প্রেক্ষাগৃহে ‘সিনার্স’ মুক্তি পায় গত ১৭ এপ্রিল। মুক্তির আগে রায়ান কুগলারের হরর সিনেমাটি নিয়ে দর্শক-সমালোচক কারোরই খুব একটা উচ্চাশা ছিল না। কিন্তু মুক্তির দিন কয়েক পরেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা তো ছিলই, সঙ্গে ছিল দর্শকের ভিড়। শেষ পর্যন্ত ৯০ মিলিয়ন ডলারের সিনেমাটি ব্যবসা করে ৩৬৮ মিলিয়ন; হয়ে ওঠে বছরের অন্যতম সেরা সিনেমা। পরে সব পুরস্কারেই অনেক মনোনয়ন বাগিয়েছে; কিন্তু পুরস্কার–ভাগ্য সেভাবে সহায় হয়নি। গোল্ডেন গ্লোবে সেভাবে পাত্তা না পাওয়ায় অস্কার নিয়েও তাই উচ্চাশা ছিল না; কিন্তু একাডেমির ৯৭ বছরের রেকর্ড ভেঙে ১৬টি মনোনয়ন পেয়ে চমকে দিয়েছে ‘সিনার্স’!
সংশয় থেকে সাফল্য
নতুন শুরুর আশায় দুই যমজ ভাই ফিরে আসে মিসিসিপিতে, নিজেদের শহরে। তবে তারা জানত না, শহরে এমন কিছু তাদের জন্য অপেক্ষা করছে, যা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। ভ্যাম্পায়ার ঘরানার এই হরর সিনেমার পটভূমি জিম ক্রো আইনের (১৮৭৬ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় বর্ণবাদী আইন) যুগের দক্ষিণ আমেরিকা। অভিনয়শিল্পীদের বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ। পুরো ছবি শুট করা হয়েছে আইম্যাক্স ৭০ এমএম ফরম্যাটে।
মার্ভেলের ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে খ্যাতি পাওয়া পরিচালক রায়ান কুগলার এই সিনেমার মাধ্যমে এমন এক ঝুঁকি নিয়েছিলেন, যাকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল সংশয়। অনেকেরই ধারণা ছিল, মাত্র দুই মাসে লেখা একটি চিত্রনাট্য নিয়ে এত বড় বাজেটের ছবি বানাতে গিয়ে নিজের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছেন কুগলার। ৯ কোটি ডলার বাজেটের এই সিনেমায় বিনিয়োগ করায় ওয়ার্নার ব্রাদার্সকেও অনেকে ‘পাগল’ বলেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, কুগলারকে ছবির ফাইনাল কাটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া এবং ২৫ বছর পর ছবিটির সম্পূর্ণ স্বত্ব তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তিকে অনেকেই স্টুডিও ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত মনে করেছিলেন।
কেউ কেউ বলেছিলেন, এই ছবি বানানোই হতে পারে স্টুডিও পদ্ধতির শেষ অধ্যায়। কিন্তু ‘সিনার্স’ সেই সংশয়কে মিথ্যা প্রমাণ করে খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে আয় করে ৩৬৮ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্য দিয়ে এটি হয়ে ওঠে গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে সফল মৌলিক সিনেমা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দশম সর্বোচ্চ আয় করা আর-রেটেড চলচ্চিত্র। মজার ব্যাপার হলো—এই তালিকায় ‘টার্মিনেটর ২’ কিংবা ‘হ্যাংওভারস’-এর মতো ছবিকেও পেছনে ফেলেছে ‘সিনার্স’।
যে সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি আবারও রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, সেই সময় ‘সিনার্স’ নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি। চিত্রনাট্য লিখতে মাত্র দুই মাস লাগলেও এর পেছনে ছিল বহু বছরের গবেষণা। মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা, দাসপ্রথা-পরবর্তী সংস্কৃতি, ব্লুজ সংগীতের ইতিহাস—ছবিটিতে রয়েছে সবকিছুরই ছাপ। কুগলারের প্রয়াত মামা ছোটবেলায় তাঁকে তাঁর রেকর্ড সংগ্রহের মাধ্যমে ব্লুজ সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই শুরু।
কুগলার ১৯৩০-এর দশকের আলোকচিত্র, নেটিভ আমেরিকান মিথ ও দক্ষিণ আমেরিকার চীনা অভিবাসীদের ইতিহাস নিয়েও গভীরভাবে কাজ করেন—যাঁরা প্রায়ই এই অঞ্চলের ইতিহাসে উপেক্ষিত। সিনেমায় মুদিদোকানদার দম্পতির চরিত্রে অভিনয় করা মালয়েশীয় অভিনেতা ইয়াও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা খুব খুশি, কারণ এখানে এশীয় চরিত্রগুলোকে স্টেরিওটাইপিক উচ্চারণ ছাড়াই ইংরেজিতে কথা বলতে দেখা গেছে।’
সবকিছুর নিখুঁত সমন্বয়
বরাবরের মতোই কুগলার ছবিতে বিভিন্ন উপাদান এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন, যাতে মূল গল্পের গতি ব্যাহত না হয়। কস্টিউম ডিজাইনার রুথ ই কার্টার, সেট ডেকোরেটর মনিক শ্যাম্পেন ও প্রযোজক হিসেবে কুগলারের স্ত্রী জিনজি—সবাই মিলে ছবিটির জগৎ নির্মাণে বড় ভূমিকা রেখেছেন। হেইলি স্টাইনফেল্ড ‘মেরি’ চরিত্রে অভিনয় করে চমকে দিয়েছেন। ডেলরয় লিন্ডো ‘ডেল্টা স্লিম’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই ছবি এমন সব ইতিহাস উন্মোচন করে, যেগুলো এত দিন হয় মুছে ফেলা হয়েছিল, নয়তো গুরুত্বহীন করে রাখা হয়েছিল।
হলিউডের প্রচলিত ধারণা হলো আকর্ষণীয় নারীপ্রধান চরিত্র মানেই হবে তরুণ, ছিপছিপে ও ফরসা। উনমি মোসাকুকে নিয়ে এ ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন নির্মাতা। আর মাইকেল বি জর্ডান? তিনি যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন। যদিও মাইকেলের ক্যারিয়ার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ, ‘সিনার্স’ রায়ান কুগলারের সঙ্গে তাঁর তৃতীয় কাজ। তবু এ ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে দুই ভাইকে করে তুলেছেন আলাদা।
সিনেমা হলে হোক বা স্ট্রিমিং—‘সিনার্স’ মানুষকে কথা বলিয়েছে। কারণ, ছবিটি সবার আবেগকে স্পর্শ করেছে। এক খোলাচিঠিতে কুগলার লিখেছেন, ‘আমি সিনেমায় বিশ্বাস করি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করি। এটা সমাজের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে এবং এই শিল্পে বিশ্বাস রাখা আরও অনেককে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে।’
ছবিটি মুক্তির পর দ্য গার্ডিয়ান লিখেছিল, ‘এই ছবি কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘরানার নিয়ম মেনে চলে না। ফলে দর্শক হলে ঢুকেই জানেন না—গল্প কোন দিকে যাবে। কারণ, এর আগে টিজার বা ট্রেলারে গল্প সম্পর্কে ধোঁয়াশা রাখা হয়; ফলে দেখার সময় দর্শকদের চমকে দিয়েছে। এ কারণেই হয়তো একাধিকবার সিনেমাটি দেখতে হলে ফিরছেন অনেক দর্শক। তাঁরা জানেন—দ্বিতীয়বার দেখলে নতুন কিছু ধরা পড়বে।’
অস্কারে রেকর্ড ১৬ মনোনয়ন পাওয়ার পর রায়ান কুগলার ভ্যারাইটিকে বলেন, ‘আমি খুব খুশি, আমাদের সবাইকে সম্মান জানানো হয়েছে। আমি অবশ্যই পক্ষপাতদুষ্ট; আবার বলছি—আমার সঙ্গে কাজ করা লোকেরা বিশ্বের সেরা।’
ভ্যারাইটি ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে