
এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৯২ সালের ১৫ জুলাই দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের উইম্বলডন কমনে ঘটে যাওয়া র্যাচেল নিকেলের হত্যাকাণ্ড তেমনই একটি ঘটনা। প্রায় ৩৫ বছর পরও এই ঘটনা মানুষের মনে একইভাবে বেদনাদায়ক, কারণ হত্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল তাঁর মাত্র দুই বছরের ছেলে অ্যালেক্স হ্যান্ডসকম্ব —যে ছিল মায়ের মৃত্যুর একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী।
এই আলোচিত ঘটনা নতুন করে আবার আলোচনায়। কারণ, এই ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি নেটফ্লিক্স নির্মাণ করেছে ক্রাইম ড্রামা সিরিজ ‘দ্য উইটনেস’ ও প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য মার্ডার অব র্যাচেল নিকেল’। চলতি বছরের শেষ দিকে প্রাইম ভিডিও মুক্তি দেবে ‘দ্য উইম্বলডন কিলার’ নামের আরেকটি তথ্যচিত্র সিরিজ।
যে হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছিল ব্রিটেনকে
১৯৯২ সালের ১৫ জুলাই। ২৩ বছর বয়সী মডেল ও তরুণী মা র্যাচেল নিকেল তাঁর দুই বছরের ছেলে অ্যালেক্স এবং পোষা কুকুর মলিকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন উইম্বলডন কমনে। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এক অপরিচিত ব্যক্তি।
দিবালোকে, জনসমাগমের কাছাকাছি এলাকায়, কোনো সতর্কতা ছাড়াই র্যাচেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। এরপর তাঁকে যৌন নির্যাতন করা হয় এবং ৪৯ বার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। পুরো ঘটনাটি ঘটে অ্যালেক্সের চোখের সামনে। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। দুই বছরের শিশুটি হয়ে ওঠে হত্যার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী।
‘মায়ের আত্মা শরীর ছেড়ে চলে যেতে দেখেছিলাম’
বড় হওয়ার পর বহুবার সেই দিনের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন অ্যালেক্স। ২০১৭ সালে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ভুলতে পারব না সেই মুহূর্ত, যখন আমার মায়ের আত্মা তাঁর শরীর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আজও সবকিছু আমার মনে স্পষ্টভাবে আঁকা আছে।’
অ্যালেক্সের স্মৃতিতে এখনো ভাসে সেই অচেনা মানুষটির ছবি। ‘আমরা একজন অপরিচিত মানুষকে দেখেছিলাম। তার কাঁধে একটি কালো ব্যাগ ছিল। সে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। এরপর আমাকে তুলে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেয়। আমার মুখ কাদার ওপর ঘষে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর মা আমার পাশে লুটিয়ে পড়েন,’ বলেন তিনি।
অ্যালেক্স দাবি করেন, তিনি হত্যাকারীকে কাছের ঝরনায় হাতের রক্ত ধুয়ে ফেলতেও দেখেছিলেন। ‘তারপর সে ভূতের মতো অদৃশ্য হয়ে গেল,’ বলেন তিনি।
‘ওঠো মা, ওঠো’
হত্যাকাণ্ডের পরও অ্যালেক্স বুঝতে পারেনি যে তাঁর মা মারা গেছেন। চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে ছিল। নিস্তব্ধ পরিবেশে সে মাকে জাগানোর চেষ্টা করতে থাকে। ‘আমি বলছিলাম, ওঠো মা। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিচ্ছিলেন না। শেষবার সর্বশক্তি দিয়ে বলেছিলাম, ওঠো মা। তখনো কোনো সাড়া পাইনি। সেই মুহূর্তেই বুঝে গিয়েছিলাম, মা আর ফিরবেন না,’ বলেন তিনি।
এরপর রক্তমাখা অবস্থায় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাহায্য চাইতে বের হয় শিশুটি। পথচারীরা তাকে দেখে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেয়। পরে থানায় গিয়ে বাবার কাছ থেকে জানতে পারে, মায়ের সঙ্গে একটি ‘ভয়াবহ দুর্ঘটনা’ ঘটেছে।
তদন্তের ভয়াবহ ব্যর্থতা
অদ্ভুতভাবে, একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও হত্যার পর তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অ্যালেক্সকে জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি।
এটাই ছিল তদন্তের ব্যর্থতার শুরু। পুলিশ ৩২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এক বছরের বেশি সময় পর তারা সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে কলিন স্ট্রাগ নামের এক বেকার ব্যক্তিকে, যিনি প্রায়ই উইম্বলডন কমনে কুকুর হাঁটাতে যেতেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফরেনসিক প্রমাণ ছিল না। ১৯৯৩ সালে তাঁকে অভিযুক্ত করা হলেও ১৩ মাস কারাগারে কাটানোর পর আদালত ১৯৯৪ সালে তাঁকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করেন।
পরে জানা যায়, পুলিশ তথাকথিত ‘হানি ট্র্যাপ’ পদ্ধতি ব্যবহার করে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেছিল। ভুল অভিযোগের কারণে স্ট্যাগকে ৭ লাখ ৬ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এর অর্থ ছিল—আসল হত্যাকারী তখনো মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ধরা পড়ে আসল খুনি
স্ট্যাগ মুক্তি পাওয়ার পর প্রায় এক দশক মামলাটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ২০০২ সালে উন্নত ডিএনএ প্রযুক্তির সাহায্যে তদন্তকারীরা র্যাচেলের শরীর থেকে সংগ্রহ করা নমুনা আবার পরীক্ষা করেন। তখন মিলে যায় এক ভয়ংকর অপরাধীর ডিএনএর সঙ্গে। সে ছিল রবার্ট ন্যাপার—এক সিরিয়াল ধর্ষক ও খুনি, যিনি এর আগেই একাধিক নারীকে আক্রমণের দায়ে ব্রডমুর মানসিক হাসপাতালে আটক ছিলেন। পরে ন্যাপার নিজেই হত্যার কথা স্বীকার করেন।
২০০৮ সালে তাঁকে র্যাচেল নিকেলের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
‘খুনিকে আমি অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছিলাম’
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, খুনি ধরা পড়ার আগেই অ্যালেক্স তাঁর মায়ের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমবার ন্যাপারের ছবি দেখে আমি কিছুই অনুভব করিনি। তাকে কারাগারে পাঠানো আমার কাছে কোনো তৃপ্তি এনে দেয়নি। আমি অনেক আগেই মায়ের খুনিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।’ অ্যালেক্সের মতে, ন্যাপারের শৈশব ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং প্রথম আক্রমণের পর আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। বর্তমানে অ্যালেক্স একজন যোগশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
মায়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই
অ্যালেক্স চান না, তাঁর মায়ের পরিচয় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের শিকার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকুক। বরং তিনি চান, এই ঘটনা পুলিশি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার প্রতীক হয়ে থাকুক। তাঁর ভাষায়, ‘পুলিশ একের পর এক ভুল করেছে। সেই ভুলের কারণে আরও ৮০ জনের বেশি নারী আক্রমণের শিকার হয়েছেন। যত দিন পুলিশ ব্যবস্থার অন্ধকার দিকগুলো রয়ে যাবে, তত দিন এমন ভুল আবারও ঘটবে।’
নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন স্মৃতিকথা ‘লেটিং গো: আ ট্রু স্টোরি অব মার্ডার, লস অ্যান্ড সারভাইভ্যাল’।
আজও তিনি মায়ের স্মৃতি আগলে রেখেছেন। ‘আমি এখনো তাঁর হাসি, গায়ের গন্ধ, কণ্ঠস্বর মনে করতে পারি। তিনি শ্যানেলের ‘কোকো’ পারফিউম ব্যবহার করতেন। এখনো সেই সুগন্ধি, তাঁর গয়না আর ছবিগুলো আমার কাছে আছে। এগুলো আমাকে মায়ের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়,’ বলেন তিনি।
টাইম অবলম্বনে