পর্দার বাইরে বারবার বিতর্কে দিনো মোরিয়া। কোলাজ
পর্দার বাইরে বারবার বিতর্কে দিনো মোরিয়া। কোলাজ

বিপাশার সঙ্গে প্রেম থেকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, পর্দার বাইরে বারবার বিতর্কে দিনো মোরিয়া

একসময় বলিউডে তাঁর পরিচয় ছিল সুদর্শন, দীর্ঘদেহী এক মডেল-অভিনেতা হিসেবে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বিজ্ঞাপন ও ফ্যাশন–দুনিয়ায় পরিচিতি, এরপর সিনেমায় অভিষেক। ২০০২ সালে ‘রাজ’-এর সাফল্যের পর রাতারাতি পরিচিত হয়ে ওঠেন দিনো মোরিয়া। তাঁর পাশে তখন বিপাশা বসু, পর্দায় রহস্য, প্রেম আর ভয়—সব মিলিয়ে ‘রাজ’ তাঁকে বলিউডের আলোচনায় নিয়ে আসে।

তারপর অবশ্য পথটা সব সময় মসৃণ ছিল না। একের পর এক সিনেমা, কিছু সাফল্য, অনেক ব্যর্থতা, ধীরে ধীরে বড় পর্দা থেকে দূরে সরে যাওয়া—আবার ওটিটির হাত ধরে নতুন করে আলোচনায় ফেরা। ‘দ্য এম্পায়ার’-এ ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘হাউসফুল ৫’-এর মতো বড় ছবিতেও দেখা গেছে তাঁকে।

কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দিনো মোরিয়ার নাম সিনেমার চেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তদন্ত ও আইনি জটিলতার প্রসঙ্গে। দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর নতুন তদন্তে তাঁর নাম উঠে এসেছে। তারপর এবার মুম্বাইয়ের মিঠি নদীর পলি অপসারণ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের তদন্তে তাঁকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। যা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় অভিনেতা।

মডেলিং থেকে বলিউড
দিনো মোরিয়ার গল্পটা শুরু হয়েছিল সিনেমা দিয়ে নয়, মডেলিং দিয়ে। ১৯৯৫ সালে গ্ল্যাডর‍্যাগস ম্যানহান্ট প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পর ফ্যাশন–দুনিয়ায় তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে। সুদর্শন চেহারা, লম্বা গড়ন ও ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছন্দ উপস্থিতির কারণে নব্বইয়ের দশকের মডেলিং জগতে দ্রুত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
সেই সময় বলিউডে মডেলদের অভিনেতা হয়ে ওঠা নতুন কিছু ছিল না। শাহরুখ খান, অর্জুন রামপালসহ অনেকেই মডেলিং থেকে সিনেমায় এসেছেন। দিনোর ক্ষেত্রেও পথটা ছিল অনেকটা একই।

দিনো মোরিয়া। অভিনেতার ফেসবুক থেকে

১৯৯৯ সালে ‘পেয়ার মে কভি কভি’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক। এরপর দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমাতেও কাজ করেন। কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০০২ সালের ‘রাজ’। বিক্রম ভাটের পরিচালনায় ছবিতে বিপাশা বসুর বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকের নজরে আসেন তিনি। ছবিটির সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে দিনো-বিপাশার জুটিও তখন ব্যাপক আলোচনায় আসে।

‘রাজ’-এর পর ‘গুনাহ’, ‘প্ল্যান’, ‘রক্ত’, ‘আকসর’, ‘ফাইট ক্লাব’, ‘টম, ডিক অ্যান্ড হ্যারি’, ‘আপ কি খাতির’সহ বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করেন দিনো। কখনো রোমান্টিক নায়ক, কখনো অ্যাকশন চরিত্র, কখনো থ্রিলারের নায়ক—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁকে দেখা গেছে।

তবে একটি সমস্যা ছিল। দিনো তাঁর অভিনয়জীবনে ‘রাজ’-এর মতো বড় সাফল্য ধারাবাহিকভাবে আসেনি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলিউডের প্রথম সারির নায়ক হিসেবে তাঁর জায়গা শক্ত হয়নি।

একসময় আলোচনায় প্রেমও
দিনো মোরিয়ার ব্যক্তিজীবনও তাঁর জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ ছিল। বিশেষ করে বিপাশা বসুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক বলিউডে বহুল আলোচিত ছিল।
‘রাজ’-এ একসঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের সম্পর্ক আরও আলোচনায় আসে।

দুজনকে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা জুটি হিসেবে দেখা হতো। পরে অবশ্য সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। বিপাশা বসুর জীবনে পরে জন আব্রাহাম, এরপর করণ সিং গ্রোভারের অধ্যায় আসে। অন্যদিকে দিনো নিজের ব্যক্তিজীবন নিয়ে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই নীরব থেকেছেন।
সময়ের সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ারেও পরিবর্তন আসে।

বড় পর্দা থেকে ওটিটি
২০১০-এর দশকে দিনোকে আগের মতো নিয়মিত বড় পর্দায় দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তখনই বদলে যাচ্ছিল ভারতের বিনোদন–দুনিয়া। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নতুন ধরনের গল্প ও চরিত্রের সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।

দিনোও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। ‘মেন্টালহুড’, ‘হস্টেজেস’, ‘তাণ্ডব’, ‘কৌন বনেগি শিখরবতী’সহ একাধিক ওয়েব সিরিজে অভিনয় করেন তিনি। ২০২১ সালের ‘দ্য এম্পায়ার’-এ মোগল আমলের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এই কাজের জন্য ইন্ডিয়ান টেলিভিশন একাডেমি অ্যাওয়ার্ডও পান তিনি।
২০২৫ সালের ‘হাউসফুল ৫’-এও তাঁকে দেখা যায়।

দিনো মোরিয়া। অভিনেতার ফেসবুক থেকে

তারপর দিশা সালিয়ান প্রসঙ্গ
২০২৬ সালে এসে দিনো মোরিয়ার নাম ফের বড় ধরনের বিতর্কে আসে দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর তদন্তকে ঘিরে।

দিশা সালিয়ান ছিলেন অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের সাবেক ম্যানেজার। ২০২০ সালের ৮ জুন মুম্বাইয়ের মালাডে একটি বহুতল ভবন থেকে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। মুম্বাই পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখেছিল। পরে ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে আসে।

ছয় বছর পর দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান বোম্বে হাইকোর্টে নতুন করে তদন্তের আবেদন করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে এবং ঘটনার তথ্যপ্রমাণ আড়াল করা হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য তদন্তাধীন এবং আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা এখনো সেগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ঘোষণা করেনি।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বোম্বে হাইকোর্টের নির্দেশের পর সিবিআই নতুন করে তদন্ত শুরু করে ও এফআইআর করে।

সেই এফআইআরে দিনো মোরিয়ার নামও আসে। একই সঙ্গে রিয়া চক্রবর্তী, সুরজ পাঞ্চোলি, আদিত্য ঠাকরে, রোহান রায়সহ আরও কয়েকজনের নাম নথিতে রয়েছে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নাম থাকা মানেই অভিযুক্ত হওয়া নয়।
‘ইন্ডিয়া টুডে’ জানিয়েছে, এফআইআরে দিনোসহ যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের কাউকেই ওই পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়নি। তাঁদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা হবে।

এবার মিঠি নদীর মামলা
দিশা সালিয়ান তদন্তের মধ্যেই নতুন করে দিনোর নাম আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মামলায়—মুম্বাইয়ের মিঠি নদীর পলি অপসারণ প্রকল্পে কথিত আর্থিক অনিয়মের তদন্তে।

মুম্বাইয়ের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা অভিযোগ খতিয়ে দেখছে, নদী পরিষ্কার ও পলি অপসারণের কাজে প্রায় ৬৫ কোটি ৫৪ লাখ রুপির ক্ষতি হয়েছে কি না। তদন্তে কথিত ভুয়া কাজের নথি, বাড়তি বিল, দরপত্রে অনিয়ম এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দিনো মোরিয়াকে এই মামলায় এর আগেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে তাঁকে এবং তাঁর ভাই স্যান্টিনো রোকো মোরিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ২ অক্টোবর তাঁকে আবার ডাকা হয়।

হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, তদন্তকারীরা ফোন রেকর্ডের মাধ্যমে মোরিয়া ভাইদের সঙ্গে মামলার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য পেয়েছিলেন। তাঁদের একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও তদন্তের আওতায় এসেছে।
২ অক্টোবর দিনো মোরিয়ার বাসায় গিয়ে তদন্তকারীরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং কিছু নথি পরীক্ষা করেন। পরে তাঁকে মুম্বাই পুলিশ সদর দপ্তরের কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, সেখানে প্রায় ছয় ঘণ্টা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অন্য কিছু প্রতিবেদনে সময়টি প্রায় আট ঘণ্টা বলা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দিনো পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বেরিয়ে যান। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তাঁকে আবার ডাকা হতে পারে।