়ী হয়ে থাকা একটি ডিজিটাল রেকর্ড।
পাঁচ ঘণ্টার অপেক্ষা, তিন সেকেন্ডের সাফল্য
পাপারাজ্জিদের জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, বাস্তবে ততটাই পরিশ্রমের।
একটি ছবি বা ভিডিওর জন্য পাঁচ-ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ১২ ঘণ্টার শিফট করতে হয়। কখনো রাতভর কাজ, কখনো মোটরবাইকে মুম্বাইয়ের রাস্তায় ছোটাছুটি। বৃষ্টির মধ্যে ক্যামেরা ভিজে যায়, মুঠোফোনে সমস্যা হয়, খাবার-পানির ব্যবস্থা থাকে না।
অবস্থান ছেড়ে সামান্য সময়ের জন্যও চলে গেলে মিস হয়ে যেতে পারেন সেই তারকা, যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা।
বরুণের ভাষায়, মানুষের ধারণা—ক্যামেরা তাক করে ছবি তোলাই বুঝি পুরো কাজ। কিন্তু বাস্তবে এর সঙ্গে রয়েছে ক্লান্তি, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা। সারা দিনের অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে মাত্র তিন সেকেন্ডের একটি মুহূর্ত।
তারপরও এ পেশার প্রতি তাঁদের একধরনের টান তৈরি হয়েছে। অজয় ও বরুণ—দুজনই বলেছেন, তাঁরা এই ব্যবসার সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে গেছেন যে অন্য কিছু করার কথা ভাবতে পারেন না। তাঁদের কাছে ভালো দিন মানে এমন দিন, যেদিন দল ভালো কনটেন্ট পেয়েছে।
তারকা, পাপারাজ্জি আর দর্শকের মাঝখানে যে অর্থনীতি
পাপারাজ্জিদের শুধু তারকাদের পেছনে ছুটে বেড়ানো একদল ক্যামেরাম্যান হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। আবার প্রতিটি ‘ক্যান্ডিড’ ছবিকে তারকার পরিকল্পিত প্রচার বললেও বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এই জগতের বাস্তবতা মাঝামাঝি কোথাও। কোথাও পিআর টিম ফোন করে, কোথাও পাপারাজ্জির নিজের সূত্র কাজ করে। কেউ ক্যামেরার সামনে থাকতে চান, কেউ তা এড়াতে বিমানবন্দরের চারটি দরজা ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যান। কোথাও তারকা ও পাপারাজ্জির মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, কোথাও আইনি নোটিশ আসে। কোথাও শিশুর ছবি না তোলার অনুরোধ থাকে, আবার কখনো কোনো তারকাকে একেবারে ‘অফ-লিমিটস’ করে দেন পাপারাজ্জিরাই।
এর নিচে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা—বেতন, ব্র্যান্ড প্রচার, পিআর এজেন্সি, চলচ্চিত্রের বিপণন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিউ।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে দর্শকের আচরণে। মানুষ এখন শুধু সিনেমা দেখতে চান না, তারকাদের দৈনন্দিন জীবনও দেখতে চান। তাঁরা কী পরছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে দেখা করছেন, বিমানবন্দরে কীভাবে হাঁটছেন—এসবও হয়ে উঠেছে বিনোদনের অংশ।
ফলে বলিউডও এখন শুধু সিনেমা, তারকা আর গ্ল্যামার বিক্রি করে না। বিক্রি করে তারকাদের কাছে পৌঁছানোর অনুভূতিটাও—কখনো সত্যিকারের, কখনো সাজানো, কখনো আবার খুব যত্নে নিয়ন্ত্রিত।
দর্শক দেখেন, কোনো তারকা জিম থেকে বের হচ্ছেন, বিমানে উঠছেন কিংবা গাড়িতে বসছেন। পাপারাজ্জি সেখানে দেখেন, সম্ভাব্য একটি গল্প। পিআর টিম দেখে প্রচারের সুযোগ। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ দেখে সম্ভাব্য ভিউ।
এই চার দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের বলিউডের পাপারাজ্জি অর্থনীতি।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে