ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সেরা নির্মাতা হিসেবে রাজ কাপুরকে দেখা হয়। ইন্ডাস্ট্রির অনেকের কাছেই তাঁর মুখ থেকে প্রশংসা পাওয়া ছিল স্বপ্নের মতো। তেমনই একটি মুহূর্ত এসেছিল অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক বিজয় আনন্দ—যিনি ‘গোল্ডি আনন্দ’ নামেই বেশি পরিচিত এবং অভিনেতা দেব আনন্দের ছোট ভাইয়ের জীবনে। কিন্তু ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক অদ্ভুত ও বিব্রতকর অভিজ্ঞতায়।
বিজয় আনন্দের বিশ্বাস ছিল, সহকর্মী নির্মাতাদের ক্ষেত্রে রাজ কাপুর কিছুটা অন্যদের সাফল্য নিয়ে অনিরাপত্তায় ভুগতেন। এই ধারণার পেছনে ছিল ‘গাইড’ সিনেমা ঘিরে ঘটে যাওয়া এক বিস্ময়কর ঘটনা।
‘গাইড’-এর মুক্তির সময়ের ঘটনা
ঘটনাটি ঘটে বিজয় আনন্দের পঞ্চম ছবি ‘গাইড’ মুক্তির পরপরই। আর কে নারায়ণের ১৯৫৮ সালের উপন্যাস ‘দ্য গাইড’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির ইংরেজি সংস্করণ বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও হিন্দি সংস্করণটি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি দেব আনন্দের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী মোহন চুরিওয়ালা এক সাক্ষাৎকারে (ভিকি লালওয়ানির সঙ্গে আলাপে) এই ঘটনাকে স্মরণ করেন। তিনি জানান, বিজয় আনন্দ নিজেই তাঁকে এই গল্প বলেছিলেন।
চুরিওয়ালার ভাষায়, ‘গোল্ডি সাহেব আমাকে বলেছিলেন, একজন সাধারণ মানুষের কাছে, যিনি ইন্ডাস্ট্রির বাইরে, তাঁর কাছে রাজ কাপুর যেন ঈশ্বরের মতো। কিন্তু সহকর্মী নির্মাতাদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে তিনি একটু অনিরাপদ হয়ে পড়তেন।’
রাত ২টায় ফোন, ‘এখনই “গাইড” দেখতে চাই’
চুরিওয়ালার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘গাইড’ মুক্তির কিছুদিন পর গভীর রাতে, রাত প্রায় দুইটার দিকে দেব আনন্দের বাড়িতে ফোন আসে। বাড়ির গৃহকর্মী ফোন ধরলে ওপাশ থেকে রাজ কাপুর জোর দিয়ে দেব আনন্দের সঙ্গে কথা বলতে চান। এমনকি ফোন না ধরালে তিনি বাড়িতে চলে আসবেন বলেও হুমকি দেন।
প্রথমে বিরক্ত হলেও দেব আনন্দ শেষ পর্যন্ত ফোন ধরেন। ফোনে রাজ কাপুর জানান, তিনি অবিলম্বে ‘গাইড’ দেখতে চান।
দেব আনন্দ পরদিন সকালে ছবির প্রিন্ট পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও রাজ কাপুর রাজি হননি। তিনি তখনই ছবি দেখতে চাইছিলেন। জানা যায়, সে সময় রাজ কাপুর মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। দেব আনন্দ আবার ঘুমিয়ে পড়েন।
১৫ মিনিট পর আবার ফোন। রাজ কাপুর জানতে চান, প্রিন্ট পাঠানো হয়েছে কি না। তখন দেব আনন্দ বুঝতে পারেন, সত্যিই তাঁকে প্রিন্ট পাঠাতে হবে। শেষ পর্যন্ত আর কে স্টুডিওতে ‘গাইড’-এর প্রিন্ট পাঠানো হয়।
ভোর ছয়টায় কান্নাভেজা প্রশংসা
সকাল ছয়টার দিকে ছবি দেখা শেষ করে রাজ কাপুর আবার দেব আনন্দকে ফোন করেন। তখন তিনি ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বিজয় আনন্দের প্রতিভার কথা বলেন।
চুরিওয়ালার ভাষায়, ‘রাজ কাপুর দেব আনন্দকে বলেন, “তুমি কত ভাগ্যবান, তোমার ভাই এত বড় প্রতিভাবান।” তিনি ফোনে কাঁদছিলেন। দেব আনন্দ প্রথমে রাতে বারবার ফোন পেয়ে বিরক্ত হলেও রাজ কাপুরের প্রশংসা শুনে তাঁর মন ভালো হয়ে যায়। কারণ, রাজ কাপুরের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া মানেই নির্মাতা হিসেবে বড় কিছু অর্জন।’
সামনাসামনি অস্বীকার, চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি
কিছুদিন পর একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে রাজ কাপুর উপস্থিত ছিলেন। আগের রাতের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত দেব আনন্দ তাঁর ভাই বিজয় আনন্দকে রাজ কাপুরের সঙ্গে দেখা করতে পাঠান।
কিন্তু সেখানে ঘটে উল্টো ঘটনা। রাজ কাপুর বিজয় আনন্দকে চিনতেই অস্বীকার করেন। পরিচয় দেওয়ার পর তিনি নির্লিপ্তভাবে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কী করছ? পড়াশোনা কত দূর এগোল?’
বিস্মিত বিজয় আনন্দ জানান, তিনি সিনেমা বানাচ্ছেন এবং সম্প্রতি ‘গাইড’ পরিচালনা করেছেন, যার প্রিন্ট রাজ কাপুরের কাছেই পাঠানো হয়েছিল। তখন রাজ কাপুর বলেন, ‘ওহ, আচ্ছা। দেখব, তারপর জানাব।’
ঘটনাটি বিজয় আনন্দের জন্য ভীষণ অপমানজনক হয়ে ওঠে। পরে দেব আনন্দ বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে বলেন, হয়তো সেদিন রাজ কাপুরের মেজাজ ভালো ছিল না।
একই ঘটনা আবার
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। একই সময়ে দেব আনন্দের বোন বনি আনন্দ রাজ কাপুরের বাড়িতে একটি পূজায় আমন্ত্রিত হন। সেখানেও রাজ কাপুর বিজয় আনন্দের প্রশংসা করেন।
বনি আনন্দ বাড়ি ফিরে উচ্ছ্বসিত হয়ে সেই প্রশংসার কথা ভাইকে জানান এবং সেদিনই রাজ কাপুরের বাড়িতে নৈশভোজে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। বিজয় আনন্দ প্রথমে অনিচ্ছুক হলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হন এই ভেবে যে এবার হয়তো রাজ কাপুর তাঁকে স্বীকৃতি দেবেন।
কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। আবার দেখা হলে রাজ কাপুর একই প্রশ্ন করেন, ‘তুমি এখন কী করছ? কোথায় পড়ছ?’
এই দ্বিতীয়বারের অবহেলায় দুই ভাই-বোনই স্তব্ধ হয়ে যান। এরপর আর কখনো এ ঘটনা নিয়ে কথা ওঠেনি।
‘গাইড’-এর ঐতিহাসিক সাফল্য
ইংরেজি সংস্করণ ব্যর্থ হলেও হিন্দি ‘গাইড’ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অনন্য স্থান করে নেয়। ১৪তম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে ছবিটি নয়টি মনোনয়ন পেয়ে জেতে চারটি বড় পুরস্কার—সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রী।
২০০৭ সালে মুক্তির প্রায় ৪২ বছর পর, ‘গাইড’ প্রদর্শিত হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবে—যা ছবিটির ঐতিহাসিক মর্যাদাকে আরও পাকাপোক্ত করে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে