
১৯৮৬ সালে কলকাতায় উৎপল দত্তর বাসায় তোলা হয়েছিল এই ছবি। এই নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতার সঙ্গে সেদিন আড্ডায় বসেছিলেন বাংলাদেশের নাট্যকর্মী বাবুল বিশ্বাস। বাড়ির দেয়ালজুড়ে নাটকের পোস্টার দেখে তাঁর মনে কৌতূহল—এগুলো কি কেবল সাজানোর জন্যই? উৎপল দত্ত তখন পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তোমাদের দেশে এ ধরনের পোস্টার কেউ সংগ্রহ করে না?’ উত্তরে বাবুল বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘না।’ তখনই উৎপল দত্ত বলেন, ‘সংগ্রহ করো, একদিন কাজে লাগবে। এসবই ইতিহাসের উপকরণ হবে। গবেষকেরা এগুলো নিয়েই কাজ করবেন।’
কথাগুলো যেন নির্দেশনার মতো বাজল কানে। ঢাকায় ফিরে এসে বাবুল বিশ্বাস শুরু করলেন নাটকের পোস্টার সংগ্রহ। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ প্রতিষ্ঠিত একটি বড় ভান্ডারের নাম—বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া এই আর্কাইভস পেরিয়েছে ৪০ বছরের পথ।
শুরুর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বাবুল বিশ্বাস বলেন, উৎপল দত্তর সেই পরামর্শ নিয়ে ঢাকায় ফিরে তিনি ভাবছিলেন—কীভাবে শুরু করা যায়? ১৯৮৬ সালের জানুয়ারির এক শীতের সন্ধ্যায় মামুনুর রশীদের সঙ্গে আলাপের সময় মুক্তনাটক কর্মশালার পাশাপাশি আলোচনায় আসে কলকাতার প্রসঙ্গও। ঠিক তখনই নাটক ‘সাতপুরুষের ঋণ’–এর নাট্যকার আব্দুল্লাহেল মাহমুদের হাতে তিনি দেখতে পান নাটকের পোস্টার। সেটিই হাতের কাছের প্রথম দলিল হিসেবে সংগ্রহ করার অনুরোধ করেন।
বাবুল বিশ্বাসের ভাষায়, ‘বললাম, তাহলে এই পোস্টারটি আমাকে দিন। এই পোস্টার দিয়েই নাটকের উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শুরু হোক।’ সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা—যা পরবর্তী সময়ে রূপ নেয় বাংলাদেশের মঞ্চনাট্যের প্রামাণ্য আর্কাইভ গড়ে তোলার কাজে।
পোস্টার দিয়ে শুরু হলেও ক্রমে যুক্ত হতে থাকে নাটকের স্যুভেনির, টিকিট, ছবি, লিফলেট, নাটকের বই, এমনকি ভিডিও ডকুমেন্টেশনও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগ্রহের পরিধি বড় হতে থাকে। আজ এখানে ১৯৫৩ সাল থেকে বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য দলিল সংরক্ষিত আছে। নাটক নিয়ে গবেষণা করতে চাইলে প্রায় সবারই গন্তব্য হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান।
বাবুল বিশ্বাসের ভাষ্যে, শুরুতে ছিল কেবল আবেগ আর ভালোবাসা, পরে তিনি বুঝেছেন—এটি আসলে দায়বদ্ধতা, ইতিহাসের প্রতি, নাটকের প্রতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি দায়িত্ববোধ।
এই যাত্রায় বাবুল বিশ্বাস একা ছিলেন না। শুরু থেকেই নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ গভীর গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টিকে দেখেছেন, দিয়েছেন পরামর্শ ও সহযোগিতা। একইভাবে রামেন্দু মজুমদারও উদ্যোগটির গুরুত্ব শুরুতেই উপলব্ধি করেন এবং আজও সেই উৎসাহ অব্যাহত রেখেছেন। দেশের বিভিন্ন নাট্যদল, নাট্যকর্মী ও নাট্যপ্রেমীও নিয়মিতভাবে উপকরণ সরবরাহ করেছেন। ফলে একক উদ্যোগ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে সমষ্টির কাজে।
কথা প্রসঙ্গে বাবুল বিশ্বাস জানান, ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে ডাকসুর সাংস্কৃতিক দলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম নাট্য–পোস্টার প্রদর্শনী। তাঁর মতে, এটি ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, কারণ এর আগে দেশে এমন উদ্যোগের নজির ছিল না। এরপর থেকে দেশ–বিদেশে—ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রে—এ পর্যন্ত ৫২টি নাট্য–তথ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যব্যক্তিত্বরা উদ্বোধন করেছেন এসব আয়োজন। এতে আমাদের মঞ্চনাটকের ঐতিহাসিক যাত্রা নতুনভাবে পরিচিত হয়েছে বিশ্বদরবারে।
নাট্যকর্মীদের মতে, এখন এই আর্কাইভস শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়; এটি দেশের নাট্য–গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক—অনেকে নিয়মিতভাবে এখানে এসে তথ্য সংগ্রহ করেন। এখানকার উপাত্ত ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে অসংখ্য অভিসন্দর্ভ ও গবেষণাপত্র। বাবুল বিশ্বাস বলেন, যখন দেখেন তরুণ গবেষকেরা এখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করছেন, নতুন তথ্য খুঁজে পাচ্ছেন—তখনই মনে হয়, উৎপল দত্তর সেই কথাগুলো সত্যিই বাস্তব হয়ে উঠেছে।
বাবুল বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই ৪০ বছরের পথ একেবারেই সহজ ছিল না। কখনো অর্থসংকট, কখনো জায়গার সংকট, কখনো নিরুৎসাহ—সবকিছুই এসেছে। তবু বাবুল বিশ্বাস থামেননি। তাঁর ভাষায়, অনেক সময় মনে হয়েছে পারব না, কিন্তু নাটকের প্রতি দায়বদ্ধতাই বারবার টেনে এনেছে কাজে। আজ এই প্রতিষ্ঠানটি একটি বিশ্বমানের নাট্য–তথ্যভান্ডার হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারের মতে, বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। তাঁর ভাষ্যে, ‘এটি বাংলাদেশের মঞ্চ–সংস্কৃতির নীরব ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়াস, এক অনমনীয় সংগ্রামের ফল। ৪০ বছরের এই পথচলায় গৌরব শুধু এক ব্যক্তির নয়; বাংলাদেশের প্রতিটি নাট্যকর্মী, নাট্যপ্রেমী এবং নাটকের সঙ্গে যুক্ত মানুষের।’
সব মিলিয়ে বলা যায়—বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস শুধু দলিল নয়, এটি আমাদের মঞ্চ–সংস্কৃতির স্মৃতি, ইতিহাসের ধারক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে অতীতের সেতুবন্ধ। প্রমাণ করে, ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার কাজও একধরনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা থিয়েটারের মতোই জীবন্ত।