স্ত্রী আফরা ইভনাথ খান ইকরার মৃত্যুর সময় শুটিংয়ে নেপালে ছিলেন ছোট পর্দার অভিনয়শিল্পী জাহের আলভী। ইকরার আত্মহত্যার পর দাফনে না আসায় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। সোমবার রাত আটটার পর ফেসবুকে ২৮ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে দেশে না ফেরা, স্ত্রীর শেষযাত্রায় অনুপস্থিত থাকা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ—সব বিষয়ে কথা বলেন আলভী।
ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘কথাগুলো শুনবেন এবং প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা করবেন।’
শুরুতেই সমালোচকদের উদ্দেশে আলভী বলেন, ‘গল্পের একটা পাতা পড়েই বিচার করছেন। গল্পের একটা পাতা পড়েই আপনারা মনের মতো যা ইচ্ছা বলছেন। কিন্তু পাতার এক পাশ পড়বেন, অন্য পাশ পড়বেন না—তা তো হয় না।’ তিনি জানান, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায় সবকিছু গুছিয়ে বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ‘আমি আসলে সবকিছু গুছিয়ে বলার মতো পরিস্থিতিতে নেই। আপনাদের কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতেই আমি ভিডিওটি করছি,’ বলেন তিনি।
‘দেশে এলেই আমাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতেন’
দাফনে না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলভী বলেন, ‘আপনারা বলছেন, যে মানুষটা ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে আত্মহত্যা করে চলে গেল, শেষবারের মতো তার মুখটা দেখতেও আমি আসলাম না! কিন্তু আপনারা কি আমার দেশে আসার পরিস্থিতি রাখছেন? আমি দেশে আসামাত্রই মব তৈরি হতো। আমাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতেন। আমার ফোনে এ রকম এত এত হুমকি—আমি বলে বোঝাতে পারব না।’ তিনি দাবি করেন, ঢাকায় ফেরার বিমানের টিকিট কেটে নেপালের বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পরও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ফিরে যান। ‘আমার কাছে এমন তথ্যও এসেছে, বিমানবন্দরের বাইরে লোক রাখা আছে। আমি দেশে আসামাত্রই তারা আমাকে মেরে ফেলবে। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে আইনিভাবে মোকাবিলা করতাম। কিন্তু যদি আমিও মারা যাই, তাহলে আমার ছেলে রিজিকের কী হবে? আপনারা কি চান, সে তার বাবাকেও হারাক?’—প্রশ্ন রাখেন তিনি। আলভীর ভাষ্য, ইকরার পরিবারও তাঁকে শেষবার দেখতে দেয়নি। ‘ইকরার শেষ মুখটা আপনারা আমাকে দেখতে দেন নাই, ইকরার পরিবার আমাকে দেখতে দেয় নাই,’ বলেন তিনি।
‘১৬ বছরের সংসার’
ভিডিওতে আবেগাপ্লুত হয়ে আলভী বলেন, ‘১৬ বছর ইকরার সঙ্গে সংসার করছি। একটা মানুষ যদি তার শত্রুর সঙ্গেও ১৬ বছর এক ছাদের নিচে থাকে, সে মারা গেলে তাকে দেখার জন্য ছটফট করে। আর সে আমার বউ ছিল, ভালোবেসে আমরা বিয়ে করেছি। সে মারা গেছে, শেষবারের মতো তার চেহারা আমি দেখব না?’ তিনি আরও জানান, সম্পর্কের টানাপোড়েন অনেক আগে থেকেই চলছিল। ‘তিথির (সহশিল্পী ইফফাত আরা তিথি) সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে থেকেই সম্পর্কটা টক্সিক ছিল। ইকরা অনেক আগে থেকেই আমার কাছে তালাক চাইত। কিন্তু আমি কোনো দিনই তালাক দিতে চাইনি। আমি নিজেই একটা ব্রোকেন ফ্যামিলি থেকে বড় হওয়া ছেলে। ছোটবেলায় বাবা–মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে। আমি চাইনি, আমার সন্তান রিজিক সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাক,’ বলেন তিনি।
সন্দেহ, তৃতীয় পক্ষ ও ‘প্রমাণ আছে’ দাবি
আলভীর দাবি, ইকরা শুরু থেকেই সন্দেহপ্রবণ ছিলেন এবং বাইরের কিছু মানুষের হস্তক্ষেপ সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। ‘আমাদের কমন কিছু মানুষ দিনের পর দিন মানসিকভাবে আঘাত করে এই জায়গায় নিয়ে আসছিল। একটা সংসার তখনই টক্সিক হয়, যখন বাইরের মানুষ ইনভলভ হয়,’ বলেন তিনি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে বলবেন বলে জানান আলভী। ‘আমার কাছে প্রমাণ আছে। অন্য ভিডিওতে বলব,’ বলেন তিনি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট, অভিযোগ ও মামলা
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের একটি বাসায় ইকরা আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। সে সময় আলভী নেপালে শুটিংয়ে ছিলেন। ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে আবেগঘন পোস্টে তিনি লেখেন, ‘খবরটা শোনার পর থেকে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।’ একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ইকরার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, এক সহশিল্পীর সঙ্গে আলভীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছায় এবং সে কারণেই ইকরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ইকরার মা রেবেকা সুলতানা, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের কেউ কেউ একই অভিযোগ তুলেছেন।
রোববার ঢাকার পল্লবী থানায় আলভী ও তাঁর মা নাসরিন সুলতানা শিউলির বিরুদ্ধে মামলা করেন ইকরার বাবা কবির হায়াত খান। মামলায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অবহেলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ময়মনসিংহের ভালুকায় রোববার বাদ আসর ইকরার দাফন সম্পন্ন হয়। সেখানে আলভীর অনুপস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা তীব্র হয়। সোমবারের ভিডিও বার্তায় সেই সমালোচনার জবাব দেন অভিনেতা।