
বয়স ৯৫। ইশার সিং গ্রেওয়ালের (নাসিরউদ্দিন শাহ) শরীর আর চলে না, মন স্মৃতিভ্রান্তির ভারে ক্লান্ত। সারা দিন বিড়বিড় করতে থাকেন একটাই কথা, ‘আমাকে ওখানে যেতে হবে। একটা কাজ অর্ধেক রয়ে গেছে, সেটা শেষ করতে হবে।’ দুই ছেলে ইকবাল (রজত কাপুর) ও অঙ্গদ (জয়প্রীত সিং) আর ছেলের বউ মেহেরের (অঞ্জনা সুখানি) কাছে এসব প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়। এভাবেই শুরু হয় ইমতিয়াজ আলী ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বৃদ্ধের এসব কথা কখনো অসংলগ্ন শব্দ, কখনো যেন বাস্তবতার সঙ্গে মিশে থাকা বিভ্রম। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় তাঁর চাওয়া—দেশভাগের আগে যে পাঞ্জাবে তাঁর শৈশব কেটেছিল, সেখানে ফিরে যেতে চান তিনি। সেই গল্প ধীরে ধীরে সামনে আনে বৃদ্ধের কৈশোর, প্রেম ও হারিয়ে যাওয়া অতীত।
একনজরেসিনেমা: ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ধরন: ড্রামাপরিচালনা: ইমতিয়াজ আলীঅভিনয়: নাসিরউদ্দিন শাহ, দিলজিৎ দোসাঞ্জ, বেদাং রায়না, শর্বরী বাগস্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্সদৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট
দাদা ইশার সিংয় স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তির পর তড়িঘড়ি করে লন্ডন থেকে দেশে ফেরে নিভি (দিলজিৎ দোসাঞ্জ)। নিজের অভিবাসী জীবনের নানা সংকট নিয়ে লড়াই করা এই তরুণ দাদার দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়। বৃদ্ধের জড়িয়ে যাওয়া কথা, হঠাৎ আবেগের বিস্ফোরণ আর ভাঙাচোরা স্মৃতির টুকরো জোড়া লাগাতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে ৭৮ বছর ধরে পরিবারের মধ্যে চাপা পড়ে থাকা একটি রহস্য।
এরপর গল্প চলে যায় দেশভাগের আগের পাঞ্জাবে। ইশার ওরফে তরুণ কিনুর (বেদাং রায়না) গল্পে। মুসলিম তরুণী আফসানার প্রেমের পড়ে কিনু। চোখাচোখি, লুকিয়ে দেখা করা, অপরিণত উর্দু কবিতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক নিষ্পাপ প্রেম। কিন্তু ইতিহাস তাদের ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করেনি। বাধা হয়ে দাঁড়ায় র্যাডক্লিফ লাইন।
রাতারাতি বদলে যায় মানুষের পরিচয়, ঠিকানা, ভবিষ্যৎ। কিনুকে ভারতে চলে আসতে হয়। সঙ্গে নিতে পারেন শুধু একটি প্রতিশ্রুতি—‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ অর্থাৎ ‘আমি ফিরে আসব’। সেই প্রতিশ্রুতিই ধীরে ধীরে তাঁর পুরো জীবনের বোঝা হয়ে ওঠে।
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে স্মৃতিভ্রংশ কেবল একটি অসুস্থতা নয় বরং অতীতে ফিরে যাওয়ার এক অদ্ভুত দরজাও। বৃদ্ধ যখন বিচ্ছিন্ন নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর নাতি সেগুলোকে অর্থহীন প্রলাপ হিসেবে নেয় না। সে প্রতিটি শব্দের অর্থ খোঁজে, প্রতিটি বিচ্ছিন্ন স্মৃতিকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে বোঝা যায়, তাঁর বলা প্রতিটি অদ্ভুত শব্দের পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো স্মৃতি। এই অনুসন্ধানই ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’কে বিশেষ করে তোলে। কারণ, বৃদ্ধের স্মৃতি উদ্ধারের চেষ্টা আসলে একটি হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প উদ্ধারের চেষ্টা। একই সঙ্গে এটি ইতিহাসকে মানুষের গল্প হিসেবে বোঝার চেষ্টাও। নাতি জানে, যারা ভালোবাসার গল্প হারিয়ে ফেলেছে, তাদের সঙ্গে যদি সেই ভালোবাসাও হারিয়ে যায়; তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ঘৃণাই হয়তো উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যাবে।
শুরুতে সিনেমাটি যেন স্রেফ একটি প্রেমের গল্প। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশভাগের বিশাল ট্র্যাজেডি সেই ব্যক্তিগত প্রেমকে গ্রাস করতে থাকে। হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, নারী নির্যাতন, লাশভর্তি ট্রেন, বিচ্ছিন্ন পরিবার, বাস্তুচ্যুতি, বেঁচে থাকার অপরাধবোধ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা মানসিক ক্ষত—সবকিছু মিলিয়ে ব্যক্তিগত প্রেমের কাহিনি পরিণত হয় বৃহত্তর মানবিক বেদনার অংশে। কিনু এক রাতেই যেন বড় হয়ে যায়। নিজের প্রেমের কষ্টের চেয়ে চারপাশের মানুষের কষ্টকে বড় করে দেখতে বাধ্য হয়। তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা মিশে যায় একটি সামষ্টিক শোকের সঙ্গে।
কিনুর চরিত্রটি আরও গভীর হয়ে ওঠে তাঁর পরবর্তী জীবনের দিকে তাকালে। তিনি ৭৮ বছর ধরে আফসানাকে আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন—বিষয়টি এমন নয়। বরং বেঁচে থাকার জন্য তাঁকে জীবনের সেই অধ্যায়টিই ভুলে যেতে হয়েছিল। দেশভাগের ভয়াবহতা তাঁকে নিজের অতীত, প্রেম ও কৈশোর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই প্রথম ১৭ বছর যেন তাঁর জীবনের একটি মুছে ফেলা অধ্যায়। এ কারণেই সিনেমায় তাঁকে একজন ‘দূরত্ব বজায় রাখা বাবা’ হিসেবেও দেখা যায়। নিজের অতীতের সেই অংশ মুছে ফেলতে গিয়ে তিনি যেন ভালোবাসার ক্ষমতার একটি অংশও হারিয়ে ফেলেছেন।
নাসিরউদ্দিন শাহ এই সিনেমার প্রাণ। ৯৫ বছর বয়সী শিখ বৃদ্ধের চরিত্রে তিনি এমন অভিনয় করেছেন, যা সিনেমাটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। স্মৃতি ও স্মৃতিভ্রংশ, বাস্তবতা ও বিভ্রম, আবেগ—সবকিছুর দ্বন্দ্ব তাঁর অভিনয়ে একসঙ্গে ধরা পড়ে। কখনো তিনি যেন নিজের অতীতের ভেতর ঘুরে বেড়ানো এক বৃদ্ধ কবি, কখনো আবার তাঁর মুখে ফুটে ওঠে দেশভাগের ক্ষত বহন করা একজন মানুষের দীর্ঘ জীবনের ক্লান্তি।
সিনেমার আবেগঘন ক্লাইম্যাক্সে তাঁর অভিনয় ভোলার নয়। মনে হয়, একজন মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের হারিয়ে যাওয়া প্রেম ও পরিচয়ের কাছে ফিরে যাচ্ছেন। মৃত্যুশয্যায় তাঁর দৃষ্টি যেন সরাসরি পর্দা ভেদ করে দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।
