
‘শোলে’র ঠাকুর, ‘আঁধি’র জে কে, ‘কোশিশ’-এর হরি কিংবা ‘মৌসম’-এর অমর—অনেক চরিত্রের জন্যই সঞ্জীব কুমারকে মনে রাখা যায়। অথচ এই অভিনেতার শুরুটা ছিল একেবারেই অনিশ্চিত। অভাবের সংসার, হাতে মাত্র দুই সেট পোশাক, কাজের নিশ্চয়তা নেই—এমন দিনও গেছে তাঁর।
পরবর্তী সময়ে বলিউডের অন্যতম অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন সঞ্জীব কুমার। কিন্তু অর্থের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্র সাংবাদিক হানিফ জাভেরি জানিয়েছেন, সঞ্জীব বন্ধুদের প্রয়োজনে প্রায় ৯৬ লাখ রুপি ঋণ দিয়েছিলেন, যার বড় অংশই আর ফেরত পাননি। শুধু তা–ই নয়, নিজের গাড়ি বন্ধুকে উপহার দেওয়া থেকে শুরু করে চালকের বিয়ের খরচ বহন, এমনকি তাঁর ছেলের পড়াশোনার জন্য উইলে অর্থ রেখে যাওয়ার মতো কাজও করেছিলেন তিনি।
অভাবের সংসার, হাতে মাত্র দুই সেট পোশাক
সঞ্জীব কুমারের আসল নাম ছিল হরিহর জেঠালাল জারিওয়ালা। গুজরাটের একটি পরিবার থেকে উঠে আসা এই অভিনেতার ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। কিন্তু অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার পথটি সহজ ছিল না। পরিবারেও তখন আর্থিক টানাপোড়েন।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক হানিফ জাভেরির ভাষ্য অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে অভিনয়ের চেষ্টা করার সময় সঞ্জীবের পরিবার চরম অর্থকষ্টের মধ্যে ছিল। তাঁর মা বাবার প্রায় ভেঙে পড়া ব্যবসা সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। অন্যদিকে অভিনয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত সঞ্জীব।
তখন সঞ্জীবের নিজের পরার মতো পোশাকও ছিল অল্প। হানিফের দাবি, সঞ্জীবের কাছে ছিল মাত্র দুই সেট জামাকাপড়।
সিনেমায় কাজ পাওয়াটাও সহজ ছিল না। শুরুর দিকে সঞ্জীব যে ধরনের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেতেন, সেগুলোর অনেকগুলোই ছিল ‘সি গ্রেড’ সিনেমা। কিন্তু তখন ছবির মান বিচার করার মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি। পরিবারের প্রয়োজন ছিল টাকা, আর তাঁর প্রয়োজন ছিল কাজ।
হানিফ বলেন, সঞ্জীব তখন জানতেনই না যে তিনি যে ছবিগুলো করছেন, সেগুলোকে ‘সি গ্রেড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি শুধু জানতেন, কাজ পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই কাজ থেকে টাকা আসছে।
এই সময়টিই পরবর্তী তারকা সঞ্জীব কুমারের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি।
সেখান থেকে ‘হরি ভাই’
অভাবের সেই দিন অবশ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ধীরে ধীরে পরিচালকদের নজরে পড়তে শুরু করেন তিনি। অভিনয়ের স্বাভাবিক দক্ষতা, সংলাপ বলার ধরন এবং চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে সঞ্জীবের ক্যারিয়ার ঘুরতে শুরু করে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ‘খিলোনা’, ‘দস্তক’, ‘কোশিশ’, ‘সীতারাম’, ‘মৌসম’, ‘আঁধি’, ‘ত্রিশূল’, ‘শোলে’—একটির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেমায় নিজের অভিনয়ের ছাপ রাখেন তিনি।
‘শোলে’তে ঠাকুর বলদেব সিং চরিত্রে সঞ্জীবের অভিনয় তাঁকে আরও বড় পরিসরে পরিচিত করে। চরিত্রটির সংলাপ কম, কিন্তু উপস্থিতির ওজন ছিল বিপুল। অন্যদিকে ‘কোশিশ’-এ শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী এক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখিয়েছিলেন, সংলাপ ছাড়াও কীভাবে অভিনয় দিয়ে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা যায়।
এ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন সঞ্জীব। ‘দস্তক’ ছবির জন্যও জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন। তাঁর অভিনয়ের পরিধি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে একদিকে তিনি বাণিজ্যিক ছবিতে জনপ্রিয়, অন্যদিকে সমালোচকদের কাছেও ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত।
‘কৃপণ’ ছিলেন? বলছেন সাংবাদিক
সঞ্জীব কুমারকে নিয়ে বলিউডে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল—তিনি নাকি অর্থ খরচ করতে চাইতেন না। কিন্তু হানিফ জাভেরির বক্তব্য সেই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
বরং হানিফের মতে, সঞ্জীব অপ্রয়োজনীয় খরচ পছন্দ করতেন না, কিন্তু প্রয়োজনের সময় বন্ধু ও কাছের মানুষদের পাশে দাঁড়াতে কার্পণ্য করতেন না।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে ৯৬ লাখ রুপির ঋণের কথা। হানিফের দাবি, বন্ধুদের প্রয়োজনে সঞ্জীব প্রায় ৯৬ লাখ রুপি ধার দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশই আর ফেরত আসেনি। তারপরও কাউকে টাকা দেওয়ার আগে কাগজপত্র বা আইনি নিশ্চয়তার কথা ভাবেননি তিনি।
অর্থাৎ নিজের জন্য টাকা জমিয়ে রাখার চেয়ে পরিচিত মানুষকে সাহায্য করাই সঞ্জীবের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
শত্রুঘ্ন সিনহাকে ৫–৭ লাখ রুপি
সঞ্জীবের উদারতার একটি ঘটনা শেয়ার করেছেন হানিফ। সে সময় শত্রুঘ্ন সিনহা সদ্য এফটিআইআই থেকে বেরিয়ে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। অর্থকষ্টে ছিলেন তিনি।
সঞ্জীবের সঙ্গে শত্রুঘ্নর বন্ধুত্ব ছিল গভীর। শত্রুঘ্নর অর্থ প্রয়োজনের কথা জানতে পেরে সঞ্জীব নিজেই তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। হানিফের দাবি, তিনি ৫ থেকে ৭ লাখ রুপি দিয়েছিলেন।
শুধু অর্থ দিয়েই থেমে থাকেননি সঞ্জীব, শত্রুঘ্ন যখন নতুন ছিলেন, তখন প্রযোজকদের কাছে তাঁর হয়ে কথা বলতেন। অর্থাৎ বন্ধুর ক্যারিয়ার তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
বনি কাপুরকেও দিয়েছিলেন টাকা
প্রযোজক বনি কাপুরও একসময় সঞ্জীবের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন হানিফ। তবে ঘটনাটির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। সঞ্জীব নাকি কোনো কাগজপত্র ছাড়াই টাকা দিয়েছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যুর পর বনি কাপুর সেই টাকা সঞ্জীবের পরিবারের কাছে ফেরত দেন।
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, সঞ্জীবের পরিবারও জানত না যে তিনি বনি কাপুরকে টাকা দিয়েছিলেন। এমন ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, সাহায্য করার বিষয়টি তিনি প্রচারের জন্য করতেন না। কাউকে টাকা দিলে সেটি জানানো বা হিসাব রাখার চেয়ে মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল—হানিফের বর্ণনায় এমনই এক ছবি উঠে আসে।
চালকের বিয়ের খরচ
বন্ধুদের পাশাপাশি নিজের কর্মীদের প্রতিও সঞ্জীব ছিলেন যত্নশীল। তাঁর গাড়িচালকের বিয়ের খরচও তিনি বহন করেছিলেন বলে জানিয়েছেন হানিফ। এমনকি মৃত্যুর আগে উইল করার সময় চালকের ছেলের শিক্ষার জন্য দুই লাখ রুপি আলাদা করে রেখে গিয়েছিলেন।
একজন তারকার সম্পদের সঙ্গে এই অঙ্ক হয়তো তুলনামূলকভাবে খুব বড় নয়; কিন্তু ঘটনাটির তাৎপর্য ছিল অন্য জায়গায়। সঞ্জীবের কাছে তাঁর সঙ্গে কাজ করা মানুষটিও পরিবারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।
প্রেম ছিল, বিয়ে হয়নি
সঞ্জীব কুমারের ব্যক্তিজীবনও কম আলোচিত নয়। জীবনে একাধিক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা জানা যায়। হেমা মালিনী ও নূতনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা হয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোচিত ছিল অভিনেত্রী ও গায়িকা সুলক্ষণা পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। সুলক্ষণা সঞ্জীবকে ভালোবাসতেন এবং তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সময় জানা গেছে। কিন্তু সঞ্জীব বিয়েতে রাজি হননি।
এর পেছনে সম্পর্কের কোনো অভাব ছিল না, বরং ছিল তাঁর নিজের গভীর এক বিশ্বাস। হানিফ জাভেরির দাবি, সঞ্জীব বিশ্বাস করতেন, তিনি বেশি দিন বাঁচবেন না। কারণ, তাঁর পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অনেকেই ৫০ বছর বয়সের আগেই মারা গিয়েছিলেন। সঞ্জীবও মনে করতেন, তাঁর জীবন হয়তো দীর্ঘ হবে না।
এরই মধ্যে সঞ্জীবের দুটি হার্ট অ্যাটাকও হয়েছিল। ফলে বিয়ে করে একজন নারীর জীবন নষ্ট করতে চাননি তিনি—এমনটাই জানিয়েছেন হানিফ। সুলক্ষণা পণ্ডিতের জীবনে এই সম্পর্কের প্রভাব গভীর ছিল বলে পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়
আজকের দিনে একজন তারকার এমন সিদ্ধান্ত হয়তো অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু সঞ্জীবের সময় ও তাঁর পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করলে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যায়। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। অর্থাৎ যে আশঙ্কা তাঁকে বিয়ে থেকে দূরে রেখেছিল, শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুও ঘটে ৫০-এর আগেই। ১৯৮৫ সালের ৬ নভেম্বর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সঞ্জীব কুমার। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৭ বছর।
সঞ্জীবের মৃত্যুর পর বলিউডে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিনয়জীবনের পাশাপাশি অপূর্ণ থেকে যায় ব্যক্তিজীবনের অনেক গল্পও।
সাফল্য এসেছিল, কিন্তু বদলায়নি মানুষটি
সঞ্জীব কুমারের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো, অভাব থেকে সাফল্যে পৌঁছেও তিনি অর্থের প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েননি।
যে মানুষ একসময় কাজ পাওয়ার জন্য ‘সি গ্রেড’ সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন, সেই মানুষই পরে বলিউডের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হয়ে বন্ধুদের জন্য লাখ লাখ রুপি খরচ করেছেন। গাড়ি উপহার দিয়েছেন, কর্মীর বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন, কর্মীর সন্তানের পড়াশোনার জন্য অর্থ রেখে গেছেন। তাঁর জীবনের এ দুই প্রান্ত পাশাপাশি রাখলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়—সঞ্জীব কুমারের কাছে অর্থ ছিল প্রয়োজনের জিনিস, পরিচয়ের ভিত্তি নয়।
সঞ্জীব কুমার জানতেন অভাব কী। তাই হয়তো অন্যের অভাবও সহজে উপেক্ষা করতে পারতেন না।
পর্দায় সঞ্জীব কখনো ঠাকুর, কখনো অসহায় স্বামী, কখনো প্রেমিক, কখনো মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ। চরিত্র বদলেছে, গল্প বদলেছে; কিন্তু অভিনয়ের গভীরতা বদলায়নি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সঞ্জীব কুমার রেখে গেছেন এমন এক উত্তরাধিকার, যেখানে পুরস্কার, জনপ্রিয় সিনেমা কিংবা স্মরণীয় চরিত্রের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত উদারতার গল্পও।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে