মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স বা এমসিইউর দীর্ঘ পথচলায় আমরা কত কিছুই না দেখলাম! মহাকাশের মহাযুদ্ধ থেকে শুরু করে মাল্টিভার্সের গোলকধাঁধা—সবই যেন এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। সত্যি বলতে, একের পর এক সুপারহিরো সিরিজ আর সিনেমার ভিড়ে দর্শকদের মধ্যে একধরনের ‘সুপারহিরো ফ্যাটিগ’ বা ক্লান্তি চলে আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ঠিক এই মুহূর্তেই চমক হিসেবে হাজির হয়েছে ‘ওয়ান্ডার ম্যান’। মারপিট বা চোখধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্ট নয়, বরং এই মিনি সিরিজটি আপনাকে মুগ্ধ করবে এর অভাবনীয় শান্ত গল্প দিয়ে। মার্ভেলের ষষ্ঠ ফেজের এ সিরিজটি যেন প্রচলিত সব সুপারহিরো ফর্মুলাকে ভেঙে দিয়েছে।
একনজরেমিনি সিরিজ: ‘ওয়ান্ডার ম্যান’ধরন: সুপারহিরো কমেডিভাষা: ইংরেজিক্রিয়েটর: ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন ও অ্যান্ড্রু গেস্টঅভিনয়: ইয়াহিয়া আবদুল-মতিন (দ্বিতীয়), বেন কিংসলেস্ট্রিমিং: ডিজনি+
সিরিজটির গল্প আবর্তিত হয়েছে সাইমন উইলিয়ামসকে কেন্দ্র করে। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন তুখোড় হলিউড অভিনেতা ইয়াহিয়া আবদুল-মতিন (দ্বিতীয়)। সিরিজের প্রথম পর্বেই দেখা যায়, সাইমন ছোটবেলা থেকেই ‘ওয়ান্ডার ম্যান’ নামের একটি সুপারহিরোর ভক্ত। বড় হয়েও তার সেই আবেগ শেষ হয়ে যায়নি। বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসের রুপালি জগতে নিজের জায়গা করে নিতে লড়াই করছে সাইমন। কিন্তু তার সমস্যা হলো, সে বড্ড বেশি ‘মেথড অ্যাক্টিংয়ে’ বিশ্বাসী। কোনো চরিত্রে অভিনয় করার আগে সে এত বেশি চিন্তাভাবনা করে যে শুটিং সেটে পরিচালকদের জন্য তা বিষফোড়া হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ছোটখাটো কাজ পেলেও তাকে বারবার ছাঁটাই হতে হয়। হঠাৎ ‘ওয়ান্ডার ম্যান’ চরিত্রটির ওপর নির্মিত একটি সিনেমার অডিশন দেওয়া। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক অন্য রকম যাত্রা।
গল্পের এই মোড়েই আমাদের দেখা হয় এমসিইউর পুরোনো এক পরিচিত মুখ ট্রেভর স্ল্যাটারির সঙ্গে। অস্কারজয়ী অভিনেতা বেন কিংসলে অভিনীত এ চরিত্রটি মার্ভেল ভক্তদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আয়রন ম্যান সিরিজের তৃতীয় মুভিতে এক নেশাগ্রস্ত, ব্যর্থ অভিনেতা থেকে ‘ম্যান্ডারিন’ সাজা সেই ট্রেভর এখানে সাইমনের বন্ধু এবং মেন্টর। তবে এই বন্ধুত্বের পেছনে কলকাঠি নাড়ে ‘ডিপার্টমেন্ট অব ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ডিওডিসি। ট্রেভর আসলে ডিওডিসির হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করছে। এই রহস্যময় সংস্থাটি দীর্ঘকাল ধরে সাইমনকে নজরে রাখছে। কারণ, সাইমন যখন ১৩ বছর বয়সী কিশোর, তখন এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে সে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল। আসলে সাইমনের ভেতরে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা রয়েছে, যা সে সমাজের ভয়ে লুকিয়ে রাখে।
এই সিরিজে দেখানো হয়—যাদের সুপারপাওয়ার আছে, তারা হলিউডে কাজ করতে পারবে না। অতীতের এক বড় দুর্ঘটনার কারণে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে সাইমনকে প্রতি মুহূর্তে নিজের অতিপ্রাকৃতিক সত্তাকে লুকিয়ে চলতে হয়। সিরিজের মাঝপথে একটি চমৎকার পর্ব রয়েছে, যেখানে এই নিষেধাজ্ঞার পেছনের ইতিহাস দেখানো হয়েছে। যদিও সেই পর্বটি মূল গল্পের গতি কিছুটা শ্লথ করে দেয়, কিন্তু এর নির্মাণশৈলী আপনাকে মুগ্ধ করবে।
তবে ‘ওয়ান্ডার ম্যান’-এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায়। এটি স্রেফ কোনো অ্যাকশন সিরিজ নয়, বরং এটি দুই পুরুষের বন্ধুত্বের আখ্যান। সিরিজে ট্রেভর ও সাইমনের সম্পর্কটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ় হতে থাকে। সাইমনকে ট্রেভর শেখায় কীভাবে অভিনয়ের সময় নিজের জড়তা কাটিয়ে উঠতে হয়। সে তাকে শেখায় কীভাবে মেধার সঙ্গে কৌশলের সমন্বয় ঘটাতে হয়।
সিরিজটি একই সঙ্গে চলচ্চিত্রশিল্পের ওপর একটি চমৎকার পর্যবেক্ষণ এবং অভিনয়ের এক জাদুকরি ক্লাস। এমসিইউর কোনো প্রজেক্টে অভিনয়ের ব্যাকরণ নিয়ে এত সূক্ষ্ম আলোচনা হতে পারে, তা ভাবাই কঠিন ছিল। আমরা দেখি সাইমন কীভাবে তার অডিশন টেপ তৈরি করছে, কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন স্বরে সংলাপের মানে বদলে দিচ্ছে। ইয়াহিয়া আবদুল-মতিন ও বেন কিংসলে যখন স্ক্রিনে অভিনয় নিয়ে কথা বলেন, তখন মনে হয় না তাঁরা কোনো স্ক্রিপ্ট পড়ছেন। মনে হয় যেন বাস্তব জীবনের দুই তুখোড় শিল্পী একে অপরের সঙ্গে কথোপকথন করছেন। বিশেষ করে একটি দৃশ্যে তাঁদের শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে ‘আমাদেউস’ সিনেমার সালিয়েরির সংলাপ বলে যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই সমঝদার ব্যক্তিদের মুগ্ধ করবে।
শিল্পের ক্ষমতা যে কত গভীর হতে পারে, তা এই সিরিজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
যাঁরা প্রতি পর্বে ভিলেনের সঙ্গে নায়কের বিশাল লড়াই দেখার আশা করেন, তাঁদের জন্য ‘ওয়ান্ডার ম্যান’ হয়তো কিছুটা নিরাশাজনক হতে পারে। এখানে সাইমনের ভেতরে শক্তির আভাস পাওয়া যায়, মাঝেমধ্যে তার ক্ষমতার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়। কিন্তু নির্মাতারা সযত্নে একে অ্যাকশন সিরিজ হতে দেননি। তাঁরা ফোকাস করেছেন চরিত্রের বিবর্তনে এবং শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণের ওপর। হলিউডের চাকচিক্যের আড়ালে যে একাকিত্ব এবং সংগ্রামের গল্প থাকে, তা এখানে খুব যত্নসহকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আট পর্বের এই সিরিজের প্রতিটি পর্ব গড়ে আধঘণ্টার মতো। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই এটি যে পরিমাণ আবেগ আর বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ জোগায়, তা অনেক বড় বাজেটের সিরিজও পারে না। এটি একটি অত্যন্ত স্মার্ট, কোমল এবং সত্যিকার অর্থেই ‘ওয়ান্ডারফুল’ কাজ। ইয়াহিয়া আবদুল-মতিনের অভিনয় এককথায় অনবদ্য। তিনি সাইমনের দ্বিধা, ভয় আর আবেগকে জীবন্ত করে তুলেছেন। অন্যদিকে বেন কিংসলে আরও একবার প্রমাণ করেছেন যে কেন তিনি বিশ্বসেরা অভিনেতাদের একজন। তাঁর প্রতিটি চাহনি আর সংলাপে যে গভীরতা আছে, তা সিরিজটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
‘ওয়ান্ডার ম্যান’ মার্ভেলের সত্যিকারের একটি সাহসী প্রজেক্ট। তারা প্রমাণ করেছে একটি সুপারহিরো গল্পে সুপারহিরো অ্যাকশন ছাড়াও সফল হওয়া সম্ভব, যদি হাতের কাছে ভালো গল্প থাকে।