একসময় বলিউডের সম্ভাবনাময় নায়িকাদের একজন ছিলেন মনিকা বেদি। হিন্দি, তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবি ও বাংলা—বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন। কিন্তু অভিনয়ের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনই একসময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় খবর। ভারতের কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আবু সালেমের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে মনিকা বেদির ক্যারিয়ার কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। জেল, আদালত, ভুয়া পাসপোর্ট মামলা এবং সামাজিক বিতর্ক তাঁকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে আর মূলধারার বলিউডে ফেরা সম্ভব হয়নি।
আজও মনিকা বেদির নাম উচ্চারিত হলে তাঁর অভিনয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সেই অধ্যায়।
ছোট শহর থেকে স্বপ্নের শহরে
১৯৭৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুর জেলার এক শিখ পরিবারে জন্ম মনিকা বেদির। বাবার চাকরির কারণে পরিবারের একসময় নরওয়েতে বসবাস শুরু হয়। পড়াশোনা শেষে অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম দিকে বড় সাফল্য না পেলেও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা ও পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে কাজ করে পরিচিতি পান। পরে হিন্দি সিনেমাতেও সুযোগ আসে। ‘সুরক্ষা’, ‘জোড়ি নম্বর ওয়ান’, ‘পেয়ার ইশক অউর মোহাব্বত’সহ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করে নজরে আসেন। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, বলিউডে তিনি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবেন।
আবু সালেমের সঙ্গে পরিচয়
মনিকা বেদির জীবনের মোড় ঘুরে যায় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আবু সালেমের। পরিচয় দ্রুত ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়।
তখন আবু সালেম শুধু ভারতের অন্যতম পলাতক অপরাধীই নন, বলিউডের অর্থায়ন, চাঁদাবাজি ও তারকাদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগেও আলোচিত। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবেও তাঁর নাম উঠে আসে।
মনিকা পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, শুরুতে তিনি জানতেন না আবু সালেমের প্রকৃত পরিচয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সালেম নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে এই দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে।
সম্পর্কের মূল্য
আবু সালেমের সঙ্গে সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই মনিকা বেদিকে ঘিরে বলিউডে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। প্রযোজক ও নির্মাতাদের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে কাজ করতে অনীহা দেখাতে থাকেন।
তৎকালীন বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়ে বহু অভিযোগ ছিল। নির্মাতাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অভিনেতাদের হুমকি দেওয়া, চলচ্চিত্রে অর্থ বিনিয়োগ—এসব নিয়ে নিয়মিত খবর প্রকাশিত হতো। এমন এক সময়ে একজন অভিনেত্রীর নাম সরাসরি আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ধীরে ধীরে কমতে থাকে কাজের সুযোগ। নতুন ছবির প্রস্তাব প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
পলাতক জীবন
২০০২ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আবু সালেম ও মনিকা বেদিকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ।
অভিযোগ ছিল, তাঁরা ভুয়া পরিচয় ও জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে সেখানে অবস্থান করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়। কয়েক বছর ধরে পর্তুগালে আইনি লড়াইয়ের পর তাঁদের ভারতে প্রত্যর্পণ করা হয়।
ভারতে ফিরে মনিকার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল জাল পাসপোর্ট ব্যবহার ও ভুয়া পরিচয়ে ভ্রমণ।
আদালতের রায়
মনিকা বেদি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। শেষ পর্যন্ত জাল পাসপোর্ট–সংক্রান্ত মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এরপর তিনি সাজা ভোগ করেন এবং পরে মুক্তি পান।
আইনি লড়াই শেষ হলেও জনমনে তাঁর পরিচয় বদলে যায়। তিনি আর কেবল একজন অভিনেত্রী নন; হয়ে ওঠেন বিতর্কিত এক চরিত্র।
মুক্তির পরও শেষ হয়নি বিচার
জেল থেকে বেরিয়ে মনিকা বেদি আবার অভিনয়ে ফেরার চেষ্টা করেন। তিনি টেলিভিশনের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস’-এ অংশ নেন। পাশাপাশি কয়েকটি টেলিভিশন ধারাবাহিকেও অভিনয় করেন। কিছু আঞ্চলিক চলচ্চিত্রেও দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু বলিউডে যে অবস্থান একসময় তৈরি হচ্ছিল, তা আর ফিরে পাননি।
কারণ শুধু আইনি মামলা নয়, তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিতর্কই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা। প্রযোজকেরা তাঁকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাননি। দর্শকের কাছেও তিনি অভিনয়ের চেয়ে বিতর্কের মুখ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
‘আমি সব হারিয়েছি’
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মনিকা বেদি বলেছেন, জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে একটি সম্পর্কের কারণে।
মনিকা দাবি করেন, তিনি ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু সেই সম্পর্কই তাঁর ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়।
মনিকার ভাষায়, তিনি বহু বছর ধরে নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অতীতের ছায়া তাঁকে কখনো পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি।
টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে