
হলিউডে সাফল্যের গল্প অনেক আছে; কিন্তু পিটার ডিঙ্কলেজের গল্প আলাদা। কারণ, তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতা নন, তিনি এমন একজন শিল্পী, যিনি বছরের পর বছর সমাজের প্রচলিত ধারণা, বৈষম্য ও পেশাগত বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। আগামীকাল ১১ জুন এই অভিনেতার জন্মদিন।
সম্প্রতি ক্যারিয়ারের উত্থান ও সংগ্রাম নিয়ে পিটার ডিঙ্কলেজ কথা বলেছেন ভ্যারাইটির সঙ্গে। ‘অ্যাক্টরস অব অ্যাক্টরস’–এ আরেক সহকর্মী কিট হ্যারিংটনের মুখোমুখি হন তিনি। সেখানে উঠে আসে তাঁর ক্যারিয়ারের দুঃসময়ের কথা। ঘটনা প্রসঙ্গে ডিঙ্কলেজ বলেন, ‘২০ দশকে আমরা অনেকেই তখনো জীবনের সঙ্গে লড়াই করছিলাম। এই বয়সটা আসলে ভুল করার, কারও হৃদয় ভাঙার, নিজের হৃদয় ভাঙার, হোঁচট খাওয়ার এবং নানা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আমার মনে হয়, জীবনে ভুল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেখান থেকেই শেখা আসে। কিন্তু আপনাদের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো আপনাদের প্রতিটি ভুলই সবার সামনে প্রকাশ্যে ঘটেছে, সবার জানার বিষয় হয়ে উঠেছে।’
শূন্য থেকে যার শুরু। সেই পিটার ডিঙ্কলেজকে আজ বিশ্বজুড়ে মানুষ চেনে ‘গেম অব থ্রোনস’–এর জন্য; কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার এক অনন্য ইতিহাস। সে গল্পও যেন সিনেমার মতোই।
জন্ম থেকেই ভিন্ন বাস্তবতা
১৯৬৯ সালের ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে জন্মগ্রহণ করেন পিটার ডিঙ্কলেজ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর অ্যাকনড্রোপ্লাসিয়া নামের একধরনের ডোয়ার্ফিজম বা খর্বাকৃতির শারীরিক অবস্থা রয়েছে। যে কারণে তার উচ্চতা কম। ফলে শৈশব থেকেই তাঁকে অন্যদের কৌতূহল, বিদ্রূপ ও সামাজিক অস্বস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শৈশবে তিনি ছিলেন হাসির পাত্র। সবার হাসি উপেক্ষা করেই পথ চলেছেন। তবে এটাও ডিঙ্কলেজ জানিয়েছেন, কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পড়লেও পরিবার তাঁকে কখনো করুণা করে বড় করেনি; বরং তাঁকে শেখানো হয়েছিল নিজের পরিচয়কে গ্রহণ করতে এবং নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখতে। বাস্তবতা মেনে নিয়েই পথ চলেছেন তিনি।
অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন
স্কুলজীবনেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় পিটার ডিঙ্কলেজের। পরে তিনি নিউইয়র্কের বেনিংটন কলেজে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করেন; কিন্তু অভিনয়জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাঁর উচ্চতা ছিল ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি। সেই সময় নব্বইয়ের দশকে হলিউডে খর্বাকৃতির অভিনেতাদের জন্য যে ধরনের চরিত্র লেখা হতো, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল হাস্যরসের উপকরণ, সার্কাসধর্মী চরিত্র বা স্টেরিওটাইপ। বেশির ভাগ সার্কাসের জোকার। ডিঙ্কলেজ এসব চরিত্রে অভিনয় করতে অস্বীকৃতি জানান। এই সিদ্ধান্ত তাঁর ক্যারিয়ারকে আরও কঠিন করে তোলে। বড় বড় প্রস্তাব পেয়েও তিনি আপস করেননি। যার ফলাফল কঠিন সংগ্রাম করতে হয়।
অর্থকষ্টের দিনগুলো
হলিউডে কাজ করার আগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এজেন্টের মাধ্যমে কাজ করতে হয়; কিন্তু কেউ এই অভিনেতার এজেন্ট হতে চাননি। সবাই তাঁকে দেখেই দূরে সরে গেছেন। একাধিক সাক্ষাৎকারে ডিঙ্কলেজ বলেন, অভিনয়ের সুযোগ না থাকায় দীর্ঘ সময় তিনি দারিদ্র্যের মধ্যে কাটিয়েছেন। নিউইয়র্কে ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। কখনো কখনো ভাড়া দেওয়ার টাকাও থাকত না। একবার তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের হিটিং সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। শীতের মধ্যে তাঁকে প্রায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থায় থাকতে হয়েছিল। এ ছাড়া প্রায়ই তাঁর কাছে টাকার এতটাই অভাব হতো যে এক প্যাকেট চিপস খেয়েই তাঁকে রাতের খাওয়া সারতে হতো; কিন্তু তার পরও তিনি নিজের নীতির সঙ্গে আপস করেননি। হলিউডের জোকার হতে চাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভুল ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিত হওয়ার চেয়ে অপেক্ষা করা ভালো। অপেক্ষাই তাঁর ভাগ্য বদলে দেয়।
ভাগ্য বদলের টার্নিং পয়েন্ট
তিনি শুরু দিকে কখনোই ভালো চরিত্রের দেখা পাননি। এর মধে৵ই ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য স্টেশন এজেন্ট’ সিনেমাটি তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতে তিনি এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেন, যার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না তাঁর উচ্চতা; বরং ছিল তাঁর একাকিত্ব, সম্পর্ক ও মানবিক অনুভূতি। এমন চরিত্রে ডিঙ্কলেজের অভিনয় দেখে সমালোচকেরা তাঁর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন। হলিউড প্রথমবারের মতো তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনেতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। এখান থেকে শুরু ভাগ্যবদলের।
‘গেম অব থ্রোনস’ এবং বিশ্বজয়
২০০৩ সালের পরে আর পেছনে তাকাতে হয়নি পিটার ডিঙ্কলেজকে। কমবেশি কাজ করে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তুমুল আলোচিত হবে এমন চরিত্রের দেখা মিলছিল না। অবশেষে ২০১১ সালে গেম অব থ্রোনস সিরিজের টিরিয়ন ল্যানিস্টার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান ডিঙ্কলেজ। প্রথম দিকে তিনিই ছিলেন নির্মাতাদের একমাত্র পছন্দ। কারণ, জর্জ আর আর মার্টিনের জনপ্রিয় উপন্যাসের এই চরিত্রে বুদ্ধিমত্তা, রসবোধ, বেদনা ও রাজনৈতিক কৌশলের যে মিশ্রণ ছিল, তা পর্দায় তুলে ধরার মতো অভিনেতা খুব কমই ছিল। সিরিজটিতে অভিনয়ের পর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি ডিঙ্কলেজও আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হন। টিরিয়ন চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি চারবার এমি পুরস্কার জেতেন, যা টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্জন। সেই সময় তিনি সিরিজের প্রতি পর্ব থেকে পাঁচ লাখ ডলারের বেশি পারিশ্রমিক পেতেন।
স্টেরিও টাইপের বিরুদ্ধে অবস্থান
হোঁচট খেতে খেতেই তিনি শিখেছেন; কিন্তু নিজেকে কখনোই সস্তা করেননি। এমনকি তিনি শুধু নিজের জন্য লড়েননি। তিনি বহুবার প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘খর্বাকৃতির মানুষদের নিয়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে যে পুরোনো ধ্যানধারণা রয়েছে, তা বদলানো প্রয়োজন।’ ২০২২ সালে স্নো হোয়াইটের সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে মন্তব্য করেন, আধুনিক সময়ে এসেও যদি খর্বাকৃতির মানুষদের পুরোনো রূপকথার ছকে দেখানো হয়, তাহলে তা হতাশাজনক। তাঁর বক্তব্য আবার আলোচনারও জন্ম দেয়। খর্বাকৃতির মানুষদের হলিউড নতুন করে ভাবতে থাকে।
ব্যক্তিগত জীবন
তারকাখ্যাতির মধে৵ও ডিঙ্কলেজ ব্যক্তিগত জীবনকে বরাবর আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। স্ত্রী এরিকা শ্মিট একজন নাট্যনির্দেশক। পরিবার ও কাজ—এই দুইয়ের মধ্যেই তিনি নিজের জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ডিঙ্কলেজ বহুবার বলেছেন, তিনি ‘সেলিব্রিটি সংস্কৃতি’ খুব একটা পছন্দ করেন না। লালগালিচা বা সামাজিক অনুষ্ঠানের চেয়ে তিনি চরিত্র ও গল্প নিয়ে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সাক্ষাৎকারেও ব্যক্তিগত জীবন নয়; কাজ ও শিল্প নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। এ ছাড়া একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন করেন। তিনি ৩০৬ কোটি টাকার মালিক।
জীবন থেকে শেখা
পিটার ডিঙ্কলেজের গল্প কেবল একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি সমাজের তৈরি সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। যা নিয়ে নিয়মিত তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি বলেন, পরিশ্রম কখনোই বিফলে যায় না। এ জন্য ধৈর্য ধরতে হয়। দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়া, অর্থকষ্ট, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি নিজের শিল্পীসত্তাকে বিসর্জন দেননি। আর সে কারণেই আজ তিনি শুধু একজন তারকা নন; বরং অনুপ্রেরণার প্রতীক।
‘মোড় ঘোরানো মুহূর্ত খুঁজতে যেয়ো না’
ডিঙ্কলেজের জীবন একজন অভিনেতাকে মনে করিয়ে দেয়—সাফল্য সব সময় দ্রুত আসে না। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় জয় আসে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, দৃঢ়তা এবং নিজের প্রতি অটল বিশ্বাস থেকে। তাঁর সেরা একটি উক্তি, জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত খুঁজতে যেয়ো না। কারণ, সেগুলো আলাদা করে আসে না। যে মুহূর্তগুলো তোমাকে গড়ে তুলেছে, সেগুলো ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। আর প্রায়ই তিনি বলেন, তুমি একবার নিজের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাগুলো মেনে নিলে সেগুলো আর কেউ তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না। এখন ৩০৬ কোটি থাকলেও একদিন অভাব ও বিদ্রূপ ছিল নিত্যসঙ্গী। এগুলোই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।
তথ্য: ভ্যারাইটি, আইএমডিবি