জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘বালিকা বধূ’র সেই ‘আনন্দী’কে নিশ্চয়ই মনে আছে? এই চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি পরিচিতি পেয়েছিলেন বাঙালি অভিনেত্রী প্রত্যুষা বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু আলোড়ন তুলেছিল ভারতের বিনোদন অঙ্গনে। সেই ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর গুরুত্বপূর্ণ রায় দিলেন মুম্বাই হাইকোর্ট।
প্রত্যুষাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলা থেকে তাঁর প্রেমিক, অভিনেতা ও প্রযোজক রাহুল রাজ সিংকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। গত বুধবার দেওয়া এই রায়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলার গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
২০১৬ সালের ১ এপ্রিল মুম্বাইয়ের গোরেগাঁও পশ্চিমের ভাড়া বাসা থেকে প্রত্যুষার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখা হয়। এরপর তাঁর প্রেমিক রাহুল রাজ সিংয়ের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যুষার মা–বাবার অভিযোগ ছিল, রাহুল তাঁদের মেয়েকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। সেই নির্যাতনের কারণেই প্রত্যুষা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তাঁরা। পরে রাহুলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
তবে মামলার নথি ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনা করে মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারপতি এস জি ডিজে বলেন, রাহুলের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আদালতে রাহুলের আইনজীবীরা জানান, প্রত্যুষার কোনো সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। মামলার এফআইআরও তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তাঁরা। মামলার বিভিন্ন তথ্য ও যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত রাহুলকে অব্যাহতি দেন আদালত।
প্রত্যুষা ও রাহুলের শেষ দিকের কথোপকথনের বিষয়টিও আদালতের পর্যবেক্ষণে এসেছে। আদালত বলেছেন, সেই কথোপকথন থেকে এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে রাহুল প্রত্যুষাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। বরং কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রত্যুষাকে এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন রাহুল—আদালতের পর্যবেক্ষণে এমনটাই উঠে এসেছে।
প্রত্যুষা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জামশেদপুরে। ২০১০ সালে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘বালিকা বধূ’তে আনন্দীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এই একটি চরিত্রই তাঁকে ভারতজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়।
এরপর ‘বিগ বস ৭’, ‘ঝলক দিখলা জা’, ‘হাম হ্যায় না’সহ একাধিক টেলিভিশন ধারাবাহিক ও রিয়েলিটি শোতে দেখা গেছে তাঁকে। অল্প সময়ের মধ্যেই হিন্দি টেলিভিশনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন প্রত্যুষা।
প্রত্যুষার আকস্মিক মৃত্যু সে সময় ভারতের বিনোদন অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বদলে যায় জামশেদপুরে থাকা তাঁর মা–বাবার জীবনও। প্রত্যুষার বাবা শংকর বন্দ্যোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মেয়ের মৃত্যুর পর তাঁদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে।
শুরু থেকেই প্রত্যুষার মৃত্যুর জন্য রাহুলকে দায়ী করে আসছিলেন তাঁর মা–বাবা। দীর্ঘদিন মামলা চালাতে গিয়ে তাঁদের সঞ্চয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। এমনকি আইনি লড়াইয়ের খরচ মেটাতে ধারও করতে হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তাঁরা।
মেয়ের মৃত্যুর প্রায় এক দশক পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি শংকর ও সোমা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমা একটি চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে কাজ করেন। শংকর কিছু লেখালেখি করে আয় করেন।
প্রায় ১০ বছর ধরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার পর মুম্বাই হাইকোর্টের এই রায়ে রাহুল রাজ সিংয়ের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।