হামিন আহমেদ
হামিন আহমেদ

খালেদা জিয়া বললেন, ওরা এই বাড়িতেই খাবে—আমরা যা খাই, তাই খাবে...

৪ দশকের বেশি সময় ধরে ব্যান্ড মাইলসের পথচলা। এই দীর্ঘ পথচলায় তাদের রয়েছে নানা রকম স্মৃতি। তেমনই এক স্মৃতির কথা আজ ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য হামিন আহমেদ তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন। এই স্মৃতি সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে। ফেসবুক পোস্টের শুরুতে হামিন আহমেদ লিখেছেন, ‘এর আগে কখনো বলা হয়নি, আজ শেয়ার করছি।’  

ফেসবুক পোস্টের শুরুতে হামিন আহমেদ জানান, ১৯৯৩–৯৪ সালের কথা। ব্যান্ড মাইলসকে তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাসভবনে সংগীত পরিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সময়ের ঘটনাটি শেয়ার করে হামিন আহমেদ লিখেছেন, ‘তখন মাইলসের সদস্য ছিলাম আমি, শাফিন, মানাম এবং সম্ভবত মাহবুব। প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকবেন—এই কারণে আমরা ভীষণ রোমাঞ্চিত, কৌতূহলী এবং কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। সেখানে তারেক রহমান এবং তাঁর বন্ধুরাও উপস্থিত ছিলেন। আমরা শাফিন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বাসভবনে যাই। সেদিনই প্রথমবার বেগম খালেদা জিয়াকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়—তিনি ছিলেন অভিজাত, ব্যক্তিত্বপূর্ণ ও মার্জিত। তবু আমাদের সঙ্গে এমন আন্তরিকতা ও সৌজন্যতা নিয়ে কথা বললেন, আমরা সবাই সত্যিই অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। তারেক রহমান ও তাঁর বন্ধুরাও আমাদের খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া

মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে দুপুরে সাউন্ডচেক করেন মাইলস সদস্যরা। করতে করতে দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যায়। সেই সময়ে ঘটে আরও অভূতপূর্ব ঘটনা, এমনটা উল্লেখ করে হামিন আহমেদ লিখেছেন, ‘আমরা বেলা ২টা থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত সাউন্ড চেক করি—যা মাইলসের জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তখন দুপুরের খাবারের সময়। স্বাভাবিকভাবেই জিয়া পরিবারের বন্ধু ও আত্মীয়রা আমাদের কাছাকাছি কোথাও দুপুরের খাবারের জন্য নিয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বললেন, ‘না, ওরা এই বাড়িতেই খাবে। আমরা যা খাই, ওরাও তাই খাবে।’

কানাডার অ্যাডমন্টনের লেক লুইসের সামনে মাইলসের সদস্যরা

খাবারের টেবিলে সেদিন মাইলস সদস্যদের অবাক করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আতিথেয়তা। হামিন আহমেদ লিখেছেন, ‘আমরা ডাইনিং টেবিলে বসলাম। আমরা আরও বিস্মিত হই, যখন তিনি নিজেই আমাদের প্লেটে খাবার তুলে দিতে শুরু করেন! আমি আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এটা কি সত্যিই ঘটছে? সেই মুহূর্তে তাঁর প্রতি আমার ভেতরে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিয়েছিল। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি ছিলেন কতটা মানবিক, কতটা বিনয়ী ও সম্মানবোধসম্পন্ন! তিনি চাইলে এসব নাও করতে পারতেন। কিন্তু তিনি করেছিলেন। এ কারণেই তিনি ছিলেন এবং থাকবেন—আমাদের হৃদয়ে, মানুষের হৃদয়ে—বেগম খালেদা জিয়া। সন্ধ্যায় যখন আমরা গান পরিবেশন করি, তিনি অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন এবং পরে আমাদের গানগুলোর প্রশংসাও করেন। সেই দিনের সেই সুন্দর স্মৃতি আমাদের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। বছরের পর বছর সেই স্মৃতি আমাদের ও আমাদের পরিবারের, এমনকি আমার মায়ের ভেতরেও তাঁর প্রতি যে সম্মান, তা আরও দৃঢ় করেছে।’  

হামিন আহমেদ, ফিরোজা বেগম ও শাফিন আহমেদ।

হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ দেশবরেণ্যে নজরুলসংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমের সন্তান। তাঁদের বাবা দেশের আরেক প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ কমল দাশগুপ্ত। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মারা যান ফিরোজা বেগম। মৃত্যুর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে খালেদা জিয়া তখন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, গিয়েছিলেন ফিরোজা বেগমের ঢাকার ইন্দিরা রোডের কালিন্দী অ্যাপার্টমেন্টের বাসায়। হামিন আহমেদ আজকের ফেসবুক পোস্টে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সেদিনের স্মৃতিও তুলে ধরেছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া

হামিন লিখেছেন, ‘৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে আমার মা ফিরোজা বেগম মারা যান—তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ শহীদ মিনারে গিয়েছিলেন। যিনি সারা জীবন জাতীয় কবির গান ধারণ করেছেন ও নজরুলসংগীতকে অন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন—তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আর কেউ আমার মায়ের বাসায় আসেননি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেবল গণমাধ্যমে একটি বার্তা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছিলেন। আমার মায়ের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা বা দাফনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কিন্তু একজন মানুষ একমুহূর্ত দেরি করেননি, অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও তিনি আমার মায়ের কালিন্দীর বাসায় এসে হাজির হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি আমাদের সঙ্গে বসেছিলেন, আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর স্মৃতির গল্প শুনিয়েছেন। আমাদের এমনভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, যেন তিনি আমাদের পরিবারেরই একজন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ, মার্জিত ও মানবিক হৃদয়ের মানুষ। সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি আমার স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। এক আশ্চর্য কাকতালীয় ব্যাপার—বেগম খালেদা জিয়া তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন এমন একটি বাড়িতে, যার নাম ছিল—ফিরোজা।’