চঞ্চল চৌধুরী। কবির হোসেন
চঞ্চল চৌধুরী। কবির হোসেন

অনেকেই অন্যকে নিয়ে ট্রল করতে বেশি আগ্রহী

ওটিটিতে মুক্তির পর নতুন করে আলোচনায় চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত ‘উৎসব’। সাম্প্রতিক কাজসহ নানা প্রসঙ্গে গত শনিবার সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন মনজুর কাদের

প্রশ্ন

শুনলাম যুক্তরাষ্ট্র গেছেন?

চঞ্চল চৌধুরী : ডালাসে অষ্টম বাংলা চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে আমার যাওয়া। আমার ‘পদাতিক’ সিনেমা দেখানো হয়েছে। তিন দিনের এই আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রথম দিন লালগালিচায় সংবর্ধনা দিল। দ্বিতীয় দিন ছবিটি প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশ থেকে আকরাম খানের ‘নকশিকাঁথার জমিন’ ছাড়াও মোশাররফ করিম ও জুঁই অভিনীত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। দর্শকের উপস্থিতি ছিল হাউসফুল। শো শেষে ৪৫ মিনিটের প্রশ্নোত্তর সেশনটাও চমৎকার অভিজ্ঞতা দিয়েছে।

প্রশ্ন

এখন আপনি কোথায়?

চঞ্চল চৌধুরী : নিউইয়র্ক থেকে গতকাল সকালে (গত শুক্রবার) কলকাতায় এসেছি। এখানে কয়েকটা দিন থাকব।

চঞ্চল চৌধুরী। খালেদ সরকার
প্রশ্ন

শুনলাম ব্রাত্য বসুর সিনেমায় অভিনয় করবেন?

চঞ্চল চৌধুরী : ঠিকই শুনেছেন, ব্রাত্য বসুর নতুন একটি সিনেমায় অভিনয়ের চূড়ান্ত আলাপ আছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি ছবি নিয়ে কথা চলছে। অনেক দিন দেশের বাইরে আসা হয়নি। মাঝে ‘উৎসব’ মুক্তি পেয়েছে, এটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এবার এলাম ব্রাত্য বসুর সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হতে।

প্রশ্ন

ছবিটি সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন...

চঞ্চল চৌধুরী : আপাতত কিছুই বলা যাবে না। এটুকু বলতে পারি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি ছোটগল্প অবলম্বনে ছবিটি তৈরি হচ্ছে, নাম ‘শিকড়’। অক্টোবর থেকে শুটিং।

উৎসব সিনেমার পোস্টার
প্রশ্ন

‘উৎসব’-এর চরিত্রটি আপনাকে কীভাবে নাড়া দিয়েছে?

চঞ্চল চৌধুরী : এই ধরনের গল্পের সিনেমা বাংলাদেশে খুব একটা নির্মিত হয়নি। ছবিটি ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’-এর অ্যাডাপটেশন। গল্পে মজার যে বিষয়, সেটা হলো জয়া, আমি ও অপি করিম অভিনয় করেছি ভূতের চরিত্র। এই ধরনের চরিত্রে আমরা আগে কখনো করিনি। গল্পটা মজার, সঙ্গে আবার আবেগপ্রবণ মুহূর্ত, সব ধরনের দর্শকের দেখার মতো সিনেমা। আমরা তো এখন দেখি অনেক সিনেমা মা-বাবা-সন্তানসহ সিনেমা হলে গিয়ে দেখা হয়ে ওঠে না। উৎসবটা পরিবার নিয়ে হলে গিয়ে দেখার মতো ছবি। প্রথম দিকে যদিও একটু সংশয় ছিল, দর্শক কতটা গ্রহণ করবেন। জাহিদ হাসান ভাই, মিমি আপা, আমি, অপি, জয়া, সৌম্য, সাদিয়া, দিনার ভাই, তারিক আনাম ভাই—সবাই পরীক্ষিত অভিনয়শিল্পী। টিমটা খুব ভালো লেগেছে। তানিম নূর মেধাবী নির্মাতা। গল্পটাকে যেভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন, সবাইকে মুগ্ধ করেছেন। সবকিছু মিলিয়েই এটি আমাকে নাড়া দিয়েছে। চরকিতে মুক্তির পর কলকাতারও কয়েকজন ইউটিউবারের রিভিউ দেখলাম, খুব ইতিবাচক। সিনেমা হলে ছবিটি যেভাবে চলেছে, তা আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে।

প্রশ্ন

এই সিনেমায় আপনার চরিত্রসহ একাধিক চরিত্র নিজেরাই নিজেদের ব্যঙ্গ করেছে...

চঞ্চল চৌধুরী : এখনকার সমাজে তো আমরা নিজের সমালোচনা নিজেরা করি না। এখন অনেকেই অন্যের সমালোচনা করতে, অন্যকে নিয়ে ট্রল করতে বেশি আগ্রহী। এখানে যাঁরা অভিনয় করেছেন, দেখা গেছে, নিজেরা নিজেদের সমালোচনা করেছেন। এটা মজার ছিল। দর্শকেরাও বেশ মজা পেয়েছেন। চ্যালেঞ্জ বলতে, আমাকে আগে দর্শক যেভাবে দেখেছেন, তার চেয়ে নতুন কী দিলাম, এটা বড় ব্যাপার। ভূত নিয়ে তো একেক জনের একেক রকম কল্পনা। দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, বিশ্বাসযোগ্য হবে কি না, এটা নিয়ে চিন্তা ছিল।

চঞ্চল চৌধুরী
প্রশ্ন

সিনেমাটি দর্শক ও সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অভিনয়শিল্পী হিসেবে ছবিটির সাফল্যের কারণ কী বলে মনে করছেন?

চঞ্চল চৌধুরী : দর্শক ছবিটি দেখার ক্ষেত্রে মুখে মুখে প্রচারটা বেশি কাজে দিয়েছে। সিনেমার ক্ষেত্রে প্রচারণা তো এই যুগে লাগে, আলাদা পরিকল্পনাও লাগে। সবচেয়ে বড় কথা ১০ জন দর্শক যখন আরও ১০ জনকে বলেন, তখন ১০০ জন হয়। এই ছবির ক্ষেত্রে এটা ভালোভাবে ঘটেছে। এটা আমার কাছে সফলতার পেছনে অনেক বেশি কাজ করেছে, তবে ছবিটাও তো অবশ্যই অনেক ভালো হয়েছে।

‘পদাতিক’–এ চঞ্চল চৌধুরী। ছবি : নির্মাতার ফেসবুক থেকে
প্রশ্ন

আপনার সমসাময়িক মোশাররফ করিম ‘ইনসাফ’ ছবিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই ছবিতে আপনি অতিথি চরিত্র করেছেন...

চঞ্চল চৌধুরী : সব সময় সিনেমাকে আমার মনে হয় টিমওয়ার্ক। ফুটবল বা ক্রিকেটে ১১ জন খেলোয়াড় নামেন কিন্তু প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায়িত্ব থাকে। প্রত্যেকে যখন ভালো করেন, তখন ম্যাচটা জিতেন। একটা সিনেমার ক্ষেত্রে আমার মনে হয় ছোট চরিত্র, বড় চরিত্র মিলেই ছবিটি সফলতা পায়। তাই আমি কোন চরিত্র ছোট, কোনটা বড়, সেভাবে কখনোই বিচার করি না, টিমওয়ার্ক মনে করি। এই অতিথি চরিত্রে পরিচালক আমাকে নিয়েছেন, সেই চরিত্রে আমি দর্শকের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছি, সেটাই বড় বিষয়। যে চরিত্রে অভিনয় করছি, সেই চরিত্র গল্পে কতটা গুরুত্ব রয়েছে, সেটাই দেখি।

চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিম। ফেসবুক থেকে
প্রশ্ন

মোশাররফ করিমের সঙ্গে আপনার একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে বলে মনে হয়। অনেক ভক্তও এটা মনে করেন। আসলে আপনাদের মধ্যকার সম্পর্কটা কেমন?

চঞ্চল চৌধুরী : ব্যক্তিগতভাবে কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টা আমি মনে করি না। মোশাররফের সঙ্গে অনেক দিন পরপরই দেখা হয়। ১৫ থেকে ২০ বছর আগে আমরা প্রচুর নাটকে অভিনয় করেছি, বিশেষ করে বৃন্দাবন দাসের লেখা, সালাহউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায়। তখন রাতের পর রাত, দিনের পর দিন একসঙ্গে কাটিয়েছি। সেই বন্ধুত্বটা এখনো আছে। অনেক দিন পরপর দেখা হলেও একই বন্ধুত্বের জায়গা বজায় আছে। সত্যি বলতে, আমার কোনো সহকর্মীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। কেউ ভালো কাজ করলে আমার চেষ্টা থাকে যে তাঁর চেয়ে আরও কতটা ভালো করা যায়। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যাঁদের কথা বলা হয়, আমি আসলে তাঁদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হই। মাঝেমধ্যে হয়তো দর্শক আলোচনা-সমালোচনা করেন। এটা যাঁর যাঁর ভাবনার জায়গা।

চঞ্চল চৌধুরী
প্রশ্ন

এর আগে ‘তুফান’ ছবিতে আপনি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন, অতিথি চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নেন?

চঞ্চল চৌধুরী : প্রথম কথা হচ্ছে, যাঁরা কষ্ট করে সিনেমা বানান, যে প্রযোজকেরা কষ্ট করে টাকা ঢালেন, নির্মাতা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে ছবি বানান—এরপর চাওয়া থাকে দর্শক যেন ছবিটা দেখেন। সেই দর্শককে চমক দেওয়ার জন্যই আমরা সিনেমা করি, অভিনয়–গল্পের মাধ্যমে। সেই চমক দেওয়ার জন্য যখন কেউ আমাকে মনে করেন, আমিই সেই ঠিক মানুষ, তখনও আমি এগিয়ে যাই। তাতে দর্শকেরাও বিনোদিত হন। সিনেমার বৃহত্তর সফলতার কথা চিন্তা করে আমি তা ভাবি। আমাদের দেশে সিনেমার সংখ্যা কমেছে, হলের সংখ্যাও কমেছে। দর্শকদের কীভাবে হলমুখী করা যায়, সেটা গত কয়েক ঈদে নতুন করে দেখা গেছে। বাংলাদেশে প্রচুর মানুষ সিনেমা দেখেছেন। সেই সঙ্গে আরও সিনেমা হল যেন বাড়ে, তাই একসঙ্গে সবার কাজ করা উচিত। একে অন্যকে সাপোর্ট করা উচিত। শাকিব খানের সিনেমায় আমি কাজ করব, এখানে দ্বন্দ্ব কিংবা করব কি করব না—এ রকম কোনো ভাবনা কাজ করে না। আমার এও মনে হয়, শাকিব খান একাই তাঁর সিনেমার জন্য যথেষ্ট। সে ক্ষেত্রে কখনো আমি, এবার ঈদে দেখলাম সিয়াম ও নিশো ওরাও ক্যামিও করেছে। এটা এক রকম চমক। এতে দর্শক যদি বিনোদন পান, সমস্যাটা কোথায়। তাতে আমাদের সিনেমাই তো এগিয়ে যাবে।

নির্মাতা রেদওয়ান রনির পরিচালনায় ‘দম’ এ অভিনয় করবেন নিশো ও চঞ্চল চৌধুরী
প্রশ্ন

ঘোষণার পর অনেকটা সময় পার হলো, ‘দম’ নিয়ে আবার শোরগোল শুরু হয়েছে। এই সিনেমা নিয়ে আপনার প্রস্তুতির কথা যদি বলতেন...

চঞ্চল চৌধুরী : মানসিক প্রস্তুতি অনেক আগে থেকে আছে। এখন চিত্রনাট্য চূড়ান্ত হচ্ছে, গল্প তো চূড়ান্ত। সবার শিডিউল ঠিক হচ্ছে, কবে থেকে শুটিং, তার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন

‘দম’-এই নামেই একটা আলাদা কৌতূহল তৈরি হয়। কেমন ধরনের গল্প এটি?

চঞ্চল চৌধুরী : এটাকে আমরা জীবনীশক্তির গল্প বলতে পারি। যতক্ষণ তোমার দম আছে, ততক্ষণ তুমি বাঁচবে, অর্থাৎ দমটাকে হারানো যাবে না। এটা এই ছবির মূল মেসেজ। যদি কেউ নিজে থেকে দম ছেড়ে দেন, তাহলে পরাজয়। তাই আমৃত্যু দম ধরে রাখা উচিত।

প্রশ্ন

অভিনয়ে দীর্ঘ সময় পার করে এসেছেন। নানা চরিত্রে নানা সময় পর্দায় এসেছেন। আপনি কি এখন চরিত্র বেছে নেন, নাকি চরিত্র আপনাকে খুঁজে নেয়?

চঞ্চল চৌধুরী : আমি তো বাছাই করি, আবার চরিত্রও আমাকে খুঁজে নেয়। সব ধরনের চরিত্রে তো এখন অভিনয় করা হয় না। আমি তো অনেক প্ল্যাটফর্মে কাজ করি—টেলিভিশন, ওটিটি, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে। সব সময় চিন্তা করি, যে চরিত্রটা এখন করছি, তা আমার আগের চরিত্রের চেয়ে কতটা আলাদা, আমার নতুন কী করার আছে। অফারও তো প্রচুর আসে, তখন এই ভাবনা মাথায় রেখে বাছাই করি। আর নতুন কোনো নির্মাতা যখন আমাকে নেন, নতুন কোনো চরিত্রের কথা ভেবেই তো আমাকে নেন।

প্রশ্ন

একজন অভিনয়শিল্পীর সামাজিক দায় কতটুকু বলে আপনি মনে করেন...

চঞ্চল চৌধুরী : আমি কেন অভিনয় করি, আমারও তো নিজস্ব একটা ব্যাখা আছে। আমার অভিনয়ের মাধ্যমে সমাজের গল্পগুলো বলতে চাই। একজন নির্মাতাও তাই। সেটার সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্র—সবই জড়িত। গল্পের ভেতর দিয়ে আমাদের সমাজের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরতে হয়। সেখান থেকে কোনো দর্শক যদি ইতিবাচক বার্তা পান, ভালো। আবার বিনোদন পান, তা–ও ভালো। প্রথমত আমরা বিনোদনের জন্য কাজ করি, সেই সঙ্গে সমাজের কিছু কথা বলি। কখনো কখনো সমাজের জন্য তা মঙ্গলজনক ভূমিকা রাখে। সেই আদর্শিক জায়গা থেকে মনে হয় একজন অভিনেতা কাজ করে বা করা উচিত।