অঞ্জলি আনন্দ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
অঞ্জলি আনন্দ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘ওজন কমালে তোমার সঙ্গে কাজ করব’

অভিনয় ও নাচে প্রশিক্ষিত। মা–বাবাও অভিনয়জগতের মানুষ। তবু বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে অঞ্জলি আনন্দকে কম সংগ্রাম করতে হয়নি। এমনকি একসময় পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে অভিনয় ছেড়ে ভারতই ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। হাতে থাকা সঞ্চয়ও ফুরিয়ে গিয়েছিল।

সেই সময়েই আসে করণ জোহরের ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’। ছবিতে রণবীর সিংয়ের বোনের চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান অঞ্জলি। এরপর ধীরে ধীরে খুলতে থাকে কাজের দরজা। সম্প্রতি ফারাহ খানের ইউটিউব অনুষ্ঠানে নিজের জীবনের সেই কঠিন সময়ের কথা বলেছেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায় উঠে এসেছে বলিউডে শরীরের গড়ন নিয়ে প্রচলিত ধারণা, কাজ পাওয়ার লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জায়গা করে নেওয়ার গল্প।

২০২০ সালে অঞ্জলির জীবন যেন থমকে যায়। করোনার লকডাউন, কাজের সংকট—সব মিলিয়ে অভিনয়ের সুযোগ প্রায় বন্ধ। ফারাহ খানকে তিনি জানিয়েছেন, তখন তাঁর সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাজ না থাকায় ভারত ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাওয়ার কথাও ভাবছিলেন। অঞ্জলি তখন অভিনয় থেকে সরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার কথা ভাবছিলেন। মনে হচ্ছিল, এত দিনের চেষ্টা হয়তো কোনো ফলই দিল না। ঠিক সেই সময় বন্ধুদের সঙ্গে গোয়ায় ছিলেন অঞ্জলি। সেখানেই আসে শানু শর্মার বার্তা। এরপর করণ জোহরের ছবির জন্য অডিশনের সুযোগ পান তিনি। অঞ্জলির ছবি ও অডিশন দেখে করণ জোহর পছন্দ করেন তাঁকে; আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বড় পর্দার নতুন অধ্যায়।

‘ওজন কমালে তোমার সঙ্গে কাজ করব’
অঞ্জলির ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে চেহারা ও ওজন নিয়ে তাঁকে নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে। যশরাজ ফিল্মসের কাস্টিং পরিচালক শানু শর্মার সঙ্গে দেখা হলেই নাকি একই ধরনের কথা শুনতেন তিনি—ওজন কমালে তাঁর সঙ্গে কাজ করা হবে।
অঞ্জলি জানিয়েছেন, শানু তাঁকে বলতেন, ওজন কমালে তাঁকে কোনো কাজের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। বছরের পর বছর এমন কথা শুনেছেন তিনি। পরে অবশ্য সেই শানুর কাছ থেকেই আসে গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল, যা তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

যে শরীরের গড়নকে একসময় কাজ পাওয়ার পথে বাধা হিসেবে দেখা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই অভিনেত্রীই বড় পর্দায় এমন চরিত্রে অভিনয় করেন, যেখানে শরীর নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।

‘ছয় মাসের সঞ্চয় শেষ হয়ে গিয়েছিল’
২০২০ সালে অঞ্জলির জীবন যেন থমকে যায়। করোনার লকডাউন, কাজের সংকট—সব মিলিয়ে অভিনয়ের সুযোগ প্রায় বন্ধ। ফারাহ খানকে তিনি জানিয়েছেন, তখন তাঁর সঞ্চয়ের প্রায় সবটুকু ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাজ না থাকায় ভারত ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাওয়ার কথাও ভাবছিলেন।

অঞ্জলি তখন অভিনয় থেকে সরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার কথা ভাবছিলেন। মনে হচ্ছিল, এত দিনের চেষ্টা হয়তো কোনো ফলই দিল না।

ঠিক সেই সময় বন্ধুদের সঙ্গে গোয়ায় ছিলেন অঞ্জলি। সেখানেই আসে শানু শর্মার বার্তা। এরপর করণ জোহরের ছবির জন্য অডিশনের সুযোগ পান তিনি। অঞ্জলির ছবি ও অডিশন দেখে করণ জোহর পছন্দ করেন তাঁকে; আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বড় পর্দার নতুন অধ্যায়।

মায়েরও বিশ্বাস ছিল না
করণ জোহরের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা মাকে বলেছিলেন অঞ্জলি; কিন্তু মেয়ের কথায় মা খুব একটা আশাবাদী হতে পারেননি; বরং রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘তোকে কেন তিনি দেখা করতে বলবেন?’

অঞ্জলির পরিবারে করণ জোহরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা বিশেষ প্রভাবশালী পরিচিতি ছিল না। তাঁর মা-ও জানিয়েছিলেন, মেয়েকে বলিউডে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়ার মতো কোনো ‘ব্যাকিং’ তাঁদের ছিল না। ফলে করণ জোহরের ছবিতে অঞ্জলির অডিশন দেওয়াটাই তাঁর পরিবারের কাছে ছিল বড় ব্যাপার।

শুরুটা হয়েছিল টেলিভিশন দিয়ে
বড় পর্দায় আসার আগে অঞ্জলি টেলিভিশনে কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে ‘উনট্যাগড’ ও ‘ঢাই কিলো প্রেম’ দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করেন। পরে ‘কুলফি কুমার বাজেওয়ালা’তেও অভিনয় করেন। টেলিভিশনের কাজই তাঁকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি এনে দেয়।

অঞ্জলি আনন্দ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘ঢাই কিলো প্রেম’ ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস সাইজ দুই মানুষের প্রেমের গল্পের এই সিরিজে অঞ্জলির অভিনয় প্রশংসিত হয়। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, এই কাজ তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করেছিল।

তবে টেলিভিশনে কাজ করার পাশাপাশি সিনেমায় অভিনয়ের স্বপ্নও ছিল তাঁর। অঞ্জলি নিজেই বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই সিনেমায় কাজ করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু নিজের উচ্চতা ও শরীরের গড়নের কারণে মনে করতেন, বলিউডের প্রচলিত নায়িকার চেহারার সঙ্গে তিনি মানানসই নন। এমনকি প্রথম দিকে টেলিভিশনেও সুযোগ পাবেন বলে ভাবেননি।

‘বেল বটম’-এ চরিত্র নিয়েও হতাশা
অঞ্জলির বড় পর্দায় প্রথম কাজ ‘বেল বটম’; কিন্তু ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল খুবই ছোট। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অঞ্জলি বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, ছবিতে তাঁকে রাখা হয়েছিল শুধু এমন একটি দৃশ্যের জন্য, যেখানে একজন সন্ত্রাসী তাঁর ওপর পড়ে ধরা পড়ে যায়।

এই অভিজ্ঞতা নিয়ে হতাশা লুকাননি তিনি। অঞ্জলির অভিযোগ, প্লাস সাইজ অভিনেতাদের অনেক সময় অভিনয়দক্ষতার ভিত্তিতে নয়, শরীরের গড়ন অনুযায়ী চরিত্র দেওয়া হয়। তাঁদের কমেডির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় কিংবা এমন চরিত্রে দেখা যায়, যেখানে শরীরটাই হয়ে ওঠে মূল বিষয়।
অঞ্জলির মতে, একজন অভিনেতা মোটা হলেই যে তাঁর চরিত্রের কাজ হবে বেশি খাওয়া, কারও ওপর পড়ে যাওয়া কিংবা দর্শককে হাসানো—এমন ধারণা বদলানো দরকার।

অঞ্জলি আনন্দ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘রকি অউর রানি’ বদলে দেয় সবকিছু
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ অঞ্জলির ক্যারিয়ারের বড় বাঁক। রণবীর সিংয়ের বোন গায়ত্রী রনধাওয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি তাঁকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।

করণ জোহরের ধর্মা প্রোডাকশনের ছবিতে সুযোগ পাওয়াটা অঞ্জলির কাছে ছিল স্বপ্নপূরণের মতো। তিনি জানান, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল প্রথম সিনেমাটি যেন ধর্মা প্রোডাকশনের হয়। এমনকি পরিচিতদের বলতেন, একদিন করণ জোহর তাঁকে ছবিতে নেবেন। পরে সেটিই সত্য হয়।

ছবিতে রণবীর সিংয়ের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক ছিল অঞ্জলির। মুক্তির আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, শুটিংয়ের প্রথম দিন থেকেই রণবীর তাঁকে সহযোগিতা করেছেন।

চরিত্র পেলেও নতুন সমস্যার শুরু
‘রকি অউর রানি’ অঞ্জলিকে পরিচিতি দিলেও শরীরের গড়ন নিয়ে ইন্ডাস্ট্রির দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলায়নি; বরং অঞ্জলির মতে, ছবিতে শরীর নিয়ে আত্মসম্মানের কথা বলা চরিত্রে অভিনয় করার পরও তাঁকে নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রের মধ্যে আটকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

২০২৬ সালে ‘স্ক্রিন’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘রকি অউর রানি’তে তাঁর চরিত্র শরীর নিয়ে অপমানের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল। আগে সিনেমায় মোটা মেয়েদের প্রায়ই শুধু খাওয়াদাওয়া বা কমেডির অংশ হিসেবে দেখানো হতো। তাঁর চরিত্র সেই জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছিল। তবে একই সঙ্গে সেই সাফল্য তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ‘বক্স’-এর মধ্যেও আটকে দিয়েছিল বলে মনে করেন অঞ্জলি। পরে ‘ডাব্বা কার্টেল’ ও ‘রাত জওয়ান হ্যায়’-এর মতো কাজের মাধ্যমে সেই গণ্ডি ভাঙার চেষ্টা করেছেন তিনি।

অঞ্জলি আনন্দ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘আমি মোটা, তাই কি অভিনেত্রী নই?’
২০২৬ সালে ‘ধামাল ৪’-এ অভিনয়ের পর আবারও শরীর নিয়ে মন্তব্যের মুখে পড়েন অঞ্জলি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে কটাক্ষও হয়েছে। অঞ্জলি প্রকাশ্যে সেই ট্রলিংয়ের জবাব দিয়েছেন।

অঞ্জলির বক্তব্য, মানুষ এখনো তাঁকে তাঁর শরীর দিয়ে বিচার করে। অথচ এত বছর ধরে কাজ করার পরও যদি একজন অভিনেতাকে শুধু ওজনের ভিত্তিতে বিচার করা হয়, তাহলে সমস্যা শুধু একজন শিল্পীর নয়, পুরো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির।
‘ধামাল ৪’-এ শরীর নিয়ে রসিকতা থাকার পরও কেন ছবিতে অভিনয় করলেন—এমন প্রশ্নের জবাবেও অঞ্জলি বলেন, কোনো চরিত্রে অভিনয় করা মানেই সেই চরিত্রের বক্তব্যকে সমর্থন করা নয়। তাঁর যুক্তি, একজন অভিনেতাকে তাঁর শরীরের মাপ দিয়ে বিচার না করে তিনি কী করতে পারেন, সেটি দেখা উচিত।

একসময় কাজের অপেক্ষা, এখন বড় ছবিতে
অঞ্জলির ক্যারিয়ার তাই একরকম উল্টো পথের গল্প। যে অভিনেত্রী একসময় ছয় মাসের সঞ্চয় হারিয়ে অভিনয় ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তিনিই এখন বড় বাজেটের হিন্দি ছবির অংশ।

‘ধামাল ৪’-এ অজয় দেবগন, রীতেশ দেশমুখ, আরশাদ ওয়ারসি, জাভেদ জাফরিসহ বড় তারকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে