
নিজেকে আলাদা করেন তাঁর এক্সপ্রেশন দিয়ে। কেবল চোখ আর মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে তিনি চরিত্রের আবেগ যেভাবে তুলে ধরেন, সেটা এই সময়ে ভারতের খুব কম অভিনেতাই করতে পারেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে নায়ক, খলনায়ক সব ধরনের চরিত্রেই তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি আর কেউ নন, অক্ষয় খান্না। সাম্প্রতিক সময়ে অভিনেতা আবার আলোচনায় ‘ধুরন্ধর’ দিয়ে। আজ এই অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
তারকা পরিবারে জন্ম
তিনিও তারকা পরিবারের সন্তান, বাবা বিনোদ খান্না হিন্দি সিনেমার আলোচিত অভিনেতা। কিন্তু তারকার সন্তান হিসেবে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার দুর্নাম তাঁর বিরুদ্ধে নেই। তিনি শাহরুখ খান বা সালমান খানের মতো জনপ্রিয় নন, কিন্তু তাঁর আলাদা ভক্ত-অনুসারী সব সময়ই ছিল। ইচ্ছা হলেই কাজ থেকে বিরতি নেন, যখন ফেরেন প্রবলভাবেই ফেরেন। সেটা ‘ধুরন্ধর’ দিয়ে আরও একবার প্রমাণ করেছেন।
শুরুর গল্প
১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ মুম্বাইয়ে জন্ম অক্ষয় খান্নার। ছোটবেলায় পড়ার চেয়ে খেলায় মন ছিল বেশি। একটা সময় খেলোয়াড় হতেও চেয়েছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিনয়েও নাম লেখান। ১৯৯৭ সালে ‘হিমালয় পুত্র’ দিয়ে অভিষেক। তবে আলোচনায় আসেন ‘বর্ডার’ সিনেমা দিয়ে বহু তারকার মধ্যেও আলাদাভাবে নজর কাড়েন।
তবে সাধারণ দর্শকের কাছে অক্ষয় পরিচিতি পান ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আ আব লটে চলে’ সিনেমা দিয়ে। ঐশ্বরিয়া রাইয়ের সঙ্গে তাঁর রসায়ন প্রশংসিত হয়। এরপর একে একে ‘তাল’, ‘দিল চাহতা হ্যায়’, ‘হামরাজ’, ‘হালচাল’, ‘গান্ধী, মাই ফাদার’ ইত্যাদি সিনেমা দিয়ে অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০১০ সালের পর থেকে ক্যারিয়ারে খারাপ সময় পার করেছেন। এ সময় যেসব সিনেমা করেছেন, সেগুলোতে ঠিক পুরোনো অক্ষয়কে খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবে ভক্তরা জানতেন, অক্ষয় ঠিকই ফিরবেন।
বিরতির পর
‘ইত্তেফাক’-এর রিমেকে পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন হয় অক্ষয়ের। এরপর ‘মম’, ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’, ‘দৃশ্যম ২’ ও ‘সেকশন ৩৭৫’ সিনেমায় নিজের ছাপ রাখেন।
‘আওরঙ্গজেব’ আর ‘রেহমান ডাকাত’ হয়ে আলোচনায়
গত বছরের শুরুতে মুক্তি পায় লক্ষ্মণ উতেকরের সিনেমা ‘ছাবা’। এ ছবিতে ‘আওরঙ্গজেব’ চরিত্রে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। তবে তখন কে জানত, চমক আরও বাকি আছে। এবার তাঁকে পাওয়া গেল আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ সিনেমায়। এখানে তাঁকে দেখা গেছে ‘রেহমান ডাকাত’–এর চরিত্রে। মনে করা হয়েছে, পাকিস্তানের করাচির কুখ্যাত গ্যাংস্টার রেহমান ডাকাতের প্রেরণায় নির্মিত হয়েছে তাঁর চরিত্রটি।
‘দৃশ্যম’ বিতর্ক
‘ধুরন্ধর’ দিয়ে আলোচনার পর দর্শকেরা যখন অভিনেতার নতুন সিনেমার অপেক্ষায়, তখনই জানা গেল ‘দৃশ্যম ৩’ থেকে বাদ পড়েছেন অক্ষয়! ‘দৃশ্যম ৩’ থেকে অক্ষয় খান্না বাদ পড়া নিয়ে ছবিটির প্রযোজক কুমার মঙ্গত পাঠক সরাসরি অভিযোগ তুললেন অক্ষয়ের বিরুদ্ধে। তিনি জানান, অক্ষয়ের ‘অপেশাদার আচরণে’ তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এ কারণে অভিনেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেন, অক্ষয়ের জায়গায় অভিনয় করবেন জয়দীপ আহলাওয়াত।
কুমার মঙ্গত পাঠক বলেন, ‘আমরা অক্ষয় খান্নার সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম। তাঁর পারিশ্রমিকও বহুবার আলোচনার পর চূড়ান্ত করা হয়।’ প্রযোজক জানান, শুরুর দিকে তিনি চরিত্রে পরচুলা পরতে চান। কিন্তু পরিচালক অভিষেক পাঠক তাঁকে বোঝান, এটি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, আগের কিস্তি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হবে নতুনটি। হঠাৎ চুল এসে যাওয়ার বিষয়টি কন্টিনিউটির সমস্যা তৈরি করবে। প্রযোজক জানান, প্রাথমিকভাবে পরিচালকের এই যুক্তি তখন অক্ষয় মেনে নেন।
প্রযোজকের অভিযোগ, পরে অক্ষয়ের আশপাশের লোকজন তাঁকে আবার পরচুলা পরার বিষয়ে উসকানি দেন। ‘তাঁরা বলেছিলেন, উইগ পরলে তাঁকে আরও স্মার্ট দেখাবে। এরপর অক্ষয় আবার সেই দাবি তোলেন। অভিষেক তখনো আলোচনায় বসতে রাজি ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই অক্ষয় জানিয়ে দেন, তিনি আর ছবিটি করতে চান না,’ বলেন কুমার।
কুমার মঙ্গত পাঠক আরও বলেন, ‘একসময় অক্ষয় খান্না কার্যত কিছুই ছিলেন না। সেই সময়ই আমি তাঁকে নিয়ে ২০১৯ সালে “সেকশন ৩৭৫” বানাই। তখনো অনেকেই আমাদের সতর্ক করেছিলেন—তাঁর আচরণ নাকি খুবই অপেশাদার। সেটে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিষাক্ত।’
এই ছবি তাঁকে নতুন করে পরিচিতি দেয়। এরপর আমি তাঁকে “দৃশ্যম ২”-তে নিই। ওই ছবির পরেই তাঁর কাছে বড় বড় প্রস্তাব আসতে শুরু করে। তার আগে তিন-চার বছর তিনি ঘরেই বসে ছিলেন।’
এই প্রযোজক জানান, আলিবাগে অক্ষয়ের খামারবাড়িতে যখন তাঁকে চিত্রনাট্য শোনানো হয়, তখন তিনি ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ‘তিনি বলেছিলেন, “এটা ৫০০ কোটির ছবি। জীবনে এমন স্ক্রিপ্ট শুনিনি।” তিনি পরিচালক অভিষেক পাঠক আর লেখককে জড়িয়ে ধরেন। এরপর পারিশ্রমিক ঠিক হয়, চুক্তি সই হয়। আমরা তাঁকে অগ্রিম দিই, তাঁর পোশাকের জন্য ডিজাইনারকেও টাকা দেওয়া হয়। আর শুটিংয়ের মাত্র ১০ দিন আগে তিনি ছবি ছেড়ে দেন।’
পরে সিনেমাটিতে অক্ষয়ের চরিত্রে নেওয়া হয়েছে জয়দীপ আহালওয়াতকে।
অক্ষয় কেন আলাদা
অক্ষয় খান্না নিজেকে আলাদা করেন তাঁর এক্সপ্রেশন দিয়ে। কেবল চোখ আর মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে তিনি চরিত্রের আবেগ যেভাবে তুলে ধরেন, সেটা এই সময়ে ভারতের খুব কম অভিনেতাই করতে পারেন।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকে নায়ক, খলনায়ক সব ধরনের চরিত্রেই তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ‘ধুরন্ধর’ সিনেমার রিভিউতে যেমন সমালোচক অনুপমা চোপড়া বলেছেন, ‘ছবির অন্য নায়কদের পারফরম্যান্সের জন্য পেশি দেখাতে হয়েছে, কিন্তু অক্ষয়ের কিছুই লাগেনি। স্রেফ কেবল এক্সপ্রেশন দিয়েই অন্যদের ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।’
ব্যক্তিজীবনে ‘একা’
অভিনয় ছাড়াও অক্ষয় খানার ব্যক্তিজীবনও বরারই আলোচনায় থাকে। ৫০ বছর বয়সেও তিনি বিয়ে করেননি, কোনো অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনও নেই। এই সময়ে এসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এড়িয়ে চলেন, পারতপক্ষে সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দেন না। তবে মজার ব্যাপার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না থাকলেও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে প্রবলভাবে চর্চায় তিনি। এক ‘ধুরন্ধর’ মুক্তির পর তাঁকে নিয়ে কত রিলস, শর্টস আর মিম হয়েছে, ইয়ত্তা নেই।
ব্যক্তিজীবনে একা থাকা প্রসঙ্গে বলিউড হাঙ্গামাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অক্ষয় বলেছিলেন, ‘আমি জীবনে দায়িত্ব পছন্দ করি না। আমি চাই খুবই অবাধ জীবন যাপন করতে। সন্তানের কোনো বড় দায়িত্ব নেই, স্ত্রীর দায়িত্ব নেই—সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এসব। আমি সেটা চাই না। আমি একাই সুখী। কোনো দায়িত্ব নেই। কারও দেখাশোনা করতে হবে না, কারও নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। শুধু নিজের দায়িত্ব নিজেই নেব। অসাধারণ জীবন পেয়েছি। দুর্দান্ত। কেন সেটা নষ্ট করব?’
হিন্দুস্তান টাইমস, ফিল্মফেয়ার, বলিউড হাঙ্গামা অবলম্বনে