
আজ তাঁর জন্মদিন। কিন্তু ব্যস্ত এই শহরের ঝলমলে মঞ্চে কেক কাটা কিংবা নিয়মিত নতুন গানের ঘোষণায় তাঁকে দেখা যায় না বহুদিন। তবু ‘নান্টু ঘটক’ নামটা উচ্চারিত হলেই শ্রোতার কানে ভেসে আসে সেই চেনা লাইন—‘পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!’ একসময় যে গান ছাড়া কোনো মঞ্চ কল্পনাই করা যেত না, সেই সুপারহিট গানের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আরমান খানের জন্মদিন আজ ৩ ফেব্রুয়ারি। সময়ের আলো থেকে খানিকটা দূরে থাকলেও তাঁর তৈরি গানগুলো আজও মানুষের স্মৃতিতে সমান তাজা।
প্রমিথিউস ব্যান্ডের বিপ্লবের কণ্ঠে ‘চান্দের বাতির কসম দিয়া’, আর্ক ব্যান্ডের হাসানের গাওয়া ‘শীত নয় গ্রীষ্ম নয় এসেছে বসন্ত’, ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’—এসব গানের সুর ও সংগীতায়োজন ছিল আরমান খানের। তখন ‘ভাইরাল’ শব্দটি প্রচলিত না থাকলেও গানগুলো ছিল সময়ের ভাষা। হাটে–মাঠে, ঘাটে, বাসে কিংবা চায়ের দোকানে—সারাক্ষণই বাজত তাঁর সুর করা গান। দুই দশক পর জন্মদিনের দিনে তাই আবারও ফিরে আসে প্রশ্ন—একসময়ের সেই ব্যস্ত সংগীতস্রষ্টা আজ কোথায়, কেমন আছেন?
জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আজ আরমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনে জানা যায়, দীর্ঘদিন পর মাত্র তিন দিনের ছুটিতে ঢাকায় এসেছেন তিনি। ব্যস্ত কর্মজীবনের ফাঁকে এই অল্প সময়টুকু যেন একধরনের বিরতি। কালই আবার ফিরে যাবেন নিজ কর্মস্থলে। দীর্ঘ আলাপ নয়, সংক্ষিপ্ত কথাবার্তাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সংগীতাঙ্গনের বাইরে থাকলেও শহর, মানুষ আর পুরোনো দিনের স্মৃতির সঙ্গে তাঁর সংযোগ এখনো অটুট। জন্মদিনে আজ তাই স্মৃতির সুরে ফেরা যাক।
সে এক সময়
নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ আর দুই হাজারের শুরুর বছরগুলোতে বাংলা গানের বাজার ছিল পুরোপুরি অডিও অ্যালবামনির্ভর। অনেকের মতে, ক্যাসেট আর সিডির সেই সময়টা ছিল সংগীতশিল্পীদের জন্য স্বর্ণকাল। ঠিক সেই সময়েই আরমান খান হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সংগীত পরিচালকদের একজন। প্রায় প্রতিদিনই তাঁর স্টুডিওতে লেগে থাকত কাজের ভিড়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক রিহার্সাল, রেকর্ডিং আর সুর তৈরির মধ্যেই কাটত দিন। অ্যালবাম, একক গান, নাটকের গান, আবহসংগীত—সব মিলিয়ে স্টুডিওই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি।
২০০২ থেকে ২০০৫—মাত্র তিন বছরে তিনি প্রায় ২৩টি অডিও অ্যালবাম সম্পন্ন করেন। সে সময় বাংলাদেশের প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পীর সঙ্গেই তাঁর কাজ হয়েছে। কণ্ঠশিল্পী থেকে যন্ত্রশিল্পী—সবাই জানতেন, আরমান খানের স্টুডিও মানেই ব্যস্ততা, শৃঙ্খলা আর সৃষ্টিশীল পরিবেশ। এই অস্বাভাবিক ব্যস্ততা তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল।
একই সময়ে নাটকের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। একের পর এক নতুন টেলিভিশন চ্যানেল চালু হয়, নাট্য প্রযোজনাও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। পরিচালকেরা নিয়মিত ভিড় করতে শুরু করেন আরমান খানের স্টুডিওতে। নাট্যকার আবদুল্লাহ আল–মামুনের লেখা বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদিনের ধারাবাহিক নাটক ‘জোয়ার ভাটা’ দিয়ে শুরু হয় তাঁর নাটকের আবহসংগীতের যাত্রা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ধারাবাহিক নাটক থেকে শুরু করে একক নাটক—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সুর ও সংগীতায়োজন হয়ে ওঠে আলাদা করে চেনা।
পরবর্তী সময়ে ১২ শতাধিক নাটকের আবহসংগীত করেন আরমান খান। নাটকের আবহে কখন, কোথায় নীরবতা দরকার, কোথায় সুর—এই সূক্ষ্ম বোধ তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। সে সময় তাঁর দিন মানেই ছিল—এক স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিও, এক শিল্পীর পর আরেক শিল্পীর কণ্ঠে গান তুলে নেওয়া। এই অবিরাম কাজই তাঁকে সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগীত পরিচালকে পরিণত করেছিল।
ক্লান্তি, হতাশা আর প্রশ্ন
সাফল্যের ভিড়েই ধীরে ধীরে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে আরমান খানের মনে। তিনি দেখেন, মঞ্চে গান করা শিল্পীরা ভালো পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। অথচ যাঁরা গান লেখেন, যন্ত্র বাজান—তাঁদের সম্মানী খুবই কম। একটি গান লিখে একজন গীতিকার পেতেন মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা কিংবা আরও কম। যন্ত্রশিল্পীদের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। এই বৈষম্য তাঁকে ভীষণ কষ্ট দিত। আরমান খান বলেন, তাঁর ইচ্ছা হতো সহশিল্পীদের হাতে আরও কিছু টাকা তুলে দিতে; কিন্তু বাস্তবতায় সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। অডিও ক্যাসেটের প্রচলিত বাজারে কলাকুশলীদের নাম ও ছবি থাকত খুব ছোট করে। এরপর এল সিডির যুগ। নতুন বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিল পাইরেসি। সংগীতের অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করল। এ পরিস্থিতিতে তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
সংগীত থেকে দূরে, জীবনের নতুন পথে
সংগীতাঙ্গন থেকে সরে গিয়ে আরমান খান জীবনের একেবারে নতুন অধ্যায় শুরু করেন। ২০১৩ সালে তিনি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে গ্র্যান্ড সুলতান হোটেলে বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। সংগীতে যেমন ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতা নিয়ে কাজ করেছেন, ঠিক তেমনই নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে নিজেকে গড়ে তুলেছেন আতিথেয়তা খাতেও। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বগুণ ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা দ্রুতই কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। ধীরে ধীরে দায়িত্ব বাড়তে থাকে। আর সে পথ ধরেই বর্তমানে তিনি হোটেলটির মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংগীত ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে আরমান খান বলেন, গান করতেন মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য আর এখনো সেটাই করছেন—শুধু ক্ষেত্রটা বদলেছে। তাঁর মতে, অতিথিরা যেন হোটেলে এসে নিশ্চিন্তে, আনন্দে সময় কাটাতে পারেন, সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সংগীতজীবনের মতো এখানেও তিনি কাজ করছেন মন দিয়ে, দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা নিয়ে। সেই পরিশ্রম ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিও মিলেছে। ২০১৯ সালে আতিথেয়তা খাতে সেরা মহাব্যবস্থাপক হিসেবে পুরস্কৃত হন তিনি। সংগীতাঙ্গনে যেমন তিনি নিজের ছাপ রেখেছেন, তেমনি ভিন্ন এক জগতে গিয়েও প্রমাণ করেছেন—সঠিক মনোযোগ আর নিষ্ঠা থাকলে সাফল্যের পথ বদলালেও লক্ষ্য বদলায় না।
দূরে গিয়ে নতুন করে দেখা
সংগীত থেকে দূরে গিয়ে আরমান খান সংগীতকে দেখেছেন ভিন্ন চোখে। এই দূরত্বই তাঁকে ভাবতে শিখিয়েছে নতুন কিছু করার কথা। করোনা মহামারির সময় কিছুটা অবসর পেয়ে শুরু করেন ইউটিউব চ্যানেল ‘বেস্ট অ্যান্ড গ্রেট’। এই চ্যানেলে তিনি তুলে ধরছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সংগীতাঙ্গন গড়ে তোলা মানুষগুলোর গল্প। সত্তর ও আশির দশকের জনপ্রিয় গানগুলোর জন্মকথা নিয়ে তিনি আড্ডা দেন সংগীতাঙ্গনের প্রবীণদের সঙ্গে। সেই আড্ডায় শোনা যায় গানও। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন সংগীত থেকে দূরে থাকায় তিনি এই অঙ্গনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছেন
নিজের শর্তে ফেরা
পুরোপুরি সংগীত ছেড়ে দেননি আরমান খান। নিজের মতো করে, নিজের গতিতে কাজ করছেন। ২০২১ সালে প্রকাশ করেন ‘বন্ধু’ শিরোনামের গান। গানটির কথা, সুর, সংগীতায়োজন ও কণ্ঠ—সবই তাঁর। একই বছর প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণদিবসে তাঁকে স্মরণ করে প্রকাশ করেন ‘আসা–যাওয়া’। গানটির কথা লিখেছেন বাপ্পী খান। সুর ও সংগীত করার পাশাপাশি গানটিতে কণ্ঠও দেন আরমান খান।
এরপর চাচা, বাংলা পপ গানের কিংবদন্তি আজম খানের স্মরণে তৈরি করেন ‘গুরু রে’। চাচার গাওয়া ১০টি জনপ্রিয় গানের কথা অবলম্বনে তৈরি এই গান ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও উত্তরাধিকার বহনের এক অনন্য প্রয়াস।
উত্তরাধিকার থেকে নিজের পথচলা
আরমান খানের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খানের ছেলে। ১৯৭৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্ম নেওয়া আরমানের বেড়ে ওঠা সংগীতের ভেতরেই। তাঁর মা হাবিবুন্নেছা গুলবানু খান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আরমান বড়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর চারপাশ জুড়ে ছিল সুর, যন্ত্র আর রিহার্সালের ব্যস্ততা। বাবা আলম খান যখন নতুন কোনো গানের সুর করতেন, ছোট আরমান পাশে বসে সেই প্রক্রিয়া দেখতেন—কীভাবে একটি সুর ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ গান হয়ে ওঠে, কীভাবে যন্ত্রের ব্যবহার বদলে দেয় আবহ।
বাবার হাত ধরেই সংগীতের হাতেখড়ি। ১৯৯৮ সালে আলম খানের সঙ্গে চলচ্চিত্রে কি–বোর্ড বাজানোর মাধ্যমে আরমান খানের পেশাদার সংগীতজীবন শুরু হয়। শুধু বাজানো নয়, বাবার কাজের ভেতর থেকে তিনি শিখেছেন সংগীতের শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর দায়িত্ববোধ। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি চলতে থাকে সংগীতচর্চা। বাবার স্টুডিওই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম পাঠশালা।
এই সংগীত পরিবারের আরেক গর্ব, তাঁর চাচা—বাংলা পপ গানের কিংবদন্তি আজম খান। আজম খানের বিদ্রোহী কণ্ঠ, ভিন্ন ধারার গান আর জনপ্রিয়তা আরমান খানের সংগীতবোধে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন শাস্ত্রীয় ও চলচ্চিত্রসংগীতের ভিত্তি আর চাচার কাছ থেকে পেয়েছেন সাহস, স্বকীয়তা ও জনপ্রিয় সংগীতের আত্মবিশ্বাস। এ দুই ধারার সম্মিলনই গড়ে তুলেছে আরমান খানের নিজস্ব সংগীতভাষা।
অডিও অ্যালবামের জগতে আরমান করেছেন ২৬টি অ্যালবাম। ‘দোকান’, ‘তিন সত্যি’, ‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’, ‘ঘটক’, ‘দোস্ত দুশমন’—এসব অ্যালবাম একসময় শ্রোতাপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল। উত্তরাধিকার তাঁর পরিচয়ের ভিত্তি হলেও আরমান খান ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের কাজেই। বাবার নামের ছায়ায় নয়, বরং সেই উত্তরাধিকারকে সঙ্গে নিয়ে নিজের পথ তৈরি করাই ছিল তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এবং সেখানেই তিনি সফল।
নিভৃত জীবনে সুরের অনুরণন
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী এমি খান, এক ছেলে আরহাম খান ও এক মেয়ে আনতারা রাইসা খান—এই ছোট সংসারই এখন তাঁর পৃথিবী। অবসর পেলেই পিয়ানোর সামনে বসে নিজের মতো করে সুর খোঁজেন। কর্মক্ষেত্রের কাছেই একটা পাহাড়ের ওপর নির্জনে বাবা–মায়ের কবর; মন চাইলে সেখানে গিয়ে কিছু সময় কাটান নীরবে। ব্যস্ততার মধ্যেও এ মুহূর্তগুলোই তাঁকে নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নেয়।
পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে, সংগীতাঙ্গনের আড্ডা মিস করেন—তবু জীবন নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই আরমানের। সময়ের সঙ্গে বদলে নেওয়ার এ অভ্যাসই তাঁকে শিখিয়েছে, দূরে গেলে অনেক কিছু নতুনভাবে দেখা যায়।
আজ জন্মদিনে আরমান খান আলোচনার কেন্দ্রে না থাকলেও তাঁর গান এখনো মানুষের উৎসবের অংশ। বিয়ের অনুষ্ঠান, গায়েহলুদের আসর কিংবা গ্রামগঞ্জের আনন্দঘন মুহূর্তে আজও বাজে—‘পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!’ সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু গানের আবেদন বদলায়নি। গানের কারিগর নিজে থাকেন আলোর ভিড়ের বাইরে, পাহাড়ঘেরা শ্রীমঙ্গলে—নিভৃতে। আর তাঁর গান থেকে যায় মানুষের জীবনের আনন্দ–উৎসবে।