
চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর পর প্রথমবার হত্যা মামলার আবেদন করা হয় ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই। সেই থেকে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় মামলাটি নিয়ে নানা কারণে বিলম্ব হয়। অবশেষে গত বছর দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি লড়াইয়ের পর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।
এর কয়েক দিন পরেই সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় আসামি করা হয় ডনকে। মামলার পরেও ডন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এই নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন,‘ডন দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছে। কখনো সে দেশের নির্বাচনের কাজে যায়। আবার এফডিসিতে তাকে এখনকার নেতারা বরণ করে নেয়। আমার নামে নানা কথা বলে বেড়াত। হুমকি দিত। ভাবা যায় তার কত বড় সাহস ছিল।’
এই সময় নীলা চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ডনকে রিমান্ড নেওয়া হয়েছে। এটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। সে কী বলছে, সেটা তদন্তের স্বার্থে আমরা জানতে পারছি না। তবে সে জড়িত, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই ডনের জন্য আমার ছেলে কত কিছু করেছে। সিনেমায় নিয়েছে। তাকে পরিচিত করেছে। অথচ তারাই খুন করল। না হলে আমার ছেলে আজও বেঁচে থাকত।’
কথা বলার সময় কিছুটা ভেঙে পড়েন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আজ আমার ছেলে বেঁচে থাকলে সিনেমার চেহারাই হয়তো বদলে যেত। এখন তো সিনেমা হলই নেই। আবার সে অভিনেতা থেকে এখন হয়তো সিনেমা বানাত। সে আমাকে বলত একসময় সিনেমা বানাবে, পরিচালক হবে। সিনেমার জন্য সে অনেক কিছু করত। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। আর ইমনের (সালমান শাহ) ভক্তরা যে দাবি এখন তুলেছে, সেদিকে আইনের লোকেরা একটু নজর দেবে আশা করি। এখনো কীভাবে সামিরা গ্রেপ্তার হচ্ছে না বুঝে আসে না। আর এত ব্যবসা, টাকা তার কোথায় থেকে আসে। পুলিশ গ্রেপ্তার করলে সবই সামনে আসবে।’
হত্যা মামলা দেওয়ার পরে ডনের সঙ্গে একাধিকবার প্রথম আলো থেকে যোগাযোগ করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর নম্বরে কল গেলেও তিনি ফোন রিসিভ করতেন না। এর মধ্যেই সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলচরিত্রের এই অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন ৯ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন।
গত বছর হত্যা মামলার পরে কীভাবে সময় কেটেছিল, এই নিয়েও ডন গ্রেপ্তারের আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে ডন বলেছিলেন, ‘আমি গত ২৯ বছর কাজ করে গেছি। এখনো শুটিং করি, এফডিসিতে যাই। দর্শক আমাকে ভালোবাসে, সেটা আপনার সবাই জানেন। নিজের মতো করেই ঘুরিফিরি। তাহলে আমি ভয় পাই না কেন, কেন হত্যা মামলার আসামি হয়েও প্রকাশ্যে ঘুরি। এর কারণ আমার সেই সৎ সাহস আছে। তাকে (সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী) দেশে আসতে বলেন। আমরা সবাই প্রেসক্লাবে বসি। সেখানে সাংবাদিক ও দেশের মানুষ থাকবে। সেখানে সবকিছুর ফয়সালা হবে। আমার তো যেতে কোনো ভয় নাই। অথচ তিনি বিদেশ থেকে কদিন পরপর নানাভাবে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন।’ এমন বক্তব্যের কিছুদিন পরেই বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন ডন। বর্তমানে তিনি রিমান্ড শেষে কারাগারে।
এদিকে ডন ছাড়া সালমান শাহ হত্যা মামলার অন্য আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। এই নিয়ে আজ সালমান শাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর যশোরের ভক্তরা ‘সালমান শাহ ভক্তবৃন্দ’ ব্যানারে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন। সেখানে ভক্তরা প্রধান আসামি সামিরাসহ অন্যদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান।
১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই। সেই থেকে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় মামলাটি নিয়ে নানা কারণে বিলম্ব হয়।
উল্লেখ্য, হত্যা মামলা আগে করা হলেও কয়েকবার বিলম্বের পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পিবিআই। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন। এই প্রতিবেদনের তথ্য মেনে নেননি সালমান শাহর পরিবার। এর বিরুদ্ধে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে ‘রিভিশন’ আবেদন করা হয়।
অবশেষে ‘রিভিশন’ এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি লড়াইয়ের পর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।