অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির
অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির

যে কারণে জয়শ্রী কবিরের ‘মৃত্যুর খবর’ নিয়ে সংবাদ করেনি প্রথম আলো

৭০ ও ৮০-এর দশকের অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির ১২ জানুয়ারি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন—গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক সংবাদমাধ্যমও খবরটি প্রকাশ করে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। কোনো হাসপাতাল সূত্র থেকেও মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তাই খবরটির সত্যাসত্য যাচাই করতে একাধিক চলচ্চিত্রকর্মী ও লন্ডনপ্রবাসী সংস্কৃতিকর্মীর সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। সবার বক্তব্যই প্রায় এক—তাঁরা সবাই মৃত্যুর কথা শুনেছেন কিন্তু কোথায়, কখন, কীভাবে মারা গেছেন—এ বিষয়ে কেউই নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্র হিসেবে প্রয়াত নির্মাতা আলমগীর কবিরের ভাগনে জাভেদ মাহমুদের নাম উল্লেখ করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদক নাজমুল হক শুক্রবার সকালে জাভেদ মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মেসেঞ্জারে তিনি জানান, মৃত্যুর খবরটি তিনি জয়শ্রী কবিরের ছেলে লেনিন সৌরভ কবিরের কাছ থেকে শুনেছেন। তবে ছেলের পক্ষ থেকে যোগাযোগ না করার অনুরোধ থাকায় তাঁর ফোন নম্বর বা ই–মেইল তিনি দিতে রাজি হননি। পরে একাধিক বার্তা পাঠানো হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে অভিনেতা স্বাধীন খসরুর প্রায় ২৫ বছরের পরিচয়। শুক্রবার সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মনজুর কাদের। লন্ডনপ্রবাসী এই অভিনেতা জানান, মৃত্যুর খবরটি তিনিও শুনেছেন। তিনি আরও জানান, তাঁর জানামতে জয়শ্রী কবিরের মরদেহ বর্তমানে এসেক্সের কিংস জর্জ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা আছে। তবে তিনি নিজে মরদেহ দেখেননি, হাসপাতালেও যাননি। জয়শ্রী কবিরের ‘মরদেহ’ যেখানে রাখা আছে, কাল (শনিবার) সেখানে তাঁর যাওয়ার কথা রয়েছে।

আলমগীর কবির পরিচালিত সীমানা পেরিয়ে ছবিতে জয়শ্রী কবির ও বুলবুল আহমেদ
অভিনেতা স্বাধীন খসরুর জানান, জয়শ্রী কবিরের মরদেহ বর্তমানে এসেক্সের কিংস জর্জ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা আছে। তবে তিনি নিজে মরদেহ দেখেননি, হাসপাতালেও যাননি।

স্বাধীন খসরু জানান, জয়শ্রী কবির বিভিন্ন সময়ে আড্ডায় তাঁর জীবনের নানা কষ্টের গল্প শোনাতেন। তিনি নিজের মতো করে থাকতে চাইতেন। সেই অর্থে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ, তার মধ্যে তিনিও একজন, যাঁদের সঙ্গে তিনি আড্ডা দিতেন, ঘুরেও বেড়াতেন। তবে মৃত্যুর খবর কাউকে জানাতেও নিষেধ করেছিলেন। পরিবারও চায়নি তাঁর মৃত্যুসংবাদ সাংবাদিকেরা জানুক।
শোক জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। তিনি বলেন, ‘আমি তো নিশ্চিত না হয়ে কারও মৃত্যুসংবাদ লিখব না। জয়শ্রী কবিরের খুব কাছের একজন, বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হওয়ার পর আমি জানলাম আমার স্বপ্নের নায়িকা আর নেই! লন্ডনে থাকতেন তিনি। লন্ডন থেকে কানাডায় আমার কাছে দুঃসংবাদটা পৌঁছাতে দুদিন লাগল।’

ফেসবুক পোস্টে রিটন আরও লিখেছেন, ‘লন্ডনে জয়শ্রী কবির সব ধরনের সামাজিক ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতেন। খুব সচেতনভাবেই লোকচক্ষুর অন্তরালকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। একমাত্র পুত্র সিঙ্গাপুরে বড় চাকুরে। বিদায় আমার স্বপ্নের পরিটা!’

ঢাকায় থাকার সময় থেকেই জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামালের পরিচয়। খবরটি নিশ্চিত করতে লন্ডনে অবস্থানরত এই চলচ্চিত্র সংসদকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল হক। মোস্তফা কামাল জানান, জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয়। তখন তিনি আলমগীর কবিরের স্ত্রী এবং শ্যামলি থাকতেন। বহু বছর পর লন্ডনে আবার তাঁদের যোগাযোগ হয়।

লন্ডনে জয়শ্রী কবির সব ধরনের সামাজিক ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতেন। খুব সচেতনভাবেই লোকচক্ষুর অন্তরালকেই বেছে নিয়েছিলেন তিনি।
১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া জয়শ্রী কবিরের আদি নাম ছিল জয়শ্রী রায়

মোস্তফা কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে তিনি নিজে জয়শ্রী কবিরকে লন্ডনের রয়্যাল হাসপাতালে ভর্তি করান। তিনি ও তাঁর স্ত্রী নিয়মিত হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে দেখতেন। একদিন গিয়ে দেখেন, তিনি তুলনামূলক ভালো আছেন, কিছুটা শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও ছিলেন হাসিখুশি। চিকিৎসকেরা তখন জানান, বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ছাড়া গুরুতর কোনো শারীরিক জটিলতা নেই। তাঁকে আর হাসপাতালে রাখার দরকার নেই।

পরদিন হাসপাতালে গিয়ে মোস্তফা কামাল জানতে পারেন, জয়শ্রী কবির আর সেখানে নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাঁর ছেলে তাঁকে ওল্ড হোমে নিয়ে গেছেন। এর পর থেকে তিনি আর কোনো খোঁজ পাননি।
আক্ষেপের সুরে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অনেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কিন্তু আমি নিজেও কোনো নিশ্চিত খবর জানি না। কোথায়, কীভাবে, কখন—কিছুই জানি না।’
প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি সাইদুল ইসলাম জানান, লন্ডনে এখনো জয়শ্রী কবির নামে কারও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়নি। যদিও মৃত্যুর আট দিনের মধ্যে নিবন্ধনের নিয়ম আছে।

পারিবারিক সদস্য বা হাসপাতালের সূত্রে অভিনেত্রীর মৃত্যুজনিত খবরটি নিশ্চিত করা যায়নি। লন্ডনের সংশ্লিষ্ট নথিতে মৃত্যুনিবন্ধনও হয়নি। সংগত কারণে প্রথম আলো এখন পর্যন্ত সংবাদটি সরাসরি ‘মৃত্যু’ হিসেবে প্রকাশ করেনি।
সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু

পারিবারিক সদস্য বা হাসপাতালের সূত্রে অভিনেত্রীর মৃত্যুজনিত খবরটি নিশ্চিত করা যায়নি। লন্ডনের সংশ্লিষ্ট নথিতে মৃত্যুনিবন্ধনও হয়নি। সংগত কারণে প্রথম আলো এখন পর্যন্ত সংবাদটি সরাসরি ‘মৃত্যু’ হিসেবে প্রকাশ করেনি। আমরা এখনো চেষ্টা করছি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জায়গা থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ামাত্রই পাঠকদের জানাতে।

কলকাতা টু ঢাকা টু লন্ডন
১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া জয়শ্রী কবিরের আদি নাম ছিল জয়শ্রী রায়। ১৯৬৮ সালে তিনি ‘মিস ক্যালকাটা’ নির্বাচিত হন। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু। পরে উত্তম কুমারের সঙ্গেও একটি ছবি করেন, নাম ‘অসাধারণ’ (১৯৭৬)।

‘সূর্যকন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে তিনি বাংলাদেশে আসেন। এই ছবির পরিচালক ছিলেন আলমগীর কবির। পরে তাঁরা বিয়ে করেন। তখন থেকে জয়শ্রী রায় হয়ে যান জয়শ্রী কবির। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রায় এক যুগ তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘রুপালি সৈকতে’ ‘মোহনা’, ও ‘পুরস্কার’। সবগুলো ছবিতেই তাঁর নায়ক ছিলেন বুলবুল আহমেদ।


পরে আলমগীর কবিরের সাথে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি কলকাতা চলে যান। পরে একমাত্র ছেলে লেনিন সৌরভ কবিরকে নিয়ে লন্ডনে স্থায়ী হন। সেখানে প্রায় এক যুগের বেশি একটি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল নিয়মিত।