
পবিত্র ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘বনলতা সেন’ ছবিটি এখন দেশের প্রেক্ষাগৃহে চলছে। কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্যিক আবহকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিতে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাসার ও বনলতা সেন চরিত্রে মাসুমা রহমান নাবিলা। পর্দায় চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে গিয়ে দুজনকেই কঠিন শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শুটিং শেষ হওয়ার দুই বছর পরও সেই কষ্টের স্মৃতি ও কিছু ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁরা।
সম্প্রতি প্রথম আলো কার্যালয়ে এসেছিলেন ‘বনলতা সেন’ ছবির পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, অভিনয়শিল্পী নাবিলা ও খায়রুল বাসার। তাঁরা ছবির শুটিংয়ের নানা অভিজ্ঞতার কথা শোনান। সেখানেই উঠে আসে শুটিং সময়ের অজানা গল্প।
‘বনলতা সেন’ ছবিতে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য খায়রুল বাসারকে দীর্ঘ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। চরিত্রটির একটি বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে টানা ৩২ দিন মুখে লেবু রাখতে হয়েছিল তাঁকে। শুটিংয়ের প্রায় পুরো সময় মুখে লেবু থাকত। এতে মুখের ভেতরের অংশে ক্ষত হলে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে পারতেন না তিনি। কিন্তু চরিত্রের প্রয়োজনে সেই কষ্ট মেনে নিয়েছিলেন অভিনেতা। তবে শুধু এটুকুই নয়, জীবনানন্দ হয়ে ওঠার পথে আরও বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
ছবির শুটিংয়ে আরেকটি কষ্টকর অভিজ্ঞতা ছিল শ্রীমঙ্গলে শীতের রাতে একটি দৃশ্যের শুটিং। সেদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গভীর রাতে ধুতি পরে শুটিং করতে হয়েছিল বাসারকে। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘রাত প্রায় চারটা। চারপাশে সুনসান নিরবতা। একটি দৃশ্যে মহিন (সোহেল মণ্ডল) ঘোড়ায়, আর আমি হেঁটে যাচ্ছি। পায়ে শুধু জুতা আর পরনে ধুতি। মনে হচ্ছিল হাড় পর্যন্ত বরফ হয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তখন নিজেকে জীবনানন্দ দাশ হিসেবে ভাবতে পারছিলাম। সেই অনুভূতিই আমাকে শক্তি দিয়েছে।’
বাসারের মতে, ‘বনলতা সেন’ ছবির প্রায় প্রতিটি দৃশ্যই কমবেশি কঠিন ছিল। কারণ, তিনি শুধু অভিনয় করেননি, চেষ্টা করেছেন কবির ভেতরের মানুষটিকেও ধারণ করতে।
শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, চরিত্র নির্মাণে মানসিক চাপও ছিল প্রবল। ছবির একটি দৃশ্যে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে কবি বুদ্ধদেব বসুর কথোপকথন দেখানো হয়েছে। বাসারের মতে, তিনি ভাবছিলেন, জীবনানন্দ কি দুই পা ভাঁজ করে বসতেন? নাকি অন্যভাবে? কীভাবে বসলে চরিত্রটি স্বাভাবিক লাগবে? এমন ছোট ছোট বিষয়েও তাঁকে ভাবতে হয়েছে, যাতে পর্দার জীবনানন্দ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে নাবিলার জন্য সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা ছিল একটি দৃশ্যের শুটিং, যেখানে তাঁকে বারবার উঠতে-বসতে হয়েছে। দৃশ্যটিতে মহিনের পা ধুয়ে দিচ্ছেন বনলতা সেন। দেখতে সাধারণ মনে হলেও ওই দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে অনেকবার একই কাজ করতে হয়েছে অভিনেত্রীকে। নাবিলা বলেন, ‘মহড়ার সময় আমরা অনেক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু শুটিংয়ে একটি শট নিখুঁত করতে বারবার শর্ট দিতে হয়। ওই দৃশ্যে বারবার ওঠা-বসা করতে গিয়ে বুঝতেই পারিনি আমার হাঁটুতে ভেতরে ইনজুরি হয়ে গেছে।’
পরে জানতে পারেন, হাঁটুতে ইন্টারনাল ইনজুরি হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো শুটিং শেষ হওয়ার দুই বছর পরও সেই ইনজুরির প্রভাব তিনি অনুভব করেন। ‘তখন জোশে ছিলাম, কষ্ট টের পাইনি। কিন্তু এখনো সেই ইনজুরি বয়ে বেড়াচ্ছি’, বললেন নাবিলা।
নাবিলার মতে, ছবির প্রতিটি দৃশ্যই ছিল একেকটি মানসিক চাপের জায়গা। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দৃশ্যই আমাদের কাছে ফাইনাল পরীক্ষার মতো ছিল। যত মহড়া করি না কেন, ক্যামেরার সামনে গিয়ে সেই আবেগ, শরীরী ভাষা আর চরিত্রের ডেরপথ ঠিকভাবে তুলে ধরা সহজ ছিল না।’