২০১২ সালের ৭ মার্চ ঢাকায় ওয়েস্টিন হোটেলে এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে প্রথম আলোকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন কণ্ঠশিল্পী আশা ভোসলে
২০১২ সালের ৭ মার্চ ঢাকায় ওয়েস্টিন হোটেলে এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে প্রথম আলোকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন কণ্ঠশিল্পী আশা ভোসলে

সংগীতের স্বর্ণযুগের শেষ নক্ষত্রের অবসান

ভারতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোসলের প্রয়াণ ঘটল গতকাল রোববার দুপুরে। শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ অসুস্থ বোধ করায় তাঁকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। আশা ভোসলের বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

বয়সের কারণে আশা ভোসলে যে ভুগছিলেন এমন নয়; বরং এই বয়সেও তিনি হেঁটেচলে বেড়াতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতেন। গানও গাইতেন। শনিবার সন্ধ্যায় শারীরিক অস্বস্তি বোধ করার কথা সর্বক্ষণের গৃহকর্মীকে জানান। তখনই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রের খবর, সন্ধ্যায়ই তিনি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালের চিকিৎসক প্রতীত সমদানি জানান, বর্ষীয়ান শিল্পীর একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে গিয়েছিল।

হাসপাতালে ভর্তির পর আশার নাতনি জনাই ভোসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ওঁর ফুসফুসেও সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। গতকাল দুপুরে আশার পুত্র আনন্দ ভোসলে গণমাধ্যমকে মায়ের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে বলেন, সোমবার বিকেল চারটায় শিবাজি পার্কে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। এর আগে বেলা ১১টা থেকে মুম্বাইয়ের লোয়ার পারেলের কাসা গ্র্যান্ডের বাসভবনে গিয়ে সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।

আশার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় সংগীতের স্বর্ণযুগের শেষ নক্ষত্রের অবসান ঘটল।

আশা ভোসলের বড় বোন লতা মঙ্গেশকরও চার বছর আগে ২০২২ সালে এই হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। লতা ভূষিত হয়েছিলেন ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে, আশা পেয়েছেন ‘পদ্মবিভূষণ’ ও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। আশার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় সংগীতের স্বর্ণযুগের শেষ নক্ষত্রের অবসান ঘটল।

আশা ভোসলে ও লতা মঙ্গেশকর

আশার জন্ম ১৯৩৩ সালে তৎকালীন বম্বে প্রেসিডেন্সির সাংলি রাজ্যে (পরে মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত)। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মারাঠি মঞ্চাভিনেতা ও শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। আশা পিতৃহীন হন ৯ বছর বয়সে। বড় বোন লতার বয়স তখন ১৩। মঙ্গেশকর পরিবার তখন মুম্বাই চলে আসে এবং তখন থেকেই দুই বোনের চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে মারাঠি সিনেমা মাঝা বল-এ আশার প্রথম প্লেব্যাক। হিন্দি সিনেমায় প্রথম গান ‘সাওন আয়া’ তার পাঁচ বছর পর, ১৯৪৮ সালে, চুনরিয়া সিনেমায়। সেই থেকে আমৃত্যু লতা-আশা ও সংগীত সমার্থক হয়ে থেকেছে।

বড় বোন লতার মতো আশার সংগীতজীবনের সফর মোটেই কুসুমকোমল ছিল না। হিন্দি সিনেমার নারী প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তখন দ্যুতি ছড়াচ্ছেন সামশাদ বেগম, গীতা দত্ত এবং লতা। বড় বাজেটের সিনেমা তাঁদেরই দখলে। আশা ডাক পেতেন তখন কম বাজেটের সিনেমায় কিংবা কাঙ্ক্ষিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে। ও পি নাইয়ারের জহুরি চোখ কিন্তু আশাকে চিনতে ভুল করেনি। ১৯৫২ সালে ও পি নাইয়ারের সুরে সঙ্গদিল সিনেমায় ‘ছম ছমাছম’ গানটি আশার সংগীতজীবনের এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। পরের বছর বিমল রায়ের পরিণীতা ও ’৫৪ সালে রাজ কাপুরের বুট পালিশ আশাকে প্রথম সারিতে জায়গা পাইয়ে দেয়। সামশাদ বেগম, গীতা

বড় বোন লতার মতো আশার সংগীতজীবনের সফর মোটেই কুসুমকোমল ছিল না। হিন্দি সিনেমার নারী প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তখন দ্যুতি ছড়াচ্ছেন সামশাদ বেগম, গীতা দত্ত এবং লতা। বড় বাজেটের সিনেমা তাঁদেরই দখলে।
আশা ভোসলে

দত্ত ও লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গেই উচ্চারিত হতে থাকে আশা ভোসলের নাম। তার আগে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ির অমতে ও অসম্মতিতে তিনি বিয়ে করে ফেলেন গণপতরাও ভোসলেকে। গণপত তখন ছিলেন লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তিগত সচিব।

বিয়েটা বেশি দিন টেকেনি। সুখকরও ছিল না মোটেই। অবহেলিত ও নির্যাতিত আশা একটা সময় পুত্র-কন্যাকে নিয়ে গণপতরাওয়ের সংসার ছেড়ে মায়ের কাছে চলে আসেন। সাংসারিক জীবনের শান্তিহীনতা পুষিয়ে দেয় সংগীতজীবনের ক্রমাগত উত্থান। ও পি নাইয়ারের সুর ও আশার কণ্ঠ সৃষ্টি করতে থাকে একের পর এক অনন্য মূর্ছনা। সে এক অদ্ভুত রসায়ন। নাইয়ার তাঁর অধিকাংশ গানে ব্যবহার করতেন এমন এক ছন্দ, যা ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দ মনে করিয়ে দিত। সেই সুরে আশার কণ্ঠ সৃষ্টি করে এক অশ্রুত মদিরতা ও মোহময় আবেশ। সুরকার খৈয়াম, রবিও বাড়িয়ে দেন তাঁদের হাত। সৃষ্টি হতে থাকে একের পর এক জনপ্রিয় গান, যা চিরকালীন হয়ে গেছে।

অবশেষে ষাটের দশকের মাঝামাঝি ঘটে যায় সেই অপূর্ব সংযোগ। শচীন দেববর্মনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যোগাযোগ ঘটে রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে। তাঁদের প্রেম ও দাম্পত্য জীবন খুলে দেয় সংগীতজগতের আরেক নতুন দরজা। শুরু হয় হিন্দি গানের সুরের এক নব অধ্যায়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে রাহুল দেববর্মন একের পর এক যে অমূল্য সম্পদ সৃষ্টি করতে থাকেন, তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন আশা। অবসাদে দীর্ণ গীতা দত্তর নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া ও সত্তরের দশকে তাঁর অকালমৃত্যু নারী প্লেব্যাকের ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল, আশা তা ঝড়ের বেগে পূর্ণ করে দিলেন।

শচীন দেববর্মনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যোগাযোগ ঘটে রাহুল দেববর্মনের সঙ্গে। তাঁদের প্রেম ও দাম্পত্য জীবন খুলে দেয় সংগীতজগতের আরেক নতুন দরজা। শুরু হয় হিন্দি গানের সুরের এক নব অধ্যায়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে রাহুল দেববর্মন একের পর এক যে অমূল্য সম্পদ সৃষ্টি করতে থাকেন, তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন আশা।
আশা ভোসলে

বয়স যত বেড়েছে, আশাও নিজেকে তত গড়েছেন নতুন করে। উপস্থাপন করেছেন নিজেকে আধুনিকতার সঙ্গে মানানসই হিসেবে। পশ্চিমি সাউন্ডস্কেপ ক্রমে অর্কেস্ট্রার যুগের অবসান ঘটাতে থাকে। দাক্ষিণাত্য থেকে মাথা তুলে বিশ্বজয়ে এগিয়ে এলেন আল্লারাখা রহমান। তাঁর সুরে আশা যোগ করলেন অন্য এক মাদকতা। ষাট পেরোনো কণ্ঠকে রঙ্গিলা সিনেমায় যেভাবে তিনি ভেঙেচুরে গড়লেন, যে উচ্চতায় নিজেকে স্থাপন করলেন, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর মতো অমন ঝুঁকি বড় বোন লতাও কখনো নেননি। অত পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেও নিজেকে টেনে আনেননি।

সংগীতজীবনের ৮৩ বছরে মোট ১৮টি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন আশা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, গান না গাইলে, গায়িকা না হলে জীবনে কী করতেন জানেন না। যদিও নিজেই সেই জিজ্ঞাসার নিরসন ঘটিয়ে বলেছিলেন, ‘হয়তো শেফ, মানে রাঁধুনি হতাম।’ রান্না করতে চিরকালই বড় ভালোবাসতেন তিনি। সেই ভালোবাসা জন্ম দিয়েছে ‘আশা’স নামে তাঁর রেস্তোরাঁর চেইন। দুবাই, কুয়েত, আবুধাবি, দোহা, বাহরাইন, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহামে রয়েছে ‘আশা’স–এর শাখা।