
রিয়েলিটি শো মানেই যেন বিতর্ক। কিন্তু সেই বিতর্ক যখন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও দর্শকের প্রতিদিনের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তখন সেটি কেবল একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান থাকে না—পরিণত হয় সাংস্কৃতিক আলোচনার বিষয়েও। নেটফ্লিক্সে সম্প্রচারিত ‘লক আপ: সাচ ইয়া সাজা’র দ্বিতীয় মৌসুম ঠিক সেই অবস্থানেই পৌঁছেছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনুষ্ঠানটি কোটি কোটি ঘণ্টা দেখা হয়েছে। নেটফ্লিক্সের তথ্যমতে, মুক্তির পর অল্প সময়েই এটি ৫ কোটি ঘণ্টার বেশি দেখা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করেছে প্রায় ২৫০ কোটি ইন্টারঅ্যাকশন। সংখ্যাগুলো শুধু জনপ্রিয়তারই নয়, বিতর্কেরও সাক্ষ্য দেয়। কারণ, এই মৌসুমে যতটা আলোচনা হয়েছে প্রতিযোগিতা নিয়ে, তার চেয়ে কম নয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, ঝগড়া, অশালীন ভাষা ও বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে।
চুম্বন বিতর্ক
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অভিনেতা রাম কাপুরকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। একটি পর্বে সহ-প্রতিযোগীর সঙ্গে তাঁর চুম্বনের দৃশ্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি লাখো মানুষ দেখেন, কেউ এটিকে নিছক বিনোদনের অংশ বলে ব্যাখ্যা করেন, আবার অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—পারিবারিক দর্শকের জন্য তৈরি একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে এমন দৃশ্য দেখানো কতটা প্রয়োজনীয়? কেউ কেউ এটিকে ‘টিআরপি বাড়ানোর কৌশল’ বলেও সমালোচনা করেন। অন্যদিকে অনুষ্ঠানের সমর্থকদের যুক্তি ছিল, এটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত একটি রিয়েলিটি শো, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের সিদ্ধান্তেই আচরণ করেন।
সহ–প্রতিযোগী শ্রেয়া কালরা অভিযোগ করেন, রাম কাপুর একাধিকবার তাঁর ব্যক্তিগত পরিসীমা অতিক্রম করেছেন। বিভিন্ন টাস্ক শেষে তাঁর গালে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুম্বন করায় তিনি অস্বস্তি বোধ করেন বলেও জানান।
একটি পর্বে শ্রেয়া ও সহ–প্রতিযোগী শিল্পা শিন্দে বলেন, ‘একটু সীমারেখা বজায় রাখুন। আমার বাবা পর্যন্ত আমাকে এত চুমু দেন না। দয়া করে এখন আর আমাকে চুমু দেবেন না।’ তাঁর এই মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে দর্শকদের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
বিতর্কের শুরুতে গৌতমী কাপুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে স্বামীকে সমর্থন করেছিলেন। সেখানে তিনি রামকে ‘খুবই ভালো মনের মানুষ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের পর্বে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়।
শ্রেয়ার প্রেমিক ঋষভ জয়সওয়ালের সঙ্গে শোতে প্রবেশ করে গৌতমী সরাসরি শ্রেয়ার কাছে যান। দুই হাত জোড় করে তিনি বলেন, ‘আপনার যদি কোনো কষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে আমাকে ক্ষমা করবেন। রাম যদি আপনাকে অনুচিতভাবে স্পর্শ করে থাকেন, তাহলে তাঁর পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাইছি।’
তবে বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। প্রতি মৌসুমের মতো এবারও দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল প্রতিযোগীদের পারস্পরিক সম্পর্ক। একই বাড়িতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ একসঙ্গে থাকার ফলে কয়েকজন প্রতিযোগীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে প্রেমের গুঞ্জনে রূপ নেয়। ক্যামেরার সামনে তাঁদের অন্তরঙ্গ কথোপকথন, একে অপরকে মানসিক সমর্থন দেওয়া কিংবা আবেগঘন মুহূর্ত দর্শকদের একাংশের কাছে বাস্তব মনে হলেও অন্য অংশের অভিযোগ, এসবই ‘পরিকল্পিত কনটেন্ট’ দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নির্মিত নাটকীয়তা।
ভারতীয় রিয়েলিটি শোর ইতিহাসে এমন ‘শোম্যান্স’ নতুন নয়। বিগ বস থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিয়েলিটি শোতেও প্রেমের সম্পর্ক বহুবার দর্শক টেনেছে। লক আপ সেই পরীক্ষিত ফর্মুলাই নতুনভাবে ব্যবহার করেছে বলে মনে করছেন অনেক গণমাধ্যম বিশ্লেষক। কারণ, সম্পর্ক তৈরি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা বাড়ে, ভক্তরা পক্ষ নেন, বিরোধীরাও সরব হন—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি আলোচনায় থেকে যায়।
বেফাঁস মন্তব্য
আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রতিযোগীদের বেফাঁস মন্তব্য ঘিরে। উত্তপ্ত তর্কের সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ, অতীত জীবন নিয়ে কটাক্ষ, মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা পেশাগত জীবন নিয়ে নানা মন্তব্য বারবার সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে শুধু একটি সংলাপ বা মন্তব্যের কারণে। কোথাও দর্শক প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কোথাও আবার সেই বক্তব্যই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানের নির্মাতারা অবশ্য শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, ‘লক আপ’–এর মূল আকর্ষণ মানুষের মুখোশ খুলে ফেলা। এখানে তারকারা শুধু প্রতিযোগিতা করেন না, তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের এমন সব অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা, মানসিক আঘাত ও বিতর্কের কথা প্রকাশ করেন, যা সাধারণত ক্যামেরার সামনে বলতে চান না। নির্মাতা একতা কাপুরের ভাষায়, অংশগ্রহণকারীদের ‘গোপন সত্য’ই এই অনুষ্ঠানের প্রাণ।
এই ধারণাটিই সম্ভবত দর্শকদের কৌতূহল বাড়িয়েছে। বাস্তব আর অভিনয়ের সীমারেখা কোথায় শেষ হচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠেছে আলোচনার বিষয়। প্রতিটি পর্বের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকেরা বিশ্লেষণ করছেন—কে সত্য বলছেন, কে অভিনয় করছেন, কে জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক তৈরি করছেন।
উপস্থাপক ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখও অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার পর তাঁরা প্রতিযোগীদের মুখোমুখি করেছেন, কখনো কঠোর প্রশ্ন করেছেন, কখনো পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। ফলে অনুষ্ঠানটি শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং প্রতিটি বিতর্কই পরবর্তী পর্বের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
সমালোচনায় মুখর অন্তর্জাল
সমালোচকদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, চুম্বন, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা সংঘাতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা আড়ালে চলে যায়। এতে রিয়েলিটি শো ধীরে ধীরে কনটেন্টের বদলে বিতর্কনির্ভর বিনোদনে পরিণত হয়। বিশেষ করে তরুণ দর্শকের ওপর এর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতিতে নির্মাতারা সচেতনভাবেই এমন মুহূর্তকে সামনে আনছেন।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তাঁদের মতে, এই অনুষ্ঠান কখনোই পারিবারিক বা শিশুদের জন্য তৈরি বলে দাবি করেনি। বরং মানুষের বাস্তব আবেগ, দুর্বলতা, রাগ, ভালোবাসা ও ভাঙনের গল্পই এখানে দেখানো হয়। ফলে বিতর্কও বাস্তবতারই অংশ।
এই মৌসুমের সাফল্যের পর নেটফ্লিক্স এখনই দ্বিতীয় মৌসুমের ভবিষ্যৎ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও প্রতিষ্ঠানটির কনটেন্ট প্রধান মনিকা শেরগিল জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানটির ফরম্যাট নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে এবং এর সামনে দীর্ঘ পথ অপেক্ষা করছে।
নেটফ্লিক্সের হিট শো
নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার জন্য রিয়েলিটি বিনোদনে বড় সাফল্য হয়ে উঠেছে লক আপ। একতা কাপুরের নির্মিত ‘ক্যাপটিভ রিয়েলিটি’ ঘরানার এই অনুষ্ঠান মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। আর এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় নেটফ্লিক্স এখন তাদের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় আরও কয়েকটি রিয়েলিটি ফরম্যাটের ভারতীয় সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করছে।
ডেডলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার কনটেন্ট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিকা শেরগিল বলেন, নেটফ্লিক্সের নিজস্ব কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক ফরম্যাট বর্তমানে ভারতের জন্য রূপান্তর করা হচ্ছে। তবে কোন অনুষ্ঠানগুলো আসছে, সে বিষয়ে এখনই কিছু জানাতে রাজি হননি তিনি।
মনিকা বলেন, ‘আমরা নেটফ্লিক্সের কয়েকটি খুবই আকর্ষণীয় ও বড় আন্তর্জাতিক ফরম্যাট নিয়ে কাজ করছি। এগুলো ভারতীয় দর্শকদের জন্য তৈরি হবে। খুব শিগগিরই এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।’
৫০ মিলিয়ন ঘণ্টা দেখা হয়েছে
গত ২৭ জুন নেটফ্লিক্সে যাত্রা শুরু করে লক আপ। কারাগারভিত্তিক এই রিয়েলিটি শোতে বিভিন্ন তারকাকে ‘বন্দি’ হিসেবে রাখা হয়। নানা চ্যালেঞ্জ, মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও এলিমিনেশনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় প্রতিযোগিতা।
মনিকা শেরগিল জানান, মুক্তির পর থেকে অনুষ্ঠানটি ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) ঘণ্টা দেখা হয়েছে। পাশাপাশি মাত্র তিন সপ্তাহে অনুষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২৫০ কোটি (২.৫ বিলিয়ন) ইন্টারঅ্যাকশন তৈরি করেছে। তিনি বলেন, লক আপ এখন ভারতের অন্যতম বড় বিনোদন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক তালিকাতেও সাফল্য
অনুষ্ঠানটি টানা দুই সপ্তাহ নেটফ্লিক্সের গ্লোবাল নন-ইংলিশ সিরিজ তালিকায় ছিল। শুরুতে প্রতি সপ্তাহে পাঁচটি করে পর্ব প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও দর্শকের ব্যাপক আগ্রহের কারণে তা বাড়িয়ে ছয়টি করা হয়েছে।
নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক ‘হোয়াট উই ওয়াচড’ প্রতিবেদনে ঘণ্টা হিসেবে দেখা সিরিজগুলোর মধ্যে লক আপ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
কেন জনপ্রিয়
একতা কাপুরের মতে, অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার মূল কারণ প্রতিযোগীদের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প। তিনি বলেন, ‘এখানে তারকারা নিজেদের নিয়ে প্রচলিত ধারণা, বিচার-বিশ্লেষণ ও জীবনের গোপন দিকগুলো দর্শকের সামনে তুলে ধরছেন। তাঁদের জীবনের গোপন গল্পই যেন এই খেলায় টিকে থাকার শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এতে দর্শক তাঁদের মানবিক দিক, সংগ্রাম ও মানসিক আঘাতকে কাছ থেকে দেখতে পারছেন।’
পুরোনো অনুষ্ঠান, নতুন জীবন
লক আপ প্রথম শুরু হয় ২০২২ সালে অল্ট বালাজি ও এমএক্স প্লেয়ারে। পরে সেই প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ বা একীভূত হয়ে গেলে অনুষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নেটফ্লিক্স নতুনভাবে অনুষ্ঠানটি ফিরিয়ে আনে। এবার সঞ্চালনায় আছেন ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখ। প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছেন ধীরাজ ধুপার, শিবাঙ্গী জোশি, হর্ষদ চোপড়া ও শিল্পা শিন্ডের মতো পরিচিত মুখ।
একতা কাপুর জানান, নেটফ্লিক্সের সমর্থনের কারণেই তিনি অনুষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন। অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, ‘একজন নির্মাতার কাছে শুধু অর্থ নয়, সৃজনশীল সমর্থনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নেটফ্লিক্স আমার ভাবনাকে আরও বড় করে দেখেছে এবং পথজুড়ে পাশে থেকেছে।’
দ্বিতীয় মৌসুম নিয়ে এখনই কিছু নয়
‘লক আপ’-এর দ্বিতীয় মৌসুম বা অন্য দেশে এর সংস্করণ তৈরি হবে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি মনিকা শেরগিল বা একতা কাপুর।
তবে মনিকা বলেন, ‘এই ফরম্যাট নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। এখনই নিশ্চিত করতে পারছি না, তবে যেভাবে সাড়া মিলছে, তাতে অনুষ্ঠানটির দীর্ঘ ভবিষ্যৎ রয়েছে বলে মনে করি।’
ডেডলাইন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে