
পঞ্চাশের দশকের বলিউডে পর্দায় রাজত্ব করেছিলেন মালা সিনহা। ‘পিয়াসা’, ‘ধুল কা ফুল’, ‘গুমরাহ’, ‘আঁখে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে তিনি ছিলেন প্রধান নায়িকা। গুরু দত্ত, ধর্মেন্দ্র, শশী কাপুর, মনোজ কুমার—তৎকালীন বড় বড় তারকার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, ছিলেন যশ চোপড়ার প্রথম পরিচালিত ছবির নায়িকাও। একসময় তাঁর অভিব্যক্তিপূর্ণ চোখ আর গানে উপস্থিতি তাঁকে রুপালি পর্দার অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকায় পরিণত করেছিল।
আলোচিত এক অভিনেত্রী
১৯৫৪ সালে ‘বাদশাহ’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে মালা সিনহার। এরপর তিনি একে একে ১২০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। গুরু দত্ত, অশোক কুমার, দিলীপ কুমার, ধর্মেন্দ্র, মনোজ কুমার থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গেও তিনি পর্দা ভাগ করেছেন সমানতালে। পুরুষ তারকাদের সমান পারিশ্রমিক পাওয়া ছিল বিরল ঘটনা, সেখানে মালা সিনহা সে কীর্তিও গড়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৮ সালে হঠাৎ এক কেলেঙ্কারিতে ভেঙে পড়ে তাঁর কর্মজীবনের ভিত।
কী ঘটেছিল
১৯৭৮ সালে আয়কর দপ্তর মালা সিনহার বাড়িতে হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ ‘কালোটাকা’ উদ্ধার করে। আয়করের রেকর্ডে দেখা যায়, ১২ লাখ রুপি তাঁর বাথরুমে লুকিয়ে রাখা ছিল। পুরো টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়।
বছর কয়েক আগে প্রয়াত অভিনেত্রী তাবাসসুম তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে দীর্ঘদিনের বন্ধু মালা সিনহার জীবনের এ অধ্যায়ের কথা শোনান। মালা সিনহা তাবাসসুমকে বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের কথা যদি বলি, তখন আমি বলিউডের শীর্ষ নায়িকা। প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছি। আমি বলেছিলাম, সাদা টাকা করেছি, কালোটাকাও করেছি। তার মানে, কর দপ্তরে সব আয়ের হিসাব দিইনি।’
মালা আরও জানিয়েছিলেন, তাঁর ১২ লাখ রুপি বাথরুমে লুকিয়ে রাখেন। আয়কর দপ্তর খবর পেয়ে বাথরুম ভেঙে টাকা নিয়ে যায়। খবর শুনে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী।
পরে মালার বাবা অ্যালবার্ট সিনহা আদালতে মামলা করেন টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য। তাঁর দাবি ছিল, এটা তাঁর ‘কষ্টার্জিত অর্থ’। কিন্তু আইনজীবীরা জানিয়ে দেন, ‘কালোটাকা’ ফেরত পাওয়া যাবে না। তখন তাঁরা বলেন, একটাই উপায়, মালা সিনহাকে আদালতে হাজির হয়ে স্বীকার করতে হবে যে চলচ্চিত্র ছাড়া আরও উপায়ে তিনি আয় করেছেন, আর সেটিই তাঁর ব্যক্তিগত উপার্জন।
মালা তখন তাবাসসুমকে বলেন, ‘আমি আদালতে গিয়ে সেই কথা স্বীকার করেছিলাম। টাকা ফেরত পাই, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে রইল, আমি এমন কিছু স্বীকার করেছিলাম, যা কোনো দিন করিনি।’
অন্ধকার সেই অধ্যায়
এই কেলেঙ্কারি মালা সিনহার ক্যারিয়ারকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আশির দশকে তাঁকে আর আগের মতো চলচ্চিত্রে দেখা যাননি। আদালতে মামলা গড়ালে মালা সিনহার জবাব ছিল আরও বিস্ময়কর। আইনি চাপে পড়ে তিনি স্বীকার করেন একসময়ে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ওই অর্থ সেভাবেই উপার্জন করেছেন। শোনা যায়, মালা সিনহাকে এ পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁর বাবা ও আইনজীবী। উদ্দেশ্য ছিল, কঠিন শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো।
এই স্বীকারোক্তির খবরে রাতারাতি তছনছ হয়ে যায় তাঁর ইমেজ। পরিচালক-প্রযোজকেরা মুখ ফিরিয়ে নেন। বড় বড় প্রস্তাব হাতছাড়া হয়। সহশিল্পীরাও তাঁর সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। যে নায়িকা একসময় কোটি টাকার সম্পদের মালিক ছিলেন, তিনি হঠাৎই হয়ে ওঠেন বলিউডের একঘরে।
নেপাল-যোগ
নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি। গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে নেপালে চলমান রাজনৈতিক সংকটের আপাতসমাধান হলো বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সুশীলা কারকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় নতুন করে আবার উঠেছে মালা সিনহা প্রসঙ্গ। কারণ, অনেক বছর আগে সুশীলার স্বামী দুর্গা প্রসাদ সুবেদি মালা সিনহাকে বহন করা বিমান ছিনতাই করেছিলেন! ঘটনাটি ১৯৭৩ সালের ১০ জুনের। বিরাটনগর থেকে কাঠমান্ডুর পথে উড়ছিল রয়্যাল নেপাল এয়ারলাইনসের একটি কানাডায় নির্মিত ১৯ আসনের টুইন অটার বিমান। বিমানে যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন বলিউড তারকা মালা সিনহা ও তাঁর স্বামী, নেপালি অভিনেতা সি পি লোহানি।
বিমানের ককপিট দখল করেন নেপালি কংগ্রেসের তিন তরুণ কর্মী—দুর্গা প্রসাদ সুবেদি, নাগেন্দ্র ধুঙ্গেল ও বসন্ত ভট্টরাই। পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন গিরিজা প্রসাদ কৌরালা, যিনি পরে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তখন সদ্য জেল থেকে ছাড়া পাওয়া সুবেদি ছিলেন কৌরালার ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
এই ছিনতাইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য অর্থ জোগাড় করা। বিমানে সরকারের ৩০ লাখ রুপি বহন করা হচ্ছিল। ক্রুর সঙ্গে অল্প সময়ের টানাপোড়েন শেষে ছিনতাইকারীরা বিমানের পাইলটকে বাধ্য করেন ভারতের বিহারের ফরবিশগঞ্জে ঘাসের মাঠে নামাতে। সেখানে আগেই অপেক্ষা করছিলেন আরও পাঁচ সহযোগী, তাঁদের মধ্যে ছিলেন পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সুশীল কৌরালা।
ছিনতাইকারীরা বিমানের ভেতর থেকে নগদ টাকাভর্তি তিনটি বাক্স নামিয়ে নেন। এরপর অন্য যাত্রীদের নিয়ে বিমানটি আবার উড্ডয়ন করে। টাকা ট্রাকে করে দার্জিলিংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
সুশীলা ভারতে পড়াশোনার সময়ই বারানসির বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএইচইউ) দুর্গা সুবেদির সঙ্গে পরিচিত হন। সুবেদির সেই অতীত এখন আবার আলোচনায়।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, নিউজ ১৮