‘উদারিং হাইটস’-এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘উদারিং হাইটস’-এর দৃশ্য। আইএমডিবি

বছরের শুরুতেই বিতর্কের ঝড়, কেন এত ক্ষোভ এই সিনেমা নিয়ে

সাধারণত বছরের সবচেয়ে বিতর্কিত ছবির তকমা যায় কোনো রাজনৈতিক থ্রিলার বা নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে বানানো হরর সিনেমার ঝুলিতে। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে উনিশ শতকের এক ক্ল্যাসিক উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ—‘উদারিং হাইটস’।

এমিলি ব্রন্টের উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালক এমেরাল্ড ফেনেলের নতুন ছবি ‘উদারিং হাইটস’ ঘোষণার পর থেকেই অনলাইনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কাস্টিং থেকে শুরু করে পোশাক, উচ্চারণ, এমনকি ছবির ভিজ্যুয়াল স্টাইল—সবকিছু নিয়েই চলছে সমালোচনার ঝড়। অনেকে বলছেন, এটি বছরের সবচেয়ে বিভাজন তৈরি করা ছবি।
শুরু থেকেই ক্ষোভ ২০২৪ সালের মাঝামাঝি, যখন ঘোষণা আসে যে ‘প্রমিজিং ইয়ং ওম্যান’ ও ‘সল্টবার্ন’ পরিচালক এমেরাল্ড ফেনেল ব্রন্টের এই ক্ল্যাসিক উপন্যাসের নতুন রূপ আনছেন, তখনই আপত্তি শুরু হয়। ফেনেলের আগের ছবিগুলো নিয়ে আগে থেকেই একদল সমালোচক অভিযোগ তুলেছিলেন—তিনি নাকি গুরুতর বিষয় (যেমন যৌন নিপীড়ন, শ্রেণি সংঘাত) নিয়ে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত সবকিছু হয়ে যায় বাহ্যিক চাকচিক্যর প্রদর্শনী। তাই অনেকের আশঙ্কা ছিল, ‘উদারিং হাইটস’-এর ক্ষেত্রেও তিনি মূল আবেগ ও সাহিত্যিক গভীরতা নষ্ট করে ফেলবেন।

কাস্টিং নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক
বিতর্ক আরও তীব্র হয়, যখন ঘোষণা আসে—মার্গো রবি অভিনয় করবেন ক্যাথি আর্নশ চরিত্রে, আর জ্যাকব এলর্দি হবেন হিথক্লিফ। উপন্যাসে ক্যাথি ও হিথক্লিফের প্রেমের সময় তারা কিশোর বয়সে। সেখানে রবি ও এলর্দি যথাক্রমে ৩৫ ও ২৮ বছর বয়সী। অনেকেই এটিকে চরিত্রের বয়স ও আবেগের সঙ্গে অসামঞ্জস্য বলে মনে করেন।
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয় হিথক্লিফ চরিত্রকে ঘিরে। উপন্যাসে তাকে ‘ডার্ক-স্কিনড’ আর বহিরাগত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অনেক গবেষক মনে করেন, চরিত্রটির বিশেষত্ব বোঝাতেই তার গায়ের রং গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় জ্যাকব এলর্দিকে নেওয়াকে অনেকেই ‘হোয়াইটওয়াশিং’ হিসেবে দেখছেন।

এর আগে ২০১১ সালের ‘উদারিং হাইটস’-এ হিথক্লিফ চরিত্রে ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা জেমস হাউসন। তাই নতুন ছবির কাস্টিং অনেকের চোখে একধাপ পিছিয়ে যাওয়া।
পোশাক, ট্রেলার আর আধুনিকতার অভিযোগ

‘উদারিং হাইটস’ সিনেমার প্রিমিয়ারে মার্গো রবি। এএফপি

ছবির ট্রেলার মুক্তির পর বিতর্ক আরও বেড়ে যায়। সেখানে দেখা যায়—অতিরিক্ত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য, চার্লি এক্সসিএক্সের আধুনিক পপ মিউজিক। ১৮০০ সালের গল্পে ১৯৮০-এর দশকের মতো দেখতে বিয়ের গাউন।

এমন ভিজ্যুয়াল স্টাইল, যা অনেকের চোখে ঝলমলে রিমিক্সের মতো। সমালোচকদের অভিযোগ—ফেনেল মূল উপন্যাসের আবেগ আর গথিক গাম্ভীর্য বাদ দিয়ে এটিকে বানিয়েছেন একধরনের সেক্সি, গ্ল্যামারাস, শক-ভ্যালুনির্ভর চলচ্চিত্ররূপ নিয়ে হাজির হয়েছেন।

কেন এত ক্ষোভ?

প্রশ্ন উঠছে—ফেনেল তো নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতেই পারেন। যেমন ‘ক্লুলেস’ সিনেমায় জেন অস্টেনের গল্পকে নিয়ে গেছে ৯০-এর দশকের ক্যালিফোর্নিয়ায়, আবার বাজ লারম্যানের ‘রোমিও + জুলিয়েট’-এ শেক্‌সপিয়রকে আধুনিক রূপ দিয়েছে। তাহলে এখানে এত আপত্তি কেন? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে দুটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, এমেরাল্ড ফেনেলের নিজস্ব ইমেজ। ফেনেল ব্রিটিশ উচ্চবিত্ত সমাজে বেড়ে ওঠা একজন নির্মাতা। ‘সল্টবার্ন’-এ তিনি অভিজাত শ্রেণিকে নিয়ে কাজ করেছিলেন, কিন্তু অনেক সমালোচকের মতে, সেই ছবিতে উচ্চবিত্তদের যথেষ্ট কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়নি।

ফলে অনেক দর্শক ও সমালোচক মনে করেন, ফেনেলের দৃষ্টিভঙ্গি স্বভাবতই ‘পশ’ বা অভিজাতকেন্দ্রিক। সেই কারণে ‘উদারিং হাইটস’-এর মতো আবেগপ্রবণ, সামাজিকভাবে জটিল গল্প তার হাতে কতটা ন্যায্যতা পাবে—তা নিয়েই সন্দেহ।

দ্বিতীয় কারণ হলো, উপন্যাসটিকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ। ‘উদারিং হাইটস’ শুধু একটি উপন্যাস নয়—অনেক পাঠকের কাছে এটি তাঁদের কৈশোর, প্রেমের ধারণা ও আবেগের অংশ। বহু মানুষ এই বইকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখেন। ফলে গল্পে সামান্য পরিবর্তনও অনেকের কাছে ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে ধরা দেয়।
একজন সমালোচক যেমন লিখেছেন—এই উপন্যাসের ভক্তরা শুধু বইটিকে ভালোবাসেন না, তাঁরা এটিকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন।

‘উদারিং হাইটস’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

বিতর্কই কি ছবির প্রচারণা?

মজার বিষয় হলো, এই তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভই হয়তো ছবিটির সবচেয়ে বড় প্রচারণা হয়ে উঠেছে। প্রতিটি নতুন তথ্য, ট্রেলার বা ক্লিপ মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা তৈরি হচ্ছে, যা ছবিটির কৌতূহল ও প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেনেল নিজেও স্বীকার করেছেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই ‘উদারিং হাইটস’-এর প্রতি ভীষণ আবেগপ্রবণ। এমনকি তিনি বলেছেন, অন্য কেউ এই ছবি বানালে, তিনিও নাকি ক্ষুব্ধ হতেন!

‘উদারিং হাইটস’ ভালো না খারাপ, সেই রায় এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই ছবি ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও বিভাজন তৈরি করা সিনেমাগুলোর একটি।

এখন দেখার বিষয়, এটি কি সত্যিই অতিরঞ্জিত, শক-ভ্যালুনির্ভর এক রিমেক হয়ে থাকবে? নাকি সব বিতর্ক ছাপিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করবে?
ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে সিনেমাটি মুক্তি পাচ্ছে ১৩ ফেব্রুয়ারি।

বিবিসি অবলম্বনে