‘অপমানকর প্রশ্ন করা শেষে তাঁরা আমাকে তাঁদের সামনে থেকে চলে যেতে বলতেন’

নস্টালজিক অভিনেতা ফারুক আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত
নস্টালজিক অভিনেতা ফারুক আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

শুটিংয়ে বিভিন্ন রকম গল্পে অভিনয় করতে হয়। এই গল্পগুলো কখনো আবেগাক্রান্ত, কখনো নস্টালজিক করে দেয় অভিনেতা ফারুক আহমেদকে। সম্প্রতি ‘বাসা ভাড়া হবে Too-Late’ ধারাবাহিক নাটকের একটি দৃশ্য তাঁকে অতীতে নিয়ে যায়। দৃশ্যটি এই অভিনেতাকে তাঁর শৈশব, কৈশোরের কথা মনে করিয়ে দিল। সেই ছোট্ট বয়সটা নানা ভয়, লজ্জা আর অপমানে কেটেছে কিশোর ফারুকের। ছোট বয়সেই তাঁকে পরিচিতজনদের কাছে অপমানকর প্রশ্ন শুনতে হতো।

অভিনেতা ফারুক আহমেদ

এই অভিনেতা জানান, জীবনের গল্পগুলোই দর্শক দেখেন। সেখানে নিজের কোনো ব্যক্তিজীবনের ঘটনা গল্পের সঙ্গে মিলে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনাগুলোই তাঁকে বারবার স্মৃতিকাতর করে। রাতে ঘুমাতে দেয় না। মাকে হারানোর পর দিনগুলো তাঁকে আরও বেশি একা করে দিয়েছে। এই অভিনেতা বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি ছিলাম খুব লাজুক প্রকৃতির। নিজের খালা বা পরিচিতজনেরা যখন আমাদের বাসায় বেড়াতে আসত, তখন আমি দৌড়ে দরজার আড়ালে অথবা খাটের নিচে গিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। তাঁরা আমার মাকে জিজ্ঞাসা করতেন, ফারুক কই? মা তখন উত্তর দিতেন, কোথায় আবার? দেখ কোন দরজার চিপাচাপায়, নয়তো খাটের তলায় লুকিয়ে আছে। আমার খালাতো ভাইয়েরা সঙ্গে সঙ্গে অভিযানে নেমে পড়ত। এঘর–ওঘর খুঁজতে খুঁজতে একসময় আমাকে কোনো এক দরজার চিপা বা খাটের তলা থেকে বের করে নিয়ে আসত।’

নাটকটির একটি দৃশ্যে ফারুক আহমেদ ও অন্যরা

বেশির ভাগ সময় তিনি সবার সামনে আসতে চাইতেন না। কিন্তু তাঁকে জোর করে ধরে আনা হতো। এরপরে এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতেন, যা তাঁকে মানসিকভাবে আরও ছোট করে দিত। ফারুক আহমেদ সেই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি তখন মাথা হেঁট করে খালাদের সামনে এসে দাঁড়াতাম, আমাকে দেখে মনে হতো বিরাট এক অপরাধী। কী এক অজানা লজ্জায় তখন আমার অনেক খারাপ লাগত। পরিচিতরা আমাকে দেখামাত্র নানা রকম বিব্রতকর প্রশ্ন করা শুরু করত। কেউ বলতেন, “কিরে তোর এই অবস্থা কেন? তুই তো আগের চেয়ে আরও বেশি কালো হয়ে গেছিস। খাওয়াদাওয়া করিস না?” কেউ বলতেন, “তোকে তো খবিশের মতো লাগছে।” আরও নানা কিছু শুনতে হতো। আমি কোনো কথা বলতাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতাম।’

অভিনেতা ফারুক আহমেদ

এ অভিনেতার সঙ্গে কথা হয় আজ সকালে। তিনি আরও বললেন, ‘একটি সন্তানের শৈশবটা আনন্দদায়ক হওয়া উচিত। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। পরিচিতজনদের সামনে দাঁড়িয়ে আমি অপমানজনক কথাগুলো শুনতাম। অপমানকর প্রশ্ন করা শেষ হলে তাঁরা একসময় আমাকে তাঁদের সামনে থেকে চলে যেতে বলতেন। আমি ধীরে ধীরে তাঁদের সামনে থেকে চলে যেতাম। সমবয়সী ভাইয়েরা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলত, “থাক কিছু হবে না, বড়রা তোর ভালোর জন্যই বলে।” এভাবেই নানান ভয়, লজ্জা আর অপমানে আমার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। এই পুরো সময়ে মা আমাকে আগলে রেখেছেন, কোনো কষ্ট বুঝতে দেননি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে অতীতের ঘটনাগুলোই বেশি মনে পড়ে। মনে হয়, এগুলো না ঘটলে শৈশবটা হয়তো অন্য রকম হতে পারত।

শেষে জানালেন, জীবনে কখনো ভাবেননি অভিনেতা হবেন। বললেন, ‘লজ্জা, ভয় কাটিয়ে কখন যে সাহসী হয় উঠলাম নিজেরও মনে নেই। কেন আমার ভেতর অভিনয়ের নেশা চাপল, তা–ও বলতে পারব না। আমি জানি না আমার পথের শেষ কোথায়? শুধু এইটুকু জানি, আমি এখন অভিনেতা। আমাকে মানুষ অভিনেতা হিসেবেই জানে। অভিনেতা হয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।’