নাতির চরিত্রে দিলজিৎ দোসাঞ্জও দারুণ। ইমতিয়াজ আলীর আগের সিনেমা ‘অমর সিং চমকিলার’র মতো এখানেও তিনি মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন। সবার অভিনয় অবশ্য সমান শক্তিশালী নয়। তরুণ কিনুর চরিত্রে বেদাং রায়না আন্তরিক হলেও তাঁর অভিনয়ে সেই গভীরতা বা রহস্যময় আকর্ষণ পুরোপুরি পাওয়া যায় না, যা দর্শককে বিশ্বাস করাতে পারে যে এই তরুণই একদিন নাসিরউদ্দিন শাহর অভিনীত ক্ষতবিক্ষত বৃদ্ধে পরিণত হবে। তবে আফসানা চরিত্রে শর্বরী বাগ ইমতিয়াজের চেনা নায়িকার প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রেখেছেন। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি, দুষ্টুমি ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি পুরোনো দিনের প্রেমের আবহকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
সম্পাদক আরতি বাজাজ সিনেমাটির অন্যতম শক্তি। অতীত ও বর্তমান, স্মৃতি ও বাস্তবতা, শব্দ ও নীরবতা—সবকিছুকে তিনি এমনভাবে মিলিয়েছেন যে সিনেমার সময়রেখা কখনো সরলপথে এগোয় না, বরং চরিত্রটির মনের প্রবাহের মতো এগিয়ে চলে। বৃদ্ধ যখন নিজের তরুণ বয়সকে কল্পনায় ফিরে দেখেন, দর্শকও তাঁর সঙ্গে সেই সময়ে চলে যায়। এই বিভ্রমময় বর্ণনাকে দর্শকের জন্য বিচ্ছিন্ন বা দুর্বোধ্য না করে মানবিক করে তুলেছেন বাজাজ। এ আর রাহমানের সংগীত গল্পের আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন অঞ্চল, সংস্কৃতি ও সংগীতধারাকে একসঙ্গে মিশিয়ে তিনি এমন একটি সাউন্ডস্কেপ তৈরি করেছেন, যা ঘোর লাগিয়ে দেয়।
সিনেমাটির কিছু দুর্বলতাও আছে। কাবির (বনিতা সান্ধু) চরিত্রায়ণ, নাতির স্ট্যান্ডআপ কমেডির প্রসঙ্গ এবং নাতির স্বেচ্ছায় অভিবাসনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে দাদার জোর করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার তুলনা—এসব জায়গা কিছুটা কৃত্রিম মনে হয়।
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’য় দেখতে দেখতে বারবার মনে পড়ে ইমতিয়াজ আলীর আগের সিনেমাগুলো। ‘যাব উই মেট’-এর পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, ‘লাভ আজ কাল’-এর দ্বৈত সময়রেখা, নতুন ‘লাভ আজ কাল’-এর চুপি চুপি প্রেম, ‘রকস্টার’ ও ‘তামাশা’র প্রেম ও ঘুরে বেড়ানোর আবেগ, ‘অমর সিং চামকিলা’র আলো-ছায়ার মন্তাজ—সবকিছুরই যেন কোনো না কোনো প্রতিধ্বনি আছে এই ছবিতে। এমনকি ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’-এর পাঞ্জাব ও শিকড়ের ট্রমার সঙ্গেও সিনেমাটির যোগসূত্র পাওয়া যায়।
তবে এবার ইমতিয়াজ আলী যেন নিজের পুরোনো গল্প বলার ধরনকেই প্রশ্ন করেছেন। এত দিন তাঁর সিনেমায় প্রেম ছিল একধরনের ‘নিরাপদ জগৎ’—প্রেমিক-প্রেমিকারা জায়গা ও সময় পেরিয়ে নিজেদের অনুভূতিকে খুঁজে নিতেন। কিন্তু ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’য় প্রেমকে লড়তে হয় পৃথিবীর সঙ্গে।
অন্য অনেক দেশভাগের সিনেমার মতো এখানে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে খলনায়ক বানানো হয়নি। বরং সহিংসতার পেছনে কাজ করা উন্মত্ত, অমানবিক ইতিহাসকেই দায়ী করা হয়েছে। ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—আগের প্রজন্ম কি নিজেদের ট্রমা লুকিয়ে রেখে পরের প্রজন্মকে রক্ষা করতে চেয়েছিল? দেশভাগের ভয়াবহ স্মৃতি সন্তানদের কাছ থেকে গোপন করে রাখা হয়েছিল হয়তো তাদের মানসিকভাবে নিরাপদ রাখার জন্য। কিন্তু এই সিনেমা দেখায়, গভীর ক্ষতকে চাপা দিলে সেটি মুছে যায় না; বরং অন্য রূপে ফিরে আসে। আরও প্রবলভাবে।