আরণ্যকের ‘রাঢ়াঙ’ নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি: প্রথম আলো
আরণ্যকের ‘রাঢ়াঙ’ নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি: প্রথম আলো

আরণ্যকের ৪৪ বছরের ঐতিহ্য, মঞ্চে ‘রাঢ়াঙ’

নয়াহাটার সাঁওতাল বিদ্রোহের সেই কাহিনি বাংলার মানুষ কখনই ভুলবে না। এই নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়কে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন নাট্যকার মামুনুর রশীদ। তাঁর রচনা ও নির্দেশনায় নির্মিত ‘রাঢ়াঙ’ নাটকটি ২০০৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রথম মঞ্চায়িত হয় আরণ্যক নাট্যদলের প্রযোজনায়। মহান মে দিবস উপলক্ষে বিশেষ মঞ্চায়ন হিসেবে গতকাল অনুষ্ঠিত হলো নাটকটির ২২৬তম প্রদর্শনী।

মে দিবস ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীতে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর ছিল নাট্যাঙ্গন। গান, আবৃত্তি, আলোচনা, পথনাটক ও মঞ্চনাটকের মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও সংস্কৃতির বার্তা তুলে ধরেছে আরণ্যক। পাশাপাশি বেইলি রোডে শিশুতোষ নাটক নিয়ে দর্শক টেনেছে নাট্যদল বটতলা।

সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শ্রমিকদের বিপ্লবী সংগীত ‘ইন্টারন্যাশনাল’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরণ্যকের আয়োজন। ১৯৮২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে মে দিবস উদ্‌যাপন করে আসা দলটি বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় এ উদ্যোগের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। দিনের প্রথম পর্বে ছিল মে দিবসের গান, আবৃত্তি, আলোচনা সভা ও ভাবনগর সাধুসঙ্গের বাউলসংগীত। একই সঙ্গে প্রয়াত নাট্যকার মান্নান হীরার রচনা ও নির্দেশনায় ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’ পথনাটক নিয়েও ছিল দর্শকের আগ্রহ।

আরণ্যকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ বলেন, ‘১৯৮২ সালে আমরা যখন প্রথম মে দিবস উদ্‌যাপন শুরু করি, তখন লক্ষ্য ছিল মধ্যবিত্ত ও সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ত করা।’ বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শান্তি ও সাম্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার। প্রতিবারের মতো এবারও প্রকাশিত হয়েছে ‘মে দিবসের কাগজ’, যেখানে স্থান পেয়েছে বিশিষ্টজনদের লেখা।

সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে শুরু হয় আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব। সেখানে মঞ্চস্থ হয় ‘রাঢ়াঙ’। নাটকটি উপভোগ করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই নাটক আজও প্রাসঙ্গিক, সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য দর্শকের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে মে দিবস উপলক্ষে বেইলি রোডের বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নাট্যদল বটতলা আয়োজন করে শিশুতোষ নাটক ‘বন্যথেরিয়াম’-এর দুটি প্রদর্শনী। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট ও সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মঞ্চস্থ হওয়া নাটকটি দেখতে উপস্থিত ছিলেন উল্লেখযোগ্য দর্শক।

বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে ছিল বন্যথেরিয়াম নাটকের দুটি প্রদর্শনী। ছবি: বটতলার সৌজন্যে

সুকুমার রায়ের ‘হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ অবলম্বনে নির্মিত এ নাটকের নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন ইভান রিয়াজ। গল্পে বিরল প্রাণীর সন্ধানকে কেন্দ্র করে মানুষের লোভ, ব্যবসা আর প্রকৃতি ধ্বংসের প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে, যা শিশুদের জন্য বিনোদনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে।
মে দিবসের এ আয়োজনগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শকের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গান, নাটক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সংগ্রামের চেতনা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে।