
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর মামলাগুলোর একটি লুসি লেটবি। নবজাতক শিশুদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত এই নার্সকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘দ্য ইনভেস্টিগেশন অব লুসি লেটবি’ আবারও প্রশ্ন তুলেছে—আদৌ কি তিনি দোষী, নাকি ভুল বিচারব্যবস্থার শিকার?
কে এই লুসি লেটবি?
১৯৯০ সালের ৪ জানুয়ারি জন্ম লুসি লেটবির। চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশু নার্সিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ইংল্যান্ডের কাউন্টেস অব চেস্টার হাসপাতালে নবজাতক ইউনিটে কাজ শুরু করেন। সহকর্মীদের ভাষায়, শুরুতে তাঁর আচরণ বা কাজে সন্দেহ করার মতো কিছুই চোখে পড়েনি।
রহস্যজনক শিশুমৃত্যু ও সন্দেহের সূত্রপাত ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসপাতালে একের পর এক নবজাতকের মৃত্যু হতে থাকে। জুন মাসেই কয়েকটি শিশুর মৃত্যু চিকিৎসকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে এবং একটি ভয়ংকর মিল খুঁজে পায়—প্রায় সব সন্দেহজনক মৃত্যুর সময় লুসি লেটবি ডিউটিতে ছিলেন।
এরপর তাঁকে রাতের শিফট থেকে সরিয়ে দিনের শিফটে দেওয়া হয়। কিন্তু তথ্যচিত্রের দাবি অনুযায়ী, দিনের শিফটেও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে।
গ্রেপ্তার ও আদালতের রায়
২০১৮ সালে লুসি লেটবিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ গোপন নথি, যেখানে নবজাতকদের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ছিল। এসব নথি তিনি ভুল করে বাড়িতে এনেছেন বলে দাবি করেন।
২০২২ সালে তাঁর বিচার শুরু হয়। প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, তিনি শিশুদের শরীরে বাতাস ঢুকিয়ে দেওয়া, অতিরিক্ত খাবার দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা তৈরি করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ইনসুলিন প্রয়োগের মতো ভয়ংকর পদ্ধতিতে শিশুদের ক্ষতি করতেন।
২০২৩ সালের আগস্টে আদালত তাঁকে সাত শিশুকে হত্যা এবং আরও সাত শিশুকে হত্যাচেষ্টার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
নতুন তথ্যচিত্রে নতুন প্রশ্ন
নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে নতুন তথ্য। লুসির বর্তমান আইনজীবী মার্ক ম্যাকডোনাল্ড বলেন, এ মামলায় প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ নেই। কোনো ভিডিও ফুটেজ নেই, কেউ তাঁকে সরাসরি কিছু করতে দেখেনি।
পুলিশ যেসব পোস্ট-ইট নোটকে স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখিয়েছে, সেখানে যেমন লেখা ছিল ‘আমি তাদের মেরেছি’, তেমনি ছিল ‘অপবাদ’ ও ‘বৈষম্য’র মতো শব্দ। আইনজীবীর দাবি, সেগুলো ছিল মানসিক চাপ মোকাবিলার অংশ হিসেবে লেখা ব্যক্তিগত অনুভূতি, সরাসরি স্বীকারোক্তি নয়।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন
একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো, লুসি ছিলেন তুলনামূলকভাবে অভিজ্ঞ নার্স, তাই সবচেয়ে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের দায়িত্ব প্রায়ই তাঁর ওপর পড়ত। ফলে সমস্যা হলে তাঁর উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকার কথা। তাঁকে সরানোর পর নবজাতক ইউনিটের মানও কমানো হয়, ফলে সেখানে আর অত গুরুতর রোগী ভর্তি হতো না। তাই মৃত্যুহার কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক বলেই দাবি করছেন তাঁর আইনজীবীরা।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতভেদ
মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ছিল বায়ু প্রবেশজনিত সমস্যার ব্যাখ্যা। কিন্তু কানাডার এক অধ্যাপক ও আরও কয়েকজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের একটি প্যানেল তথ্যচিত্রে দাবি করেছেন—যে উপসর্গগুলো দেখানো হয়েছে, সেগুলো বায়ু প্রবেশ নয়, বরং অক্সিজেনের ঘাটতির কারণেও হতে পারে। তাঁদের মতে, ১৭টি ঘটনার কোনোটিতেই ইচ্ছাকৃত হত্যার পরিষ্কার চিকিৎসা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রাজনীতি ও পুনর্বিচারের দাবি
যুক্তরাজ্যের একজন সংসদ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এখন এই মামলার পুনর্বিচারের দাবি তুলেছেন। তাঁদের ভাষায়, এটি বিচারব্যবস্থার বড় ধরনের ভুল হতে পারে।
তবে তদন্তকারী সংস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ কেউ এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, লুসি লেটবিই দায়ী।
তাহলে সত্য কোথায়?
লুসি লেটবি কি সত্যিই যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর নারী সিরিয়াল কিলার, নাকি তিনি হাসপাতালের ব্যবস্থাগত ত্রুটি ও দুর্বল তদন্তের বলি—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
নতুন তথ্যচিত্র আবারও দেখিয়ে দিল, একটি আদালতের রায়ই সব সময় চূড়ান্ত সত্য নয়। এখন সবার চোখ—এই মামলার কি পুনর্বিচার হবে, আর হলে তাতে বেরিয়ে আসবে কোনো চূড়ান্ত বাস্তবতা।
টাইম অবলম্বনে