
চরকিতে মুক্তির পর প্রশংসিত হচ্ছে শঙ্খ দাশগুপ্তর ‘চা গরম’। এই সিনেমা, কাজের দর্শন, নতুন সিনেমাসহ নানা প্রসঙ্গে গতকাল নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছেন লতিফুল হক
‘বলি’, ‘গুটি’ থেকে ‘প্রিয় মালতী’—আপনার আগের কাজগুলো বেশি ডার্ক, সিরিয়াস। সেখান থেকে ‘চা গরম’ তুলনামূলক হালকা মেজাজের কাজ। এ বদলটা কি ইচ্ছা করেই?
শঙ্খ দাশগুপ্ত : এর পেছনে কয়েকটা জিনিস কাজ করছে। প্রথমত, পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে এই মুহূর্তে আমরা একটা ডার্কার ওয়ার্ল্ডের মধ্যেই আছি। সেটা আমাদের সমাজ, জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনীতি সব মিলিয়েই। বিনোদন দুনিয়াতেও ডার্ক বা থ্রিলার কনটেন্টই বেশি হচ্ছে। সচেতনভাবে এটাকে পাশ কাটাতে চেয়েছি। চেয়েছি রিফ্রেশিং কিছু করতে, যা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে হবে, আবার বিনোদনও থাকবে। আমার আগের সবগুলো কাজ ডার্ক ঘরানার; কিন্তু আলাদা ছিল। ‘বলি’ ডেলটা ওয়েস্টার্ন, ‘গুটি’ সাসপেন্স থ্রিলার আবার ‘প্রিয় মালতী’ নিখাদ ড্রামা।
আপনার কাজে সব সময় প্রান্তিক মানুষের গল্প উঠে আসে। এ ধরনের গল্প পর্দায় যেন ‘লেকচার’ না হয়ে ওঠে, সেটা কীভাবে সামাল দেন?
শঙ্খ দাশগুপ্ত : আমি নিজেই তো আসলে প্রান্তিক মানুষ। আমার বেড়ে ওঠা মফস্সল শহরে। পরে লম্বা একটা সময় গ্রামে থেকেছি। ক্লাস ফাইভ থেকে এসএসসি পর্যন্ত বরিশালে ছিলাম। এ সময়টাতে অনেক কিছু শিখেছি। খুব কাছ থেকে মানুষ, তাদের জীবনযাপন দেখেছি। নির্মাতা হিসেবে আমার মনে হয়, অনেক গল্প থাকে যেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি না। সচেতনভাবেই সেসব গল্প বলতে চাই। গল্প শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গল্প তো সারা বাংলাদেশে ছড়ানো আছে, পৃথিবীতে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। সে গল্পগুলোও ইন্টারেস্টিং হতে পারে। নির্মাতা হিসেবে আমি চাই বিভিন্ন ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করতে। সেগুলো কতখানি ভালো বা ইন্টারেস্টিং হবে, সেটা তো দক্ষতার ব্যাপার।
এখন তো ওটিটির বেশির ভাগ কাজেই খুব ছোট ছোট দৃশ্য থাকে, প্রচুর জাম্প কাট থাকে। কিন্তু আপনার কাজে বেশির ভাগ শটই লম্বা হয়, ডিটেলিং থাকে...
শঙ্খ দাশগুপ্ত : আমি সময়ের ট্রেন্ডকে অনুসরণ করতে চাই না। চাই যে বিষয় নিয়ে কাজ করছি, সেটা যেন ১০ বছর পরেও মানুষ রিলেট করতে পারে। একটা ‘চা গরম’, একটা ‘প্রিয় মালতী’ বা ‘গুটি’ ১৫ বছর পরেও সমসাময়িক লাগবে যদি ওই সময়টাকে, ওই সময়ের রাজনীতি ধরতে পারেন। এখন যে প্রবণতা চলছে (ছোট ছোট সিকোয়েন্স), সেটা কত দিন থাকবে জানি না। আমার লক্ষ্য ছোট-বড় যে কাজই করি না কেন, সেটা যেন সময়ের সঙ্গে থাকে, আলোচনা-বিতর্ক উসকে দেয়।
আপনি নিজের কাজে প্রধান শিল্পীকে বারবার ‘অস্বস্তি’তে ফেলেন। মেহজাবীন চৌধুরী রোমান্টিক অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন; কিন্তু ‘প্রিয় মালতী’তে একেবারেই অন্য রকম চরিত্র করেছেন। ‘চা গরম’-এ সাফা কবিরের ক্ষেত্রেও সেটা অনেকটা সত্য।
শঙ্খ দাশগুপ্ত : চ্যালেঞ্জটা আপনি শিল্পীকে যে মুহূর্তে দেবেন, তিনিও কিন্তু একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে পড়ে যাবেন। সেটা মেহজাবীনের জায়গা থেকে হোক বা ‘বলি’র চঞ্চল (চৌধুরী) ভাই, ‘গুটি’র (আজমেরী হক) বাঁধন সবার ক্ষেত্রেই। শিল্পী হিসেবে সবাই খুব দক্ষ; কিন্তু আমরা অনেক সময়ই একটা লুপের মধ্যে পড়ে যাই...মনে হয় এই অভিনেতা তো এ রকম কাজ করেন; তার মানে এ ধরনের কাজেই ভালো করবেন। আমরা ভাবছি না, তাঁদের দক্ষতাটাকে অন্যভাবেও কাজে লাগানো যায়। এটা কিন্তু খুবই সুইট চ্যালেঞ্জ। মেহজাবীন ‘গার্ল নেক্সট ডোর’ ধরনের চরিত্র করেছেন, অন্যান্য ধরনের চরিত্রও করেছেন; কিন্তু মালতী হওয়ার ক্ষুধা তো তাঁর থাকবেই। সেই ক্ষুধাকে আমরা ব্যবহার করব না? তিনি যদি চ্যালেঞ্জ না নেন, তখন আমি অন্য শিল্পীর কথা ভাবব। দর্শকেরাও কিন্তু নতুন চরিত্রে অভিনয়শিল্পীকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। নতুন কিছু শিল্পীদেরও চ্যালেঞ্জ নিতে উসকে দেয়।
‘চা গরম’ কেন দর্শক এত পছন্দ করল?
শঙ্খ দাশগুপ্ত : প্রথমত, এটা একটা তাজা হাওয়ার মতো। আমাদের ওটিটি বা সিনেমায় এখন আমরা যা দেখছি, এটা সেগুলোর চেয়ে একটু ভিন্ন। দ্বিতীয়ত ‘চা গরম’-এ আমরা সচেতনভাবে এমন একটা দুনিয়ার গল্প বলার চেষ্টা করেছি, যেখানে নানা সংকট আছে কিন্তু মানুষ হাসতে ভুলে যায়নি। চা–বাগানের ওই মানুষগুলো এত কষ্টের মধ্যেও হেসে হেসে কথা বলে। সেটা রবিন, আইরিন, নন্দিনী—যে চরিত্রই হোক সবাই কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে হাজির হয়। এই চরিত্রগুলো মানুষ পছন্দ করেছে। আরেকটা ব্যাপার, রবিন বা নন্দিনী, সব চরিত্রকে মানুষের বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। তাদের অভিনয়, কমিক টাইমিং দর্শকের ভালো লেগেছে। একটা সময় কিন্তু আমাদের টিভিতে এ ধরনের কাজ হতো। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের টিভিএফের ‘পঞ্চায়েত’সহ বিভিন্ন কাজে এটা দেখা গেছে। টিভিএফের কাজ দেখার পর মনে হয়েছে, ওদের ওখানে যদি এটা কাজ করে, আমাদের এখানে কেন নয়। আমি সচেতনভাবেই ওখান থেকে প্রেরণা নিয়েছি।
‘প্রিয় মালতী’ মুক্তি পেয়েছিল সিনেমা হলে, দুই বছর পর ‘চা গরম’ এল ওটিটিতে। নতুন কী করছেন?
শঙ্খ দাশগুপ্ত : আমরা প্রেক্ষাগৃহের জন্যই নতুন সিনেমার কাজ করছি। চিত্রনাট্য শেষ হলে চলতি বছরেই শুটিং শুরু করব। আগামী বছর ঈদে বা ঈদ ছাড়া অন্য সময়ে সিনেমাটি মুক্তি পেতে পারে। আগে তো কাজটা শেষ করি!