সিনেমার দৃশ্যে রম্ভা। আইএমডিবি
সিনেমার দৃশ্যে রম্ভা। আইএমডিবি

নব্বইয়ের ‘গ্ল্যামার কুইন’, প্রেম–বিতর্ক থেকে বিয়ে, রম্ভাকে মনে আছে?

আজ ৫ জুন। দক্ষিণ ভারতীয় ও হিন্দি সিনেমার একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রম্ভার জন্মদিন। নব্বইয়ের দশকের দর্শকদের কাছে তিনি ছিলেন গ্ল্যামার, প্রাণবন্ত নাচ আর বাণিজ্যিক ছবির সফলতার এক প্রতীক। এমন এক সময় ছিল, যখন দক্ষিণ ভারত থেকে বলিউড—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অথচ সেই তারকাই আজ আলোঝলমলে চলচ্চিত্রজগৎ থেকে অনেক দূরে, পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে কানাডায় শান্ত জীবন কাটাচ্ছেন।

জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক রম্ভার জীবন, সংগ্রাম, সাফল্য, বিতর্ক ও অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায়।

সাধারণ পরিবারের মেয়ের তারকা হয়ে ওঠা
রম্ভার আসল নাম বিজয়লক্ষ্মী। ১৯৭৬ সালের ৫ জুন ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিজয়ওয়াড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে বিজয়লক্ষ্মীর শৈশব কেটেছে একেবারেই সাধারণ পরিবেশে।

স্কুলজীবনেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাচে বিজয়লক্ষ্মীর আগ্রহ ছিল প্রবল। এক স্কুল অনুষ্ঠানে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। সেখান থেকেই শুরু হয় অভিনয়ের পথচলা।

মাত্র কিশোরী বয়সে বিজয়লক্ষ্মী চলচ্চিত্রে সুযোগ পান। মালয়ালম ছবি ‘সারগম’ দিয়ে তাঁর অভিনয়ে অভিষেক হয়। যদিও ছবিতে তাঁর চরিত্র খুব বড় ছিল না, কিন্তু নির্মাতাদের নজর কাড়তে যথেষ্ট ছিল।

এরপর তেলুগু ছবি ‘আ ওক্কাতি আডাক্কু’ বিজয়লক্ষ্মীকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি। মজার বিষয় হলো, এই ছবির একটি চরিত্রের নাম থেকেই বিজয়লক্ষ্মীর নতুন নাম হয়—রম্ভা। পরে এই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।

দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার নতুন ঝলক
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় রম্ভা যেন এক ঝড়ের নাম। তামিল, তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড়—চারটি বড় ইন্ডাস্ট্রিতেই সমান জনপ্রিয়তা পান তিনি। তাঁর অভিনয়ের চেয়ে বেশি আলোচিত ছিল পর্দায় উপস্থিতি, নাচ এবং দর্শককে আকর্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা।

সে সময় দক্ষিণ ভারতের প্রায় সব বড় তারকার সঙ্গে অভিনয় করেছেন রম্ভা। এর মধ্যে রয়েছেন রজনীকান্ত, চিরঞ্জীবি, নাগার্জুনা, বালকৃষ্ণ, মোহনলাল ও মামুট্টি।  তাঁর অভিনীত ‘উল্লাথাই আল্লিথা’, ‘সুন্দরা পুরুশান’, ‘অরুনাচলম’, ‘হিটলার’ বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সফল হয়। বিশেষ করে তামিল সিনেমায় তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে প্রযোজকেরা শুধু তাঁর উপস্থিতির জন্যই ছবিতে অতিরিক্ত গান বা দৃশ্য যোগ করতেন।

সিনেমার দৃশ্যে রম্ভা। আইএমডিবি

বলিউডে আগমন
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় সফলতার পর বলিউডের দরজাও খুলে যায় রম্ভার জন্য। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জুদওয়া’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন সালমান খানের বিপরীতে। ছবিতে আরেক নায়িকা ছিলেন কারিশমা কাপুর।
‘জুদওয়া’ বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায় এবং রম্ভা সারা ভারতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

এরপর ‘বন্ধন’, ‘ক্রোধ’, ‘বেটি নাম্বার ওয়ান’, ‘জানি দুশমন’সহ একাধিক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন। তবে বলিউডে রম্ভা কখনোই দক্ষিণ ভারতের মতো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। কারণ, তখন বলিউডে মাধুরী দীক্ষিত, কাজল, রাভিনা ট্যান্ডন, কারিশমা কাপুর ও সুস্মিতা সেনদের মতো তারকাদের তুমুল প্রতিযোগিতা ছিল।

গ্ল্যামারের আড়ালের সংগ্রাম
রম্ভার ক্যারিয়ার যতটা ঝলমলে দেখাত, বাস্তবে ততটা সহজ ছিল না। চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশের সময় তিনি খুবই অল্পবয়সী ছিলেন। একের পর এক ভাষার ছবিতে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে প্রায় সারা বছরই শুটিং করতে হতো।

এক সাক্ষাৎকারে রম্ভা বলেছিলেন, এমন সময় গেছে যখন একই দিনে তিনটি আলাদা ছবির শুটিং করেছেন। দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পে তখন নারী তারকাদের জন্য কাজের পরিবেশ আজকের মতো ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ, প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম ও চেহারা ধরে রাখার চাপ তাঁকে মানসিকভাবেও ক্লান্ত করে তুলেছিল।
তবু রম্ভা হাল ছাড়েননি। নিজের পরিশ্রম দিয়েই তিনি শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন এক দশকের বেশি সময়।

সিনেমার দৃশ্যে রম্ভা। আইএমডিবি

বিতর্কও ছিল সঙ্গী
তারকাজীবনে বিতর্ক এড়িয়ে চলা কঠিন। রম্ভাও এর ব্যতিক্রম নন। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রম্ভার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের কয়েকজন অভিনেতার সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ছড়ায়। যদিও তিনি কখনো এসব গুজবের সত্যতা স্বীকার করেননি। আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয় যখন একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে সহশিল্পীর সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্যের খবর প্রকাশ্যে আসে।

তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্রে ‘গ্ল্যামার ডল’ তকমা পাওয়া। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করতেন, রম্ভাকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি; বরং নির্মাতারা তাঁর সৌন্দর্য ও গ্ল্যামারকেই বেশি ব্যবহার করেছেন।

রম্ভা পরে এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, অনেকেই তাঁর অভিনয়ক্ষমতার চেয়ে চেহারা নিয়েই বেশি আলোচনা করেছেন।

সিনেমার দৃশ্যে রম্ভা। আইএমডিবি

প্রেম, বিয়ে ও নতুন জীবন
ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে থাকতেই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা জল্পনা ছিল। অবশেষে ২০১০ সালে রম্ভা কানাডাপ্রবাসী ব্যবসায়ী ইন্দ্রকুমার পাঠমানাথনকে বিয়ে করেন। বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের বহু তারকা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বিয়ের পর ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে দূরে সরে যান রম্ভা। স্বামীর সঙ্গে কানাডায় বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে তাঁদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
মাতৃত্বের দায়িত্বকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে উল্লেখ করেছেন রম্ভা। বহু সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সন্তানদের বড় করে তোলার আনন্দ কোনো চলচ্চিত্রের সাফল্যের চেয়ে কম নয়।

সংসার ভাঙনের গুঞ্জন
বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এমনকি বিচ্ছেদের আবেদন করার খবরও সামনে আসে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে তখন ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় যে রম্ভার দাম্পত্যজীবন ভেঙে যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলে যায়। দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনই উদ্যোগ নেন। পরে তাঁদের সংসার আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এর পর থেকে ব্যক্তিগত জীবনকে গণমাধ্যমের আলোচনার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা
২০২২ সালে রম্ভা ও তাঁর সন্তানরা কানাডায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনার পর গাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। সৌভাগ্যক্রমে কিছুদিনের মধ্যেই সবাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
রম্ভা পরে বলেন, ওই দুর্ঘটনা তাঁকে জীবনের মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।

টেলিভিশনে দ্বিতীয় ইনিংস
চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে গেলেও বিনোদনজগৎ পুরোপুরি ছাড়েননি তিনি। বিভিন্ন টেলিভিশন রিয়েলিটি শোতে বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। নাচ ও বিনোদনভিত্তিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের কাছে ভালোই গ্রহণযোগ্যতা পায়। যদিও নতুন প্রজন্মের দর্শক তাঁকে হয়তো চলচ্চিত্রের নায়িকা হিসেবে কম চেনেন, দক্ষিণ ভারতের দর্শকদের কাছে তিনি এখনো পরিচিত মুখ।

ইন্ডিয়া টুডে, ইন্ডিয়াডটকম অবলম্বনে