প্রথম আলো ভবনে সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটার রাতেই বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অদিতি মহসিন। সেই রাত তাঁর জন্য ছিল গভীর বিষণ্নতা আর হতবাক হয়ে থাকার এক দীর্ঘ সময়। আতঙ্ক আর অস্থিরতায় সারা রাত চোখে ঘুম আসেনি। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পুড়ে যাওয়া ভবনে আয়োজিত ‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে এসে আবারও ফিরে গেলেন সেই বিভীষিকাময় রাতে। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে যেন নতুন করে উপলব্ধি করলেন ঘটনার ভয়াবহতা।
অদিতি মহসিন বলেন, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বরের রাতটি তাঁর কাছে ছিল এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। হঠাৎ করে রাতে দেখলাম প্রথম আলো দাউ দাউ করে জ্বলছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম—ডেইলি স্টার জ্বলছে। গভীর রাতে ছায়ানটে আগুন ও ভাঙচুরের খবর এলো। পরদিন শুনলাম উদীচীও আক্রান্ত হয়েছে। ঘটনাগুলো আমার মনে এক অন্ধকারের ছায়া ফেলেছিল। ভাবছিলাম—আমরা আসলে কোনদিকে যাচ্ছি!’
অদিতি মহসিন জানান, তখন থেকেই দেশের সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম পরিসরের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল তাঁর মনে।
সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলোর ভবন নিয়ে আয়োজিত শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের তৈরি করা ‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনী দেখতে এর আগে এসেছিলেন সরকারের প্রতিমন্ত্রী, খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী, কূটনীতিক, অভিনয়শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষেরা। পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, ভাঙা আসবাব ও বইপত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখে অনেকেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। প্রদর্শনী দেখতে আজ শনিবার দুপুরে এসে অদিতি মহসিনেরও তেমনটাই উপলব্ধি হয়েছে।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখে অদিতি মহসিন বলেন, ‘স্বাধীন দেশে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের মতো প্রধান দুটো পত্রিকায় যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে—তা আজকে প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখার পর পরিষ্কার হলো। তবে এতটা ভয়াবহ বুঝতে পারিনি। আজকে দেখার পর সত্যি সত্যি মনে হলো যে আমাদের কেন এই ধ্বংসের পথে যাওয়া! আমাদের কোনো প্রতিবাদ বা যেকোনো কিছুর প্রতি কোনো ক্ষোভ থাকলে তা শান্তিপূর্ণভাবেও হতে পারে। সত্যি বলতে, এটা প্রতিবাদ নাকি ক্ষোভ সেটা নিয়ে বলতে দ্বিধা আছে আমার—কেননা এটা তো একধরনের সহিংসতা, ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংসতা করা; যাই হোক, আজকে প্রদর্শনীটা ভালো লাগল। এটার নাম দেওয়া হয়েছে আলো—আমি শুধু রাষ্ট্রের কাছে, সমাজের কাছে এই প্রত্যাশা করতে পারি; আমরা যেন আলোর দিকে যেতে পারি। আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা কেউ এভাবে খর্ব করবার চেষ্টাটা যেন কখনো না করে। একই সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিটাও আমি দাবি করি।’
১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অগ্নিদগ্ধ ভবনে প্রতিদিন বেলা ১১টা–১টা এবং ৩টা–৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে। ‘আলো’ শীর্ষক এই আয়োজন চলবে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত।