ষাটের দশকে ঢাকার চলচ্চিত্রে যে কজন অভিনেত্রী পরিচিতি পেয়েছিলেন, নাসিমা খান তাঁদের অন্যতম
ষাটের দশকে ঢাকার চলচ্চিত্রে যে কজন অভিনেত্রী পরিচিতি পেয়েছিলেন, নাসিমা খান তাঁদের অন্যতম

নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়েই চিরবিদায় নিলেন অভিনেত্রী নাসিমা খান

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আজ রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। প্রথম আলোকে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন অভিনেত্রীর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নুরজাহান বেগম।
ষাটের দশকে ঢাকার চলচ্চিত্রে যে কজন অভিনেত্রী পরিচিতি পেয়েছিলেন, নাসিমা খান তাঁদের অন্যতম। তখনো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষাতেই নির্মিত হচ্ছে সিনেমা। সেই সময় বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন নাসিমা খান। পরে ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ‘যে নদী মরু পথে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘বেগানা’, ‘উজালা’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
নুরজাহান বেগমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন নাসিমা খান। সাত দিন আগে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সন্ধ্যায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও অভিনেতা সনি রহমানও তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

ছেলের সন্ধান চেয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন তিনি

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন নাসিমা খান। ছেলের সন্ধান চেয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন তিনি। ১৭ ফেব্রুয়ারি চ্যানেল আই অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ছেলেকে ফিরে পেতে এই অভিনেত্রীর আকুতি উঠে আসে। তাঁর বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে।
নাসিমা খান ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্নবিলাস এলাকায় বসবাস করতেন।
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্ম নাসিমা খানের। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী। পারিবারিক পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। পড়াশোনা করেছেন কামরুন্নেসা স্কুলে, শিখেছেন নাচও।

নাসিমা খানের চলচ্চিত্রে আসার গল্পও বেশ পুরোনো। তাঁর পরিবারের সঙ্গে অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা খান আতাউর রহমানের ঘনিষ্ঠতা ছিল। লালবাগে তাঁদের বাড়ির কাছেই থাকতেন খান আতা। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ আসার পর প্রথমে পরিবারে দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অভিনয়ের অনুমতি পান নাসিমা। তবে শর্ত ছিল, অভিনয়ের জন্য পড়াশোনায় অবহেলা করা যাবে না।

ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ‘যে নদী মরু পথে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘বেগানা’, ‘উজালা’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি

১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নাসিমা খানের। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির চিত্রনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। অভিনয় করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র, খান আতাউর রহমানসহ অনেকে। ছবিটি ১৯৫৯ সালের মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপদক অর্জন করে।
প্রথম চলচ্চিত্রের পরই আরও কাজের সুযোগ আসে নাসিমা খানের। বেবী ইসলাম পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘তানহা’য় অভিনয় করেন তিনি। ছবিতে তাঁর সহশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন শামীম আরা, সুমিতা দেবী ও শবনম।

প্রথম চলচ্চিত্রের পরই আরও কাজের সুযোগ আসে নাসিমা খানের

১৯৬১ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর পরিচিতি বাড়ে নাসিমা খানের। এরপর ‘সূর্যস্নান’ ছবিতে অভিনয় তাঁকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে। ষাটের দশকে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন তিনি।
নাসিমা খানের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। এসব ছবিতে বিভিন্ন সময়ে আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, গোলাম মুস্তাফা, আজিমসহ অনেক অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
শুধু ঢাকার চলচ্চিত্রেই নয়, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন নাসিমা খান। পাকিস্তানের চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার পাকিস্তান ফিল্ম ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর অভিনীত লাহোরে নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’ (১৯৬৯), ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ (১৯৬৯), ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ (১৯৭০) ও ‘রোড টু সোয়াত’ (১৯৭১)। এর মধ্যে ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর একসময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান নাসিমা খান। পরে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আবার পর্দায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা সময়ে পর্দায় ফিরলেও জীবনের শেষ ভাগে অভিনয়ে অনেকটাই অনিয়মিত হয়ে পড়েন নাসিমা খান। তাঁর অভিনীত পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মাতৃত্ব’, ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ও ‘মাটির পিঞ্জিরা’। বাংলা মুভি ডেটাবেজে ২০১৩ সালের ‘মাটির পিঞ্জিরা’ চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয়ের তথ্য রয়েছে।
১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত এক আত্মকথনে অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন নাসিমা খান।

চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা ২০২৫ সালে পুনঃপ্রকাশ করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ। সেখানে ‘সূর্যস্নান’ ছবির শুটিংয়ে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা, ‘কার বউ’ ছবিতে সিঁড়ি থেকে পড়ে আহত হওয়া এবং জহির রায়হানের ‘দুই ভাই’ চলচ্চিত্রের টানা শুটিংয়ের স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন তিনি।সেই আত্মকথনে ষাটের দশকের চলচ্চিত্রাঙ্গনের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিনয়ের প্রতি শিল্পীদের নিষ্ঠার কথাও বলেছিলেন নাসিমা খান। তাঁর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে এমন এক সময়ের কথা, যখন অভিনয়ের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল সীমিত। অভিজ্ঞ শিল্পী ও পরিচালকদের কাছ থেকেই অভিনয়ের নানা কৌশল শিখেছিলেন তিনি।সাদা-কালো চলচ্চিত্রের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দশক অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নাসিমা খান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করা ঢাকার চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্মের আরেকজন অভিনেত্রীর জীবনাবসান হলো।