‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’ সিনেমার দৃশ্য। ইনস্টাগ্রাম থেকে
‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’ সিনেমার দৃশ্য। ইনস্টাগ্রাম থেকে

৪ দিনে ৫০ কোটি আয়, কী আছে সামান্থার ঝড় তোলা এই সিনেমায়

একসময় তেলেগু সিনেমায় নারী চরিত্র মানেই ছিল নায়কের প্রেমিকা, গান বা আবেগের উপকরণ। সেই ইন্ডাস্ট্রিতেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন নারী—সামান্থা রুথ প্রভু। তাঁর অভিনীত ও প্রযোজিত ‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’ শুধু বক্স অফিসে সফল হয়নি; বরং নারী-নির্ভর বাণিজ্যিক ছবির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।

মাত্র চার দিনে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০ কোটি রুপি আয় করে ছবিটি প্রমাণ করেছে, দর্শক এখন শুধু পুরুষ সুপারস্টারের ওপর নির্ভরশীল গল্প দেখতে চায় না; বরং শক্তিশালী নারী চরিত্রকেও একইভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

‘পেড্ডি’ বনাম ‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’
তেলেগু সিনেমার সাম্প্রতিক আলোচনায় দুটি ছবি বারবার উঠে এসেছে। একদিকে রামচরণ ও জাহ্নবী কাপুর অভিনীত ‘পেড্ডি’, যা নারী চরিত্র উপস্থাপনের কারণে সমালোচিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’, যেখানে নারী চরিত্রই গল্পের চালিকা শক্তি।

আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো বিদেশের বাজারে ছবিটির সাফল্য। মাত্র চার দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৫০ কোটি রুপি আয় করেছে ছবিটি। টিকিটের মূল্য তুলনামূলক কম হওয়া সত্ত্বেও দর্শকসংখ্যার বিচারে এটি প্রায় ‘পেড্ডি’র সমতুল্য অবস্থানে পৌঁছে যায়।

একদিকে শতকোটি টাকার প্রচারণা ও তারকাখচিত আয়োজন, অন্যদিকে সামান্থার নেতৃত্বে একটি নারীকেন্দ্রিক ছবি। তবু দর্শক দুই ক্ষেত্রেই সমান আগ্রহ দেখিয়েছে।

তেলেগু সিনেমায় নারীর দীর্ঘ লড়াই
তেলেগু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নারীর শক্তিশালী উপস্থিতির উদাহরণ নতুন নয়। সাবিত্রী ছিলেন একসময়কার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। পরে বিজয়াশান্তি অ্যাকশন নায়িকা হিসেবে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। নায়িকারা ধীরে ধীরে গল্পের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে ‘ফ্লাওয়ারপট’ চরিত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।

২০০৯ সালে ‘অরুন্ধতী’ ছবির মাধ্যমে আনুশকা শেঠি আবারও নারীকেন্দ্রিক ছবির সম্ভাবনা দেখান।

‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’ সিনেমার দৃশ্য। ইনস্টাগ্রাম থেকে

কেন আলাদা ‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’
ছবির পরিচালক নন্দিনী রেড্ডি ও সামান্থা শুরু থেকেই বলেছিলেন, তাঁরা নারী-নির্ভর ছবির প্রচলিত ‘অসহায় নারীর’ ধাঁচ ভাঙতে চান।

তাঁদের লক্ষ্য ছিল, পুরুষ তারকাদের জন্য সংরক্ষিত বীরত্ব, অ্যাকশন ও বৃহৎ পরিসরের বিনোদনকে একজন নারীর গল্পে নিয়ে আসা।

ফলে ছবিতে সামান্থাকে দেখা যায় এক সাহসী, লড়াকু ও পরিবার রক্ষাকারী চরিত্রে। শাড়ি পরে তাঁর অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দর্শকের মধ্যে বিশেষ সাড়া ফেলেছে। ট্রেলারে ভাইরাল হওয়া বাস-ফাইট দৃশ্যটি হলে গিয়ে আরও বেশি করতালি পেয়েছে।
ছবিটি নারী ক্ষমতায়নের ভাষণ দেয় না; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিনোদন হিসেবে কাজ করে। আর সেখানেই এর সাফল্যের রহস্য।

অভিনেত্রী থেকে নির্মাতা
সামান্থার এই সাফল্য হঠাৎ আসেনি। গত কয়েক বছরে তিনি ধারাবাহিকভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।

‘ওহ! বেবি’, ‘যশোদা’, ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এ রাজি চরিত্র এবং ‘সিটাডেল: হানি বানি’র মতো কাজ সামান্থার অভিনয়দক্ষতা ও অ্যাকশন ইমেজকে শক্তিশালী করেছে।
তবে নতুন সিনেমাটিতে সামান্থা শুধু অভিনেত্রী নন, প্রযোজক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

কম বাজেটে বড় সাফল্য
ছবিটির আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় এর নির্মাণপ্রক্রিয়া। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ছবির কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুনেই মুক্তি পেয়েছে। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে মাত্র আট মাসে।

সামান্থা নিজেই জানিয়েছেন, বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখাই ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান সময়ে যেখানে মাঝারি মানের ছবির বাজেটও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, সেখানে তিনি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলের উদাহরণ তৈরি করেছেন।

‘মা ইনতি বাঙ্গারাম’ সিনেমার দৃশ্য। ইনস্টাগ্রাম থেকে‘

প্রত্যাবর্তনের ছবিতে বাজিমাত
গত কয়েক বছর সামান্থার জীবনে ছিল নানা উত্থান-পতন। ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন, শারীরিক অসুস্থতা এবং দীর্ঘ বিরতির পর তিনি ফিরেছেন এমন একটি ছবি নিয়ে, যা তাঁর জন্য শুধু অভিনয়ের নয়, আত্মপ্রকাশেরও নতুন অধ্যায়।
পরিচালক বি ভি নন্দিনী রেড্ডির সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ১৯ জুন। তেলেগুর পাশাপাশি তামিল সংস্করণও মুক্তি দেওয়া হয়।

ছবিটি মুক্তির আগে থেকেই আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। কারণ, এটি সামান্থার নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ত্রালালা মুভিং পিকচার্সের অন্যতম বড় প্রজেক্ট। ফলে ছবিটির সাফল্য বা ব্যর্থতা সরাসরি জড়িয়ে ছিল অভিনেত্রীর নতুন পরিচয়ের সঙ্গে।

পরিবার, আবেগ আর লড়াই
সিনেমাটি মূলত এক নারীর গল্প, যে নিজের অতীত থেকে পালিয়ে একটি নতুন জীবন গড়তে চায়। নতুন একটি পরিবারের অংশ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করলেও তার অতীতের ছায়া আবার ফিরে আসে। এরপর শুরু হয় নিজের মানুষদের রক্ষার লড়াই।

ছবিটির বিশেষত্ব হলো, এটি পুরোপুরি অ্যাকশননির্ভর নয়; বরং পারিবারিক সম্পর্ক, আবেগ, আত্মত্যাগ এবং নারীর মানসিক শক্তিকে গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
এ কারণেই অনেক দর্শক ছবিটিকে প্রচলিত দক্ষিণি ‘মাস এন্টারটেইনার’-এর চেয়ে আলাদা হিসেবে দেখছেন।

ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে