১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আরাধনা’—যে ছবি রাজেশ খান্নাকে এক রাতের মধ্যে সুপারস্টারে পরিণত করেছিল—সেই ছবিটিই নাকি শুরুতে করতে চাননি তিনি! রাজেশ খান্নার ধারণা ছিল, ছবিটি ‘নায়িকানির্ভর’। এমনকি নির্মাতা-প্রযোজক শক্তি সামন্তকে তিনি প্রশ্নও করেছিলেন, ‘আমি কী করব?’
সম্প্রতি রেডিও নাশাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘আরাধনা’ ছবির নির্মাণপর্ব নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন শক্তি সামন্তের ছেলে আসীম সামন্ত। উঠে এসেছে রাজেশ খান্নার অনীহা থেকে শুরু করে শর্মিলা ঠাকুরের শুটিং ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাও।
হঠাৎ সিদ্ধান্তেই ‘আরাধনা’
আসীম সামন্ত জানান, ‘বাবার সঙ্গে শাম্মী কাপুরের একটি ছবি করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ওজন বেড়ে যাওয়ায় ছয় মাস সময় চান। তখন বাবা নতুন একটি ছবি করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় ইউনাইটেড প্রডিউসার্স-এর সঙ্গে রাজেশ খান্নার ১২ ছবির চুক্তি ছিল। তাই বাবাই ঠিক করেন, রাজেশ খান্নাকে নিয়ে ছবি করবেন।’
আসীম সামন্ত আরও বলেন, ‘এই সময় সচীন ভৌমিক বাবাকে “আরাধনা” ছবির গল্প শোনান। প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে এই গল্প শোনানো হয়েছিল। এত দিন পরও বাবা গল্পটি মনে রেখেছিলেন। তখনই তিনি বুঝেছিলেন, এটি ভালো গল্প। শেষ পর্যন্ত এই ছবিটি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
রাজেশ খান্নার অনীহা
কীভাবে রাজেশ খান্না ছবির নায়ক হলেন, সে প্রসঙ্গে আসীম সামন্ত বলেন, ‘বাবা তখন নাসির হুসেইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সে সময় নাসির “বাহারোঁ কি সপনে” বানাচ্ছিলেন, যেখানে রাজেশ খান্না অভিনয় করছিলেন। বাবা অনুরোধ করেন, ছবিটির একটি রিল দেখাতে। সেটি দেখে বাবার ভালো লাগে এবং তিনি রাজেশ খান্নাকে সই করান।’
তবে গল্প শোনার পর রাজেশ খান্না নাকি আগ্রহ দেখাননি। আসীমের ভাষায়, ‘রাজেশ বলেছিলেন, এটা তো নায়িকানির্ভর ছবি—“আমি কী করব?” বাবা তাঁকে বোঝান, এটা ভালো ছবি হবে, হিট করবে। আসলে রাজেশ এই ছবি করতে চাইছিলেন না। কিন্তু ইউনাইটেড প্রডিউসার্স-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকার কারণেই তিনি করতে বাধ্য হন। নাহলে হয়তো করতেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি করলেন, আর ছবিটি সুপারহিট হলো।’
এক প্রিমিয়ারেই বদলে গেল ইতিহাস
‘আরাধনা’ রাজেশ খান্নার জীবন কীভাবে বদলে দিল, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন আসীম সামন্ত নিজেই। তিনি জানান, ‘ছবিটি প্রথম মুক্তি পায় দিল্লিতে। মুম্বাইয়ে মুক্তি পায় এক সপ্তাহ পরে। দিল্লির প্রিমিয়ারে আমরা গিয়েছিলাম। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জগজীবন রাম ছিলেন প্রধান অতিথি। তখন রাজেশ খান্না ছিলেন একেবারেই নতুন মুখ। দর্শকদের কেউই তাঁকে নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না। সবাই শর্মিলা আর গান নিয়েই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছিল।’
কিন্তু বিরতির পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ‘বিরতির সময়েই সবাই তাঁর ভক্ত হয়ে যায়। আর ছবি শেষ হতে হতে রাজেশ খান্না পুরোপুরি তারকা। হঠাৎ করেই ভিড় তাঁকে ঘিরে ধরে, অটোগ্রাফ চাইতে থাকে।’
শর্মিলা ঠাকুরের হঠাৎ শুটিং বাতিল
একই সাক্ষাৎকারে আসীম সামন্ত জানান, ছবির জনপ্রিয় গান ‘মেরে সপনো কি রানি’ প্রায় বড় সমস্যায় পড়তে বসেছিল। ‘শেষ মুহূর্তে শর্মিলা ঠাকুর শুটিং বাতিল করেন। তিনি জানান, সত্যজিৎ রায় তাঁকে ডেকেছেন, আর তাঁকে না বলা সম্ভব নয়। বাবা খুব রেগে গিয়েছিলেন, কিন্তু কিছু করার ছিল না। তাই রাজেশ খান্না আর সুজিত কুমারকে নিয়ে পুরো গানটির শুটিং করা হয়। পরে বাইরে একটি কামরার সেট বানিয়ে শর্মিলার ক্লোজআপ শট নেওয়া হয়,’ বলেন আসীম সামন্ত।
শর্মিলা ঠাকুরের ব্যাখ্যা
এই ঘটনা নিয়ে পরে দ্য হলিউড রিপোর্টার-এ নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। তিনি বলেন, ‘সত্যজিৎ রায় ফোন করে বলেছিলেন, “এক মাস সময় দেবে? মে মাসে তোমাকে দরকার।” না ভেবেই আমি হ্যাঁ বলে ফেলি। ফোন রেখে হঠাৎ মনে পড়ে—ওই একই মে মাসে শক্তি সামন্তের ছবিতে আমি চুক্তিবদ্ধ।’
শর্মিলা ঠাকুর আরও জানান, ‘রাজেশ খান্না তখন খুব ব্যস্ত ছিলেন। ১২ জন প্রযোজকের ছবির জন্যই তাঁকে সময় দিতে হচ্ছিল। তাঁর ডেট খুবই মূল্যবান ছিল। আমি শক্তিজিকে বলি, এই ছবিটা আমাকে করতেই হবে। কোনোমতে সমঝোতা করে সত্যজিৎ রায়ের ছবিটা সেরে আবার অন্য ছবিতে ফিরে যাই।’
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে