মার্কিন ইরোটিক থ্রিলার সিনেমা ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ নিয়ে বেশ সাড়া পড়েছে সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে। সিনেমাটি এখনো প্রেক্ষাগৃহ বা ওটিটিতে মুক্তি পায়নি। ২৩ জানুয়ারি প্রিমিয়ার হয়েছে সানড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে। কিন্তু সেই প্রিমিয়ারের পর থেকেই অনেক গণমাধ্যম, সমালোচক ও সিনেমাপ্রেমীদের আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে এটি।
হেসে কুটিকুটি
গ্রেগ আরাকির নতুন সিনেমা ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’–এর চিত্রনাট্য প্রথমবার হাতে পেয়ে অলিভিয়া ওয়াইল্ডের প্রতিক্রিয়াটা ঠিক কেমন ছিল? ৪১ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী বলেন, সোফায় বসে স্ক্রিপ্ট পড়তে পড়তে তিনি হেসে কুটিকুটি হয়েছেন, এমনকি পরিচালক ও সহলেখক কার্লি সিওরটিনোকে ভয়েস নোট পাঠিয়ে জানিয়েছেন, তিনি এই গল্পটা কতটা ভালোবেসে ফেলেছেন। একই সঙ্গে শর্তও জুড়ে দেন—এই চরিত্রটি তিনি অবশ্যই করতে চান, তবে এলিয়ট চরিত্রে চাই সেরা অভিনেতা।
১০ বছরের বেশি সময় পর এটি গ্রেগ আরাকির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। এখানে অলিভিয়া ওয়াইল্ড অভিনয় করেছেন সমসাময়িক লস অ্যাঞ্জেলেসের এক শিল্পী এরিকা ট্রেসির চরিত্রে। তাঁর বিপরীতে এলিয়ট চরিত্রে প্রয়োজন ছিল এক সাহসী তরুণ অভিনেতার—এরিকার নতুন ইন্টার্ন, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই চরিত্রে বেছে নেওয়া হয় ২২ বছর বয়সী কুপার হফম্যানকে, যিনি প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা ফিলিপ সিমোর হফম্যানের ছেলে। ঝুঁকিপূর্ণ চরিত্রে আগে খুব একটা দেখা না গেলেও আরাকির চোখে তাঁর মধ্যেই ছিল প্রয়োজনীয় গভীরতা। পরিচালক নিজেই মজা করে বলেন, ‘“লিকোরিস পিজ্জা”র সেই ছেলেটিকে এমন চরিত্রে কল্পনা করাটা প্রথমে অদ্ভুতই লেগেছিল, কিন্তু অভিনয়ের দিক থেকে কুপার ছিলেন স্বপ্নের মতো। অলিভিয়া আর কুপারের রসায়ন ছিল দুর্দান্ত।’
যেভাবে তৈরি হলো
এই ছবিতে গ্রেগ আরাকি আশি ও নব্বইয়ের দশকে যৌনতা ও বেড়ে ওঠার গল্প বলেছেন সাহসী ভাষায়। ‘মিস্টিরিয়াস স্কিন’, ‘কাবুম’–এর মতো ছবির পর দীর্ঘ বিরতিতে ছিলেন তিনি। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ দিয়ে আবার ফিরছেন সানড্যান্সে, যা পার্ক সিটিতে তাঁর শেষ প্রিমিয়ার। কারণ, আগামী বছর থেকেই উৎসবটি কলোরাডোতে সরে যাবে। এই দীর্ঘ বিরতির মধ্যে ইন্ডি সিনেমাজগৎ অনেক বদলেছে, তবু আশ্চর্য রকম সহজেই অর্থায়ন জোগাড় হয়েছে ছবিটির। অলিভিয়া ওয়াইল্ডের সম্মতিই যেন সবকিছুর দরজা খুলে দেয়।
এই ছবির পথচলা অবশ্য এক দিনে তৈরি হয়নি। শুরুতে শিল্পী ও অনুপ্রেরণার চরিত্র দুটি ছিল বিপরীত লিঙ্গের। হ্যাশট্যাগমিটু আন্দোলনের পর সেই ভাবনা থেকে সরে আসেন আরাকি। তিনি আর এমন কোনো ছবি করতে চাননি, যেখানে নারীর ওপর সহিংস ক্ষমতার চিত্র (যদি তা সম্মতিতেও হয়) প্রধান হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের ভেতর ঢুকে পড়ে আরেকটি বড় ভাবনা—আজকের তরুণদের সম্পর্কহীনতা। আরাকির ভাষায়, এখনকার প্রজন্ম যেন আর প্রেমে পড়ে না, হৃদয়ভাঙার অভিজ্ঞতা নেয় না, সেই বেপরোয়া এক রাতের সম্পর্কও আর নেই। অথচ এই অভিজ্ঞতাগুলোই মানুষকে গড়ে তোলে। এলিয়ট চরিত্রের বেড়ে ওঠার গল্প তাই হয়ে ওঠে ছবির কেন্দ্রীয় থিম।
কুপার হফম্যানের মধ্যে অলিভিয়া ওয়াইল্ড দেখেছেন আশির দশকের নায়কসুলভ এক সরলতা আছে। অন্যদিকে হফম্যান নিজেই আরাকির সিনেমার সঙ্গে পরিচিত হন এ কাজের সূত্রে এবং দ্রুতই তাঁর সিনেমাভাষার প্রেমে পড়ে যান। অলিভিয়ার সঙ্গে কাজ করার সুযোগও ছিল তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের—ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বসে ‘হাউস’ সিরিজ দেখার স্মৃতিও উঠে আসে কথায়।
মাত্র ১৭ দিনের শুটিংয়ে কুপারকে এমন সব জায়গায় যেতে হয়েছে, যেখানে তিনি আগে কখনো যাননি। ছবিতে এরিকা ও এলিয়টের সম্পর্কে যৌনতা দেখানো হয়েছে অতিবাস্তব ভঙ্গিতে।
হফম্যান স্বীকার বলেন, পরিচালক ও অলিভিয়া এমন নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে তিনি নিজেকে অসহায় মনে করেননি। চরিত্রে ঢোকার জন্য কান ফুটো করানো থেকে শুরু করে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া—সবই ছিল এক বড় পরীক্ষা।
ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিং
এই ছবিতে প্রথমবারের মতো আরাকি কাজ করেছেন একজন ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের সঙ্গে। শিল্পে সময় বদলাচ্ছে—এটা তিনি স্বীকার করেন। তাঁর মতে, সঠিক মানুষ না হলে এই দায়িত্ব কাজকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে ইয়েহুদা ডুয়েনিয়াসের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল পুরোপুরি ইতিবাচক। প্রতিটি দৃশ্যের পর অভিনেতাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাটাই ছিল তাঁর প্রধান কাজ।
দশকের পর দশক ধরে বিতর্কিত, ইরোটিক সিনেমা বানিয়ে আসা আরাকি মনে করেন, যৌনতা ঘিরে সংস্কৃতির দোলাচল কখনো ওপরে ওঠে, কখনো নামে। তাঁর চোখে, আবারও এমন ছবির সময় আসছে, যেগুলো ঝুঁকি নিতে চায়, অস্বস্তি তৈরি করতেও ভয় পায় না। কম বাজেটের স্বাধীন প্রযোজনায় সেই স্বাধীনতাটাই বেশি পাওয়া যায়।
এই ছবিতে অলিভিয়া ওয়াইল্ড নিজেকে মেলে ধরেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক রূপে। দর্শক কুপার হফম্যানকে এমনভাবে দেখবেন, এটা যেমন নতুন অভিজ্ঞতা, তেমনি অলিভিয়ার ক্ষেত্রেও তাই। তিনি প্রতিটি দৃশ্যে হাজির হয়েছেন এক অদম্য কর্তৃত্ব নিয়ে। অভিনেতা-পরিচালক হিসেবে তাঁর কাছে অভিনয় মানে প্রিয় নির্মাতাদের কাছ থেকে শেখার সুযোগও।
আরাকির ভাষায়, অলিভিয়ার মধ্যে তিনি দেখেছেন পুরোনো দিনের তারকাদের মতো এক উপস্থিতি—ইনগ্রিড বার্গম্যান বা গ্রেটা গার্বোর ছায়া। হলিউড নাকি কখনোই ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, তাঁকে কীভাবে ব্যবহার করবে।
এরিকা চরিত্রটি আরাকির কাছেও ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। যৌনতা, শিল্প আর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চরিত্রটির অনেক সংলাপই এসেছে তাঁর নিজের বলা কথা থেকে।
দ্য হলিউড রিপোর্টার অবলম্বনে