লাল-নীল স্যুটে আকাশচুম্বী দালানকোঠার এপাশ থেকে ওপাশে মাকড়সার জাল ছুড়ে ঝুলে বেড়ানো স্পাইডার–ম্যানের দুনিয়া থেকে যদি সব রং মুছে ফেলা হয়? যদি তাকে ফেলে দেওয়া হয় নিউইয়র্কের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে আর অপরাধীতে গিজগিজ করা কোনো গলিতে?
স্পাইডার–ভার্সের অগণিত স্পাইডার–ম্যানের ভিড়ে আসলেই এমন একজন আছেন। তাঁর দুনিয়া বিষণ্নতায় সাদা–কালো। চিরচেনা স্পাইডার–ম্যানের এই ডার্ক, ট্র্যাজিক ও সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রূপটি নিয়েই অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে এসেছে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘স্পাইডার-নয়ার’। আর এই লাইভ-অ্যাকশন সিরিজে নামভূমিকায় অভিনয় করে রীতিমতো চমকে দিয়েছেন হলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নিকোলাস কেজ।
একনজরেওয়েব সিরিজ: ‘স্পাইডার-নয়ার’ধরন: নিও-নয়ার, ক্রাইম ড্রামা, সুপারহিরো, অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চারপর্বসংখ্যা: ৮অভিনয়: নিকোলাস কেজ, লি জুন লি, ক্যারেন রদ্রিগেজ, ব্রেন্ডন গ্লিসন, লামোরন মরিসশোরানার: ওরেন উজিয়েল ও স্টিভ লাইটফুটস্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও, এমজিএম+
সময়টা ১৯৩০-এর দশক। যুক্তরাষ্ট্রে চলছে মহামন্দার কাল। নিউইয়র্ক শহরের অলিগলিতে হতাশা আর অপরাধের রাজত্ব। ২০০৯ সালে প্রকাশিত মার্ভেলের নয়ার কমিকসে এই ইউনিভার্সের স্পাইডার–ম্যানের নাম পিটার পার্কারই ছিল। কিন্তু অ্যামাজনের এই লাইভ-অ্যাকশন সিরিজে আনা হয়েছে বড়সড় পরিবর্তন। এখানে স্পাইডার–ম্যান নয়, রয়েছে একজন ‘দ্য স্পাইডার’; আর তার আসল নাম পিটার পার্কারও নয়, বেন রাইলি।
কমিকসবুক ভক্তরা জানেন, মূল মার্ভেল ইউনিভার্সে বেন রাইলি হলো পিটারেরই ক্লোন। কিন্তু সিরিজে কেন এই নামবদল? হলিউডের বিভিন্ন কমিকসবুক ও বিনোদন মাধ্যমগুলো বলছে, এর পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, সনি পিকচার্স ও মার্ভেল স্টুডিওর (ডিজনি) মধ্যকার চরিত্র ব্যবহারের জটিল আইনি চুক্তি। লাইভ-অ্যাকশন সিরিজে ‘পিটার পার্কার’ নামটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সনির ওপর বেশ কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই তার নাম সামান্য বদলে ফেলা হয়েছে। তাই বদলে গেছে সুপারহিরো ছদ্মনামও।
দ্বিতীয়ত, নির্মাতাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা। বয়স্ক, বিষণ্ন ও জীবনের কাছে মার খাওয়া এক গোয়েন্দার গল্প বলতে গিয়ে নির্মাতারা চেনা পিটার পার্কারের ইমেজে হাত দিতে চাননি। বেন রাইলি নামটা তাদের সেই স্বাধীনতা দিয়েছে। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার-ভার্স’ অ্যানিমেশন ছবিতে পিটার পার্কারের নয়ার স্পাইডার–ম্যানের চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কেজ; তবে এবার তিনি লাইভ অ্যাকশনে এলেন বেন রাইলি হিসেবে, দ্য স্পাইডারের ছদ্মপরিচয়ে।
বেন রাইলির স্পাইডার চরিত্রটি মার্ভেলের প্রথাগত কোনো সুপারহিরোর সঙ্গে মেলে না। স্পাইডার-ভার্সের এই দুনিয়ায় সে মূলত একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর বা গোয়েন্দা। পাঁচ বছর হলো সে স্পাইডারের মুখোশ তুলে রেখেছে। কারণ, সে তার ভালোবাসা রুবি উইলিয়ামসকে বাঁচাতে পারেনি। রুবির বলা সেই বিখ্যাত সংলাপ-‘উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপনসিবিলিটি’ বেনকে আজও তাড়া করে ফেরে। এখন তার দিন কাটে সস্তা মদ খেয়ে আর ছোটখাটো কেস সলভ করে। এই অপরাধবোধ আর নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার গল্পই সিরিজের মূল ভিত গড়ে দেয়।
গল্পের শুরু হয় অ্যাডিসন নামের এক লোককে খোঁজার কেস দিয়ে। এই অ্যাডিসন চাইলেই নিজের পুরো শরীরকে আগুনে রূপান্তর করতে পারে! এখানে কমিকবুক ফ্যানদের জন্য একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। মার্ভেল ইউনিভার্সে মিউট্যান্ট আর এনহ্যান্সড মানুষদের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। যারা জন্মগতভাবে ‘এক্স-জিন’বহন করে, তারা হলো মিউট্যান্ট। যেমন এক্স-ম্যান সিরিজের উলভারিন বা প্রফেসর এক্স। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন আমেরিকা, হাল্ক বা খোদ স্পাইডার–ম্যানের মতো যারা তেজস্ক্রিয়তা বা কোনো বৈজ্ঞানিক দুর্ঘটনার ফলে ক্ষমতা পায়, মার্ভেলের ভাষায় তারা হলো ‘এনহ্যান্সড’ বা ‘মিউটেট’।
স্পাইডার-নয়ারের এই সাদাকালো দুনিয়ায় অ্যাডিসন বা স্যান্ডম্যানের মতো চরিত্ররা জন্মগত মিউট্যান্ট নয়। ১৯৩০-এর দশকের অদ্ভুত সব অমানবিক জেনেটিক গবেষণার কারণেই এরা এমন রূপ পেয়েছে। সিরিজে ফ্লিন্ট মার্কো ওরফে স্যান্ডম্যানের চরিত্রে আছেন জ্যাক হিউস্টন। তার সঙ্গে বেনের লড়াইয়ের দৃশ্যগুলো সাধারণ সুপারহিরো সিনেমার চেয়ে আলাদা। এক দৃশ্যে স্যান্ডম্যানের মার খেয়ে বেনের মুখোশ খুলে যায়। তখন সে নিজের পরিচয় লুকোনোর চেয়ে জীবন বাঁচানোকে বেশি গুরুত্ব দেয়। জাল ছুড়ে কোনোরকমে সেবার প্রাণে বাঁচে বেন। এখানে হিরোগিরির চেয়ে টিকে থাকার লড়াইটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
নয়ার ঘরানার সিনেমা বা সিরিজের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘ফেম ফাতাল’। ফরাসি এই শব্দগুচ্ছের মানে হলো এমন এক রহস্যময়ী ও আবেদনময়ী নারী চরিত্র, যে পুরুষকে প্রলুব্ধ করে নিশ্চিত বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। এই সিরিজে ক্যাট হার্ডির চরিত্রে লি জুন লি ঠিক সেই কাজটাই করেছেন। কেবল মোহময়ী উপস্থিতি দিয়েই তিনি দর্শককে আটকে রাখেননি, বরং বেনের বিশ্বাস অর্জনের পর স্যান্ডম্যানের কাছে তার ফিরে যাওয়ার দৃশ্যটি এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা দেয়। প্রেমের ফাঁদে ফেলে বেনের সঙ্গে তার এই বেইমানি সিরিজের গল্পে এক বিষণ্ন ও অন্ধকার মাত্রা যোগ করেছে, যা নয়ার ঘরানার নিখুঁত উদাহরণ।
সিরিজটির মেজাজ বা টোন একদম আলাদা। নির্মাতারা দর্শকদের দুটি অপশন দিয়েছেন—রঙিন অথবা সাদা–কালো। কিন্তু এই সিরিজের আসল স্বাদ পেতে হলে দর্শককে অবশ্যই সাদা–কালো ভার্সনটি দেখতে হবে। ছায়ায় ঢাকা রাস্তা, সিগারেটের ধোঁয়া আর ট্রেঞ্চকোট পরা চরিত্রগুলো মিলে ১৯৩০-এর দশকের দারুণ এক জাদুকরি আবহ তৈরি করে। ট্রেসি জিজি ফিল্ডের কস্টিউম ডিজাইন অনবদ্য। এই স্পাইডার–ম্যানের পরনে কোনো লাল-নীল চকচকে লাইক্রা স্যুট নেই। তার বদলে আছে উলের মাস্ক আর লম্বা জ্যাকেট।
নিকোলাস কেজ অভিনেতা হিসেবে বরাবরই একটু অন্য রকম। তবে বেন রাইলির চরিত্রে তিনি যেন প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। বয়স্ক, ক্লান্ত কিন্তু ভেতরে–ভেতরে ফুঁসতে থাকা এক মানুষের চরিত্রে তিনি দুর্দান্ত। পাশাপাশি বেনের সেক্রেটারি জ্যানেট রুইজের চরিত্রে ক্যারেন রদ্রিগেজের সাবলীল অভিনয় আলাদাভাবে নজর কাড়ে। বেনের সঙ্গে তার বুদ্ধিদীপ্ত আর সপ্রতিভ কথোপকথনগুলো সিরিজের অন্যতম উপভোগ্য দিক। এ ছাড়া সাংবাদিক রবি রবার্টসনের চরিত্রে লামোরন মরিসও বেশ ভালো করেছেন। আর মাফিয়া বস ‘সিলভারমেইন’ চরিত্রে ব্রেন্ডন গ্লিসনের অভিনয় এককথায় দুর্দান্ত।
মার্ভেল বা ডিজনির মাল্টিভার্সের ভিড়ে সুপারহিরোদের গল্পগুলো এখন কেমন যেন একঘেয়ে হয়ে গেছে। সবখানেই সুপারহিরো, সবাই স্পেশাল। এই সুপারহিরো ফ্যাটিগের সময়ে স্পাইডার-নয়ার একটা দারুণ ব্রেক। এটি অন্য কোনো ইউনিভার্সের সঙ্গে জোর করে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেনি। এটি নিজেই একটি নিরেট ক্রাইম থ্রিলার।
তবে সংবেদনশীল দর্শকদের জন্য ছোট্ট একটা সতর্কবাণী দিয়ে রাখা ভালো।
স্পাইডার–ম্যানের এই ভার্সনটি কিন্তু বেশ ডার্ক ও গ্রিটি। তবে যাঁরা মার্ভেলের চেনা ফর্মুলার বাইরে নতুন কিছু খুঁজছেন, তাঁদের জন্য স্পাইডার-নয়ার এক দারুণ উপহার। ২০২৭ সালে স্পাইডার–ভার্সের আগামী সিনেমা ‘স্পাইডার-ম্যান: বিয়ন্ড দ্য স্পাইডার-ভার্স’ আসার কথা রয়েছে। সেখানেও কেজকে এই নয়ার চরিত্রে দেখা যাবে। তবে তার আগে এই সিরিজটি কমিক বুক ফ্যানদের জন্য এক দারুণ ওয়ার্মআপ হবে।