‘একদিন আমি তোমার গানগুলো কিনে নেব’—বন্ধু মাইকেল জ্যাকসনের এ কথায় হেসেছিলেন পল ম্যাকার্টনি। কয়েক বছর পর সেই হাসিই হয়তো তাঁর কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মাইকেল জ্যাকসন তখন ক্যারিয়ারের শীর্ষে। পল ম্যাকার্টনি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন শুধু গান গাওয়া নয়, গানের মালিকানাতেও বিনিয়োগ করতে। জ্যাকসনও কথাটা মনে রেখেছিলেন। একদিন বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘একদিন তোমার গানগুলো কিনে নেব।’
ম্যাকার্টনি ভেবেছিলেন, নিছক মজা। কিন্তু ১৯৮৫ সালে জ্যাকসন সত্যিই এমন এক ক্যাটালগ কিনে নিলেন, যার মধ্যে ছিল বিটলসের দুই শতাধিক গান। ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে এটিভি মিউজিকের ক্যাটালগ কিনে নেন জ্যাকসন। এর ফলে এসব গানের প্রকাশনাস্বত্বের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে আসে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই গানগুলোর স্বত্ব ফিরে পেতে একসময় ম্যাকার্টনিই চেষ্টা করেছিলেন।
১৯৮৫ সালের ১০ আগস্ট জ্যাকসনের এই কেনাকাটা চূড়ান্ত হয়। চার দিন পর, ১৪ আগস্ট, সেই অধিগ্রহণের খবর প্রকাশ্যে আসে। আজ, ১৪ আগস্ট ২০২৬—সেই ঘটনার ৪১ বছর। তবে ৪১ বছর পরও জ্যাকসনের সেই সিদ্ধান্তের গল্প পুরোনো হয়নি। বরং যে ক্যাটালগ তিনি ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে কিনেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তার মূল্য বেড়ে শত কোটি ডলারের ঘরে পৌঁছেছে।
যেভাবে হাতছাড়া হয় বিটলসের গান
বিটলসের গানগুলোর মালিকানার জটিল গল্পের শুরু ১৯৬৩ সালে। সে সময় ব্যান্ডটির গান প্রকাশের জন্য গড়ে ওঠে নর্দান সংস। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রকাশক ডিক জেমস এবং জন লেনন ও পল ম্যাকার্টনি।
শুরুতে লেনন ও ম্যাকার্টনি প্রতিষ্ঠানটির ২০ শতাংশ করে মালিক ছিলেন। ১৯৬৫ সালে নর্দান সংস পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হলে তাঁদের অংশ কমে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে।
এরপর বিটলসের সঙ্গে ডিক জেমসের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ১৯৬৯ সালে জেমস নর্দান সংসে তাঁর অংশ এটিভি মিউজিকের কাছে বিক্রি করে দেন। লেনন ও ম্যাকার্টনি নিজেদের অংশ ধরে রাখার চেষ্টা করেন। পরে তাঁদের অংশও এটিভির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ফলে নিজেদের লেখা গানের প্রকাশনাস্বত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান বিটলসের দুই প্রধান গীতিকার। এ সিদ্ধান্তের খেসারত তাঁদের বহু বছর দিতে হয়েছে।
বন্ধুকে ব্যবসার পরামর্শ দিয়েছিলেন ম্যাকার্টনি
মাইকেল জ্যাকসন ও পল ম্যাকার্টনির সম্পর্ক অবশ্য ব্যবসা দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে তাঁদের বন্ধুত্বের শুরু। ম্যাকার্টনির লেখা ‘গার্লফ্রেন্ড’ গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর ব্যান্ড উইংসের ১৯৭৮ সালের ‘লন্ডন টাউন’ অ্যালবামে। পরে ১৯৭৯ সালে জ্যাকসনের ‘অফ দ্য ওয়াল’ অ্যালবামে গানটির একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
এরপর তাঁদের বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ১৯৮২ সালে তাঁরা একসঙ্গে করেন ‘দ্য গার্ল ইজ মাইন’। এই সময়ই সংগীতের ব্যবসা নিয়ে তাঁদের কথাবার্তা হয়।
ম্যাকার্টনি জ্যাকসনকে বোঝান, একজন শিল্পীর জন্য নিজের গানের প্রকাশনাস্বত্বের মালিকানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং মিউজিক পাবলিশিং কতটা লাভজনক ব্যবসা।
পরে ম্যাকার্টনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, জ্যাকসন তখন তাঁকে বলেছিলেন, ‘একদিন আমি তোমারগুলো কিনে নেব।’
ম্যাকার্টনি ভেবেছিলেন, জ্যাকসন মজা করছেন। তিনি যে মজা করছিলেন না, তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি।
৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের চুক্তি
১৯৮৫ সালে এটিভি মিউজিকের ক্যাটালগ বিক্রির জন্য তোলা হয়। এতে ছিল প্রায় চার হাজার গান। এর মধ্যে ছিল বিটলসের লেনন-ম্যাকার্টনির লেখা দুই শতাধিক গান।
ম্যাকার্টনি ক্যাটালগটি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইয়োকো ওনোর সঙ্গেও যৌথভাবে কেনার উদ্যোগের কথা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জ্যাকসনের দেওয়া দামের সঙ্গে তাঁরা পেরে ওঠেননি। ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার দিয়ে ক্যাটালগটি কিনে নেন জ্যাকসন।
তখনকার হিসাবে অঙ্কটি ছিল বিশাল। কিন্তু পরে বোঝা যায়, এটি জ্যাকসনের ক্যারিয়ারের অন্যতম বিচক্ষণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কারণ, তিনি শুধু কয়েক হাজার গানের একটি তালিকা কেনেননি। কিনেছিলেন এমন সব গানের প্রকাশনাস্বত্বের অধিকার, যেগুলো পরবর্তী কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বাজবে, সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হবে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গাইবেন।
বন্ধুত্বে ফাটল
ম্যাকার্টনির কষ্ট শুধু ব্যবসায়িকভাবে হেরে যাওয়ার কারণে ছিল না। তিনি যে মানুষটিকে মিউজিক পাবলিশিংয়ের ব্যবসার গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটির কাছেই নিজের লেখা গানের প্রকাশনাস্বত্ব হারিয়েছিলেন।
পরে জ্যাকসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাকার্টনি বলেন, ‘আমার কাছে ব্যাপারটা একটু অনৈতিক মনে হয়। কারও বন্ধু হয়ে, তারপর সেই বন্ধুর পায়ের নিচের মাটিটাই কিনে নেওয়া—এটা ঠিক নয়।’
বিটলসের আরেক সদস্য জর্জ হ্যারিসনও জ্যাকসনের এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে অদ্ভুত লেগেছিল; কারণ, জ্যাকসন তো ম্যাকার্টনির বন্ধু ছিলেন।
‘এটা তো শুধু ব্যবসা’
ক্যাটালগ কেনার পরও ম্যাকার্টনি ও জ্যাকসনের সম্পর্ক সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায়নি। তবে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়। ম্যাকার্টনি নিজের গানগুলোর স্বত্ব ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো কিনতে যে অর্থ প্রয়োজন ছিল, তা তাঁর নাগালের বাইরে ছিল।
পরে ম্যাকার্টনি জানান, একসময় জ্যাকসনের কাছে তাঁর লেখা গানগুলোর জন্য আরও বেশি রয়্যালটি পাওয়ার অনুরোধও রেখেছিলেন। ম্যাকার্টনির ভাষ্য অনুযায়ী, জ্যাকসনের উত্তর ছিল—‘ওহ পল, এটা তো শুধু ব্যবসা।’
২০০৯ সালে ডেভিড লেটারম্যানের অনুষ্ঠানে ম্যাকার্টনি বলেন, তিনি আশা করেছিলেন, জ্যাকসন তাঁর ও জন লেননের লেখা গানগুলোর জন্য তাঁদের সঙ্গে ভালো একটি আর্থিক সমঝোতায় যাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
যদিও তাঁদের মধ্যে বড় কোনো প্রকাশ্য ঝগড়াও হয়নি; তবে তাঁরা ধীরে ধীরে দূরে সরে গিয়েছিলেন।
জ্যাকসনের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত
১৯৯৫ সালে জ্যাকসন এটিভির সংগীত প্রকাশনা ব্যবসা সনির সঙ্গে একীভূত করেন। তৈরি হয় সনি/এটিভি মিউজিক পাবলিশিং কোম্পানি। নতুন কোম্পানিতে জ্যাকসন ও সনির মালিকানা ছিল ৫০-৫০। এর ফলে জ্যাকসনের কেনা ক্যাটালগের মূল্য আরও বাড়তে থাকে।
মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের শেষ দিকে বিপুল ঋণ থাকলেও সনি/এটিভিতে তাঁর অংশ ছিল অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। ২০০৭ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, তাঁর অংশের মূল্য ছিল প্রায় ৩৯ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ে এর মূল্য আরও বেড়ে যায়।
বড় অঙ্কের হাতবদল
১৯৮৫ সালে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের বিনিয়োগ যে কতটা বড় হয়ে উঠেছিল, সেটি বোঝা যায় ২০১৬ সালের চুক্তিতে।
২০০৯ সালে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পর সনি/এটিভিতে তাঁর মালিকানাধীন ৫০ শতাংশ অংশ তাঁর এস্টেটের নিয়ন্ত্রণে যায়। ২০১৬ সালে সনি জ্যাকসনের এস্টেটের হাতে থাকা সনি/এটিভির ৫০ শতাংশ অংশ প্রায় ৭৫ কোটি ডলারে কিনে নেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে চূড়ান্ত অঙ্কে সামান্য পার্থক্য থাকলেও প্রায় ৭৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৭৫ কোটি ডলারের হিসাব পাওয়া যায়। ফলে সনি/এটিভির একক মালিক হয় সনি।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এটি জ্যাকসনের সব সংগীতসম্পদ বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল না। তাঁর সংগীতসম্পদের বিভিন্ন অংশের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল।
ম্যাকার্টনি কি নিজের গান ফিরে পেয়েছেন
গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় মার্কিন কপিরাইট আইনের মাধ্যমে। কপিরাইট আইন ১৯৭৬ নির্দিষ্ট শর্তে গীতিকারদের বহু বছর আগে হস্তান্তর করা কপিরাইট পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়। বিটলসের গানগুলো প্রকাশের বছর অনুযায়ী ধাপে ধাপে সেই সময়সীমায় পৌঁছাতে থাকে।
ম্যাকার্টনি ২০১৬ সালে সনির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের লেখা বিটলসের কিছু গানের স্বত্ব ফেরত পাওয়ার আইনি উদ্যোগ নেন। পরে ২০১৭ সালে দুই পক্ষ একটি গোপন সমঝোতায় পৌঁছায়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাকার্টনির লেখা বিটলসের নির্দিষ্ট কিছু গানের স্বত্ব কপিরাইট আইনের আওতায় তাঁর কাছে ফিরে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বের সব দেশে ম্যাকার্টনি বিটলসের গানগুলোর প্রকাশনা স্বত্ব পুরোপুরি ফিরে পেয়েছেন। কারণ, মার্কিন কপিরাইট আইনের অধিকার এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মালিকানাকাঠামো এক নয়।
মূল্য পৌঁছাল শত কোটিতে
মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পরও তাঁর সংগীতসম্পদের মূল্য বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে সনি মিউজিক জ্যাকসনের সংগীতসম্পদের একটি বড় অংশ কিনেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়। চুক্তির মূল্য প্রায় ৬০ কোটি ডলার এবং এতে সংগীতসম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ অংশ ছিল বলে প্রতিবেদনগুলোয় উল্লেখ করা হয়। তবে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও চূড়ান্ত মূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি।
চুক্তিটিতে জ্যাকসনের সংগীতের প্রকাশনাস্বত্ব, মাস্টার রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন সম্পদ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর সেই ক্যাটালগেও আছে চমক। এতে স্লাই অ্যান্ড দ্য ফ্যামিলি স্টোনের বহু গানের প্রকাশনা স্বত্বসহ জেরি লি লুইস, জ্যাকি উইলসন, কার্টিস মেফিল্ড, রে চার্লস, পার্সি স্লেজ ও ডায়নের মতো শিল্পীদের লেখা বা পরিবেশিত গান রয়েছে।
জনপ্রিয়তায় নতুন ঢেউ
মাইকেল জ্যাকসনের সংগীতের জনপ্রিয়তায় নতুন করে বড় ঢেউ তুলেছে তাঁকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘মাইকেল’। লুমিনেটের ২০২৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিনেমাটি মুক্তির আগের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে জ্যাকসনের গানের অন-ডিমান্ড অডিও স্ট্রিমিং ছিল ৪ কোটি ৯৯ লাখ। সিনেমা মুক্তির সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি ১৬ লাখে—এক সপ্তাহেই ১৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
এরপরও বাড়তে থাকে গানের শ্রোতা। মুক্তির দুই সপ্তাহ পর সাপ্তাহিক স্ট্রিমিং সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ২০ লাখে পৌঁছায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। সিনেমা মুক্তির চার সপ্তাহ পরও সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্ট্রিমিং কমেছিল মাত্র ১৬ শতাংশ।
লুমিনেটের বিশ্লেষণে এই প্রবণতার সঙ্গে ২০১৮ সালের ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’ সিনেমার পর কুইনের গানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ‘মাইকেল’ শুধু জ্যাকসনের পুরোনো শ্রোতাদের ফিরিয়ে আনেনি, তাঁর সংগীত নতুন শ্রোতার কাছেও পৌঁছে দিতে পারে—এমন ইঙ্গিতও মিলছে।
সেই ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
তথ্যসূত্র: লুমিনেট, বিলবোর্ড ও সিএনএন।