বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সঙ্গে মিশে যায়, হয়ে ওঠে প্রজন্মের স্মৃতি। আলো-ছায়ার সেই জাদুকরি জগতে আনোয়ারা তেমনই এক নাম। পর্দায় কখনো তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার আলেয়া, কখনো স্নেহময়ী মা, কখনো কঠিন শাশুড়ি কিংবা দাদিমা—চরিত্র বদলালেও অভিনয়ের গভীরতায় কখনো ফুরোয়নি তাঁর আবেদন। গতকাল ছিল এই অভিনেত্রীর জন্মদিন।
মাত্র ছয় বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে পথচলা শুরু হয়েছিল আনোয়ারার। ফজলুল হক পরিচালিত ‘আজান’ ছবিতে নৃত্যশিল্পীর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রুপালি পর্দায় তাঁর যাত্রা। ছবিটির নাম পরে বদলে করা হয় ‘উত্তরণ’, মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালের দিকে। যদিও শুটিংয়ের দিক থেকে এটি তাঁর প্রথম ছবি, মুক্তির দিক থেকে আনোয়ারার প্রথম চলচ্চিত্র আবদুল জব্বার খান পরিচালিত ‘নাচঘর’। উর্দু ভাষার এ ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালে। সেখান থেকেই শুরু—একটানা কাজ করেছেন ২০২১ সাল পর্যন্ত।
নায়িকা হিসেবে আনোয়ারার অভিষেক ঘটে ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বালা’ চলচ্চিত্রে। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা’। আলেয়া চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়, তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানজুড়েই বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ছবিটির সাফল্যের বদৌলতে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর, করাচি, মুলতান ও পেশোয়ারেও ছড়িয়ে পড়ে আনোয়ারার নাম। পরবর্তী সময়ে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা’র একাধিক মঞ্চায়নে ‘আলেয়া’ চরিত্রে তিনি হয়ে ওঠেন অবিচ্ছেদ্য।
ছয় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই শিল্পীর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘দেবদাস’, ‘শুভদা’, ‘সুন্দরী’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সখিনার যুদ্ধ’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় ছবি। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। আর ‘শুভদা’ চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অর্জন করেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি মোট আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০২২ সালে পান আজীবন সম্মাননা।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আনোয়ারা ধীরে ধীরে ভাবি, চাচি, শাশুড়ি, মা ও দাদির চরিত্রে বেশি অভিনয় করতে শুরু করেন। এসব চরিত্রেই তিনি সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয়তা পান। বহুমাত্রিক চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে। একসময় যিনি লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনের ব্যস্ততায় দিন কাটিয়েছেন, এখন আর সেই জীবন নেই। কোনো অভিমান নয়—বার্ধক্যের কারণেই অভিনয় থেকে দূরে সরে গেছেন তিনি। স্বামী মুহিতুল ইসলামের মৃত্যু হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। এরপর আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি। ২০২২ সালে ব্রেন স্ট্রোক করার পর জীবনযাপন আরও সীমিত হয়ে আসে।
এখন কেমন কাটে আনোয়ারার দিন? এ প্রসঙ্গে আজ শনিবার বিকেলে প্রথম আলোকে তাঁর একমাত্র মেয়ে অভিনেত্রী রুমানা ইসলাম মুক্তি জানান, মা নিজের মতো করেই সময় কাটান। নামাজ পড়েন, টেলিভিশন ও ইউটিউবে নিজের অভিনীত সিনেমা দেখেন, নাতনির সঙ্গে গল্প করেন। জন্মদিন নিয়ে তাঁর বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। স্বামীর মৃত্যুর পর কেক কাটা বা জাঁকজমক উদ্যাপন একেবারেই বন্ধ। সাধারণত কোরআন খতম ও এতিমখানায় খাবার দেওয়ার মধ্য দিয়েই দিনটি পালন করা হয়।
আজ ১৯৫৪ সালের এই দিনে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন আনোয়ারা। বয়স হলেও তাঁর অভিনয় আজও অমলিন, সময়কে অতিক্রম করা এক জীবন্ত অধ্যায়।
ছয় বছর বয়সে শুরু হওয়া যে যাত্রা ছুঁয়েছে ছয় দশকেরও বেশি সময়—সে যাত্রা শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়, এটি বাংলা চলচ্চিত্রেরই এক বিস্তৃত ইতিহাস। নায়িকা থেকে মায়ের চরিত্র—প্রতিটি রূপে আনোয়ারা রেখে গেছেন অনন্য ছাপ। আজ তিনি পর্দার আড়ালে, নীরব জীবনে, কিন্তু রুপালি পর্দায় তাঁর উপস্থিতি এখনো আলো জ্বালায়। সময় বদলায়, চরিত্র বদলায়—কিংবদন্তি বদলায় না। আনোয়ারা তাই শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের চিরকালীন ভালোবাসা।