সেরা ১০ সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ
সেরা ১০ সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ

দর্শকের ভোটে সর্বকালের সেরা ১০ সিনেমা কোনগুলো

সম্প্রতি সর্বকালের সেরা ৫০০ সিনেমার তালিকা প্রকাশ করেছে লেটারবক্সড। এটি অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কিং সেবা, যা ২০১১ সালে চালু হয়। এখানে দর্শকেরা সিনেমা দেখে নিজেদের মতো করে রেটিং দিতে পারেন। লেটারবক্সডের এই তালিকায় জায়গা পেয়েছে বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষার সিনেমা। জেনে নেওয়া যাক এই তালিকার শীর্ষ ১০ সিনেমার খবর। লিখেছেন লতিফুল হক

‘সিটি অব গড’

‘সিটি অব গড’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ব্রাজিলের এই চলচ্চিত্র শুধু একটি গ্যাংস্টার গল্প নয়—এটি শহরের প্রান্তিক জীবনের নির্মম, তীব্র ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার দলিল। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর ‘সিটি অব গড’ নামের বস্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমা দেখায় কীভাবে দারিদ্র্য, সহিংসতা ও অপরাধ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। সিনেমার কাহিনি বলা হয়েছে রকেট নামের এক কিশোরের চোখ দিয়ে। সে বড় হতে থাকে এমন এক এলাকায়, যেখানে অস্ত্র ধরাটা প্রায় বাধ্যতামূলক, আর বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ। রকেট নিজে অপরাধজগতের অংশ হতে চায় না; তার স্বপ্ন—ফটোগ্রাফার হওয়া। কিন্তু চারপাশের বাস্তবতা তাকে বারবার টেনে নেয় সহিংসতার কেন্দ্রে।

একই সঙ্গে আমরা দেখি লিল জে (লিল জেজে/জে-জে) নামের আরেক চরিত্রের উত্থান। শিশুবয়সে ছোটখাটো অপরাধ দিয়ে শুরু করে সে ধীরে ধীরে ভয়ংকর মাদক সম্রাটে পরিণত হয়। তার ক্ষমতার বিস্তার, নির্মমতা ও ভয় তৈরি করার কৌশল বস্তির নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বদলে দেয়। বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিশোধ—সব মিলিয়ে গল্প এগোয় দ্রুত, প্রায় শ্বাসরুদ্ধকর গতিতে। ফারনান্দো মেইরেলেস পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন আলেকজান্ডার রদ্রিগেস, লিয়েন্দ্রো ফিরমিনো জোনাথন হ্যাগেনসেন। চলচ্চিত্রটি এ পর্যন্ত বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে। সেরা চিত্রনাট্য, সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরা সম্পাদনা, সেরা পরিচালক—এ চার ক্যাটাগরিতে ২০০৪ সালে একাডেমি পুরস্কার মনোনয়ন পায়।

‘দ্য হিউম্যান কনডিশন ১: নো গ্রেটার লাভ’

‘দ্য হিউম্যান কনডিশন ১: নো গ্রেটার লাভ’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

তালিকার দুইয়ে রয়েছে এই জাপানি সিনেমাটি। ১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটি মানবিকতা, যুদ্ধ ও নৈতিক সংকটের এক গভীর দলিল। এটি আসলে ট্রিলজির প্রথম কিস্তি, যা সম্মিলিতভাবে পরিচিত ‘দ্য হিউম্যান কনডিশন’ নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমা যুদ্ধের গৌরব নয়, বরং তার নিষ্ঠুরতা ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র কাজি—এক আদর্শবাদী তরুণ জাপানি, যিনি বিশ্বাস করেন মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখতে হবে, রাষ্ট্রের যন্ত্র হিসেবে নয়। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি মানচুরিয়ায় একটি খনিতে শ্রম ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। সেখানে চীনা যুদ্ধবন্দীদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়—অমানবিক শর্তে। কাজি চেষ্টা করেন বন্দীদের সঙ্গে মানবিকভাবে আচরণ করতে, তাদের ন্যায্য অধিকার দিতে। কিন্তু সামরিক প্রশাসন ও কঠোর জাতীয়তাবাদী কাঠামোর ভেতরে তাঁর এই অবস্থান তাঁকে ক্রমাগত বিপদে ফেলে। আদর্শ আর বাস্তবতার সংঘাতে তিনি একা হয়ে পড়েন। এই প্রথম পর্ব মূলত দেখায়—একজন সৎ মানুষ কতটা চাপের মুখে পড়ে যখন চারপাশের সমাজ অন্যায়কে নিয়ম হিসেবে মেনে নেয়। ছবিটি প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা দীর্ঘ। কিন্তু এর গতি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর—যাতে দর্শক প্রতিটি নৈতিক সংকট, প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওজন অনুভব করতে পারেন। কোবায়াশির ক্যামেরা বিশাল প্রাকৃতিক দৃশ্য, কারাগারের সংকীর্ণতা ও মানুষের মুখের ক্লোজআপ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে একধরনের অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতা তৈরি করে। যুদ্ধ এখানে পটভূমি; আসল যুদ্ধটি মানুষের ভেতরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানি সমাজ আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই চলচ্চিত্র সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম—যেখানে যুদ্ধের নৃশংসতা ও সামরিক মানসিকতার সমালোচনা করা হয়েছে স্পষ্টভাবে। মাসাকি কোবায়াশি পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন তাতসুয়া নাকাদাই, মিচিও আরতামা।

‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’

‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ ছবির পোস্টার। আইএমডিবি

১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্র আজ বিশ্বসিনেমার ইতিহাসে অন্যতম প্রেরণাদায়ক ছবি হিসেবে বিবেচিত। মুক্তির সময় খুব বড় বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের ভালোবাসায় এটি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পায়। ফ্র্যাংক ড্যারাবন্ট পরিচালিত সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে স্টিফেন কিংয়ের নভেলার ওপর ভিত্তি করে। এতে অভিনয় করেন টিম রবিন্স, মরগান ফ্রিম্যান, বব গান্টন, উইলিয়াম সেডলার। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যান্ডি ডুফ্রেন—এক সফল ব্যাংকার, যাঁকে স্ত্রী ও তাঁর প্রেমিককে হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁকে পাঠানো হয় শশাঙ্ক কারাগারে। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় দীর্ঘদিনের বন্দী রেডের সঙ্গে। দুজনের বন্ধুত্বই এই ছবির প্রাণ। কারাগারের কঠোর নিয়ম, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, বন্দীদের নিরাশা—সবকিছুর মধ্যেও অ্যান্ডি আশা ছাড়েন না। তিনি লাইব্রেরি গড়ে তোলেন, সহবন্দীদের শিক্ষায় সাহায্য করেন, এমনকি কারা কর্তৃপক্ষের অর্থনৈতিক কৌশলেও ভূমিকা রাখেন। কিন্তু গল্পের ভেতরে জমে থাকে এক গোপন পরিকল্পনা, যা ছবির শেষাংশে দর্শককে বিস্মিত করে। কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে থেকেও মানুষের মন ও স্বপ্নকে বন্দী করা যায় না—এই দর্শনই ছবির কেন্দ্রবিন্দু। এটি শুধু পালানোর গল্প নয়; বরং মানসিক মুক্তির গল্প।

‘দ্য গডফাদার পার্ট ২’

‘দ্য গডফাদার পার্ট ২’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ‘গডফাদার’ ট্রিলজির দ্বিতীয় কিস্তি। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্র শুধু একটি সিক্যুয়েল নয়—বরং বিশ্বসিনেমার ইতিহাসে বিরল উদাহরণ, যেখানে দ্বিতীয় পর্ব প্রথমটির সমান, এমনকি অনেকের মতে আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই ছবির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—এটি দুই সময়রেখায় এগোয়। একদিকে আমরা দেখি তরুণ ভিটো করলিওনের উত্থান। ইতালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে দারিদ্র্য আর অপমানের মধ্য দিয়ে কীভাবে তিনি ধীরে ধীরে অপরাধজগতের ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তরুণ ভিটোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবার্ট ডি নিরো। অন্যদিকে রয়েছে মাইকেল করলিওনের কাহিনি—যিনি এখন পরিবারের প্রধান। তাঁর চরিত্রে আবারও অনবদ্য অভিনয় করেছেন আল পাচিনো। মাইকেল ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে ক্রমশ একাকী ও নির্মম হয়ে ওঠেন। পরিবার রক্ষার নামে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নেন, যা তাঁকে মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই দুই প্রজন্মের গল্প পাশাপাশি চলতে চলতে এক গভীর ট্র্যাজেডির রূপ নেয়। সিনেমাটি ক্ষমতার মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ক্ষমতা কি পরিবারকে রক্ষা করে, নাকি ভেঙে দেয়? ভিটোর গল্পে আমরা দেখি প্রয়োজন ও বেঁচে থাকার তাগিদে ক্ষমতার উত্থান। কিন্তু মাইকেলের গল্পে সেই ক্ষমতাই হয়ে ওঠে সন্দেহ, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক শূন্যতার কারণ। পরিবারের ভেতর বিশ্বাসঘাতকতা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন—সব মিলিয়ে এটি এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি।

‘হাই অ্যান্ড লো’

‘হাই অ্যান্ড লো’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া জাপানি চলচ্চিত্রটি থ্রিলারের মোড়কে নির্মিত এক গভীর সামাজিক বার্তাবাহী ড্রামা সিনেমা। এটি পরিচালনায় ছিলেন আকিরা কুরোসাওয়া। এড ম্যাকবেইনের উপন্যাস ‘কিংস র‍্যানসাম’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি কুরোসাওয়ার সৃজনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ—যেখানে একটি অপহরণের ঘটনা হয়ে ওঠে শ্রেণি-বিভাজন ও নৈতিক সংকটের প্রতীক। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিংগো গন্ডো—এক জুতা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি কোম্পানির শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনায় বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করেন। ঠিক তখনই খবর আসে—তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে এবং মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু শিগগিরই জানা যায়, অপহরণকারী ভুল করে তার ছেলের বদলে তার চালকের সন্তানকে ধরে ফেলেছে। এখন প্রশ্ন—গন্ডো কি নিজের ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে একজন কর্মচারীর সন্তানের জীবন বাঁচাবেন? এই দ্বন্দ্বই ছবির প্রথম অংশকে তীব্র নাটকীয়তায় ভরিয়ে তোলে। ‘হাই অ্যান্ড লো’ নামটিই ছবির মূল প্রতীক—উঁচু আর নিচু। গন্ডোর পাহাড়ের ওপরের বিলাসবহুল বাড়ি থেকে নিচের শহরের বস্তি পর্যন্ত—কুরোসাওয়া ভিজ্যুয়াল কম্পোজিশনের মাধ্যমে শ্রেণিবিভাজনকে স্পষ্ট করে তুলেছেন। ছবির প্রথমার্ধ প্রায় পুরোটা একটি ঘরের ভেতর—ক্যামেরার নিখুঁত মুভমেন্ট ও চরিত্রের অবস্থান দিয়ে তৈরি হয় চাপা উত্তেজনা। দ্বিতীয়ার্ধে গল্প চলে যায় পুলিশি তদন্তে, যেখানে শহরের নিচু স্তরের জীবন, মাদকাসক্ত ও হতাশা সামনে আসে। এতে অভিনয় করেছেন তোশিরো মিফুনে, তাতসুয়া নাকাদাই, কিয়োকো কাগাওয়া ও তাতসুয়া মিহাশি।

‘সেভেন সামুরাই’

‘সেভেন সামুরাই’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

তালিকার পাঁচে রয়েছে আকিরা কুরোসাওয়ার আরেকটি সিনেমা—‘সেভেন সামুরাই’। ১৬শ শতকের জাপান। ডাকাতদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এক দরিদ্র কৃষকগ্রাম সিদ্ধান্ত নেয়—তারা সামুরাই ভাড়া করবে নিজেদের রক্ষা করতে। কিন্তু তাদের হাতে অর্থ নেই, আছে শুধু খাবার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। এই কঠিন বাস্তবতায় এক অভিজ্ঞ সামুরাই কাম্বেই (তাকাশি শিমুরা) নেতৃত্ব দেন। তিনি একে একে আরও ছয়জন সামুরাইকে দলে নেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও আবেগী চরিত্র কিকুচিয়ো—যার ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন তোহিরো মিফুনে। গ্রামবাসী ও সামুরাইদের মধ্যে প্রথমে দূরত্ব থাকলেও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বিশ্বাস। চূড়ান্ত লড়াইয়ে তারা একসঙ্গে ডাকাতদের মোকাবিলা করে। কিন্তু এই বিজয়ের চড়া মূল্য দিতে হয়—এমন গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি যুগ যুগ ধরে দুনিয়ার নানা প্রান্তের নির্মাতাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। কুরোসাওয়া এই ছবিতে যে ভিজ্যুয়াল ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা আজও অনুকরণীয়। বৃষ্টির মধ্যে যুদ্ধদৃশ্য, একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার, দ্রুত সম্পাদনা—সব মিলিয়ে যুদ্ধকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। চরিত্রের গভীরতা এই ছবির বড় শক্তি। সাতজন সামুরাই প্রত্যেকে আলাদা ব্যক্তিত্বের অধিকারী—তাদের ভয়, হাসি, আত্মসম্মান ও মানবিক দুর্বলতা গল্পকে বহুমাত্রিক করেছে। ‘সেভেন সামুরাই’ কেবল অ্যাকশন চলচ্চিত্র নয়। এটি দেখায়—একজন প্রকৃত নেতা কেমন হন। একই সঙ্গে ছবিটি শ্রেণিভেদের প্রশ্নও তোলে। সামুরাই ও কৃষকদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব থাকলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে মানবিক সম্পর্কই।

‘কাম অ্যান্ড সি’

‘কাম অ্যান্ড সি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই সোভিয়েত চলচ্চিত্র বিশ্বসিনেমায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা হিসেবে বিবেচিত। পরিচালনায় ছিলেন এলেম ক্লিমভ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর দখলে থাকা বেলারুশের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্র যুদ্ধের ভয়াবহতাকে এমন নির্মম বাস্তবতায় তুলে ধরে, যা দর্শককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফ্লোরিয়া—এক সরল গ্রাম্য কিশোর। সে স্বপ্ন দেখে যুদ্ধ করে বীর হবে। কিন্তু পার্টিজান বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তার সামনে খুলে যায় যুদ্ধের ভয়ংকর রূপ। গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, নিরীহ মানুষ হত্যা, নির্বিচার বর্বরতা—সবকিছুর সাক্ষী হতে হতে ফ্লোরিয়ার মুখের নিষ্পাপ হাসি হারিয়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই তার চেহারায় ভেসে ওঠে বহু বছরের ক্লান্তি ও আতঙ্ক। এই ছবির শক্তি এখানেই—যুদ্ধকে কোনো রোমান্টিক বা বীরত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে নয়, বরং নিছক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। এলেম ক্লিমভ ছবিটিতে ব্যবহার করেছেন ক্লোজআপ, দীর্ঘ শট ও শব্দের ভিন্নধর্মী ব্যবহার। অনেক দৃশ্যে সংলাপ কম, কিন্তু পরিবেশের শব্দ—বিস্ফোরণ, কান্না, নীরবতা—মনে গেঁথে যায়। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনেতা অ্যালেক্সেই কারাভচেঙ্কো। ‘কাম অ্যান্ড সি’ মূলত যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র। এটি প্রশ্ন তোলে—যুদ্ধ কাকে জয়ী করে? এখানে বিজয়ের কোনো উদ্‌যাপন নেই; আছে শুধু ধ্বংস ও শোক।

‘১২ অ্যাংরি মেন’

‘১২ অ্যাংরি মেন’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রটি শুধু একটি কোর্ট রুম ড্রামা নয়, বরং মানুষের পক্ষপাত, যুক্তি ও ন্যায়ের সন্ধান নিয়ে এক তীব্র আবেগময় চলচ্চিত্র। পরিচালনায় ছিলেন সিডনি লুমেট। চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়েছে ১২ জন জুরি এক অপরাধ মামলার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এ পর্যন্ত দুনিয়ার নানা প্রান্তে সিনেমাটির রিমেক হয়েছে, প্রেরণায় নির্মিত হয়েছে সিনেমা। সিডনি লুমেট ছবিটিতে হ্যান্ডহেল্ড শট, ক্লোজআপ ব্যবহার করে চাপ, উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তুলেছেন। ছবিটির এগিয়েছে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও যুক্তি-সংলাপে—এটি সিনেমার শক্তি ও অনন্যতা। ‘১২ অ্যাংরি মেন’ মূলত মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারব্যবস্থা, পক্ষপাত, আগ্রহ ও ধৈর্যের পরীক্ষা দেখায়। ছবিটি মুক্তির পর এটির ব্যবসায়িক সাফল্য সীমিত হলেও সমালোচকরা প্রশংসা করেছেন। আজ এটি বিশ্বসিনেমার অন্যতম সেরা নাট্যচলচ্চিত্র। একাধিক সমালোচক ও দর্শকের ভোটে এটি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সিনেমা তালিকায় শীর্ষে থাকে।

‘দ্য হিউম্যান কনডিশন ৩: আ সোলজারস প্লেয়ার’

‘দ্য হিউম্যান কনডিশন ৩: আ সোলজারস প্লেয়ার’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

মাসাকি কোবায়াশি পরিচালিত ‘দ্য হিউম্যান কনডিশন’ ট্রিলজির তৃতীয় কিস্তিটি রয়েছে তালিকার দুইয়ে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ও মানুষের নৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এই অংশে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কাজি—যিনি একজন আদর্শবাদী মানুষ—সৈনিক হিসেবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। কাজির চরিত্রে দেখা যায়, একজন মানুষ কীভাবে যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা ও স্বার্থপরতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের মানবিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কাজি কতদূর পর্যন্ত নিজের আদর্শকে বজায় রাখতে পারবেন, এবং তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি কতটা টিকে থাকবে—এটি ছবির মূল প্রশ্ন। এই সিনেমা মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ কেবল বাহ্যিক সংঘর্ষ নয়, বরং এটি একজন মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও নৈতিকতার পরীক্ষা। এতে অভিনয় করেছেন তাতসুয়া নাকাদাই, কিন সুগাই।

‘হারাকিরি’

‘হারাকিরি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

লেটারবক্সডের তালিকার শীর্ষে রয়েছে জাপানি চলচ্চিত্রটি। ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্র সামুরাই সমাজ ও নৈতিকতার ওপর নির্মিত এক সমালোচনামূলক কাহিনি। এটি পরিচালনায় ছিলেন মাসাকি কোবায়েশি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র হানশিরো। তিনি একটি ধনী সামন্ত পরিবারের দরবারে হাজির হন, নিজে হারাকিরি (আত্মহত্যা) করতে চাচ্ছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু আসলে তার আসল উদ্দেশ্য হলো সমাজের ভণ্ডামি ও অন্যায়কে প্রকাশ করা ও প্রতিশোধ নেওয়া। হানশিরো কৌশলে সবার সামনে সামাজিক কাঠামোর পেছনের নিষ্ঠুরতা ও ন্যায়হীনতা তুলে ধরেন। হানশিরোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাতসুয়া নাকাদাই। ‘হারাকিরি’ প্রশ্ন তোলে—মানবিক মূল্যবোধ কি সমাজের শক্তি ও বিধি-পদ্ধতির তুলনায় ছোট? একজন আদর্শবাদী মানুষ কি শেষ পর্যন্ত সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে? ছবিটি সামুরাইসংক্রান্ত ক্লাসিক ধ্যান-ধারণা যেমন ‘গৌরব’, ‘শ্রদ্ধা’, ‘আত্মত্যাগ’—সবকিছুর পুনর্মূল্যায়ন করে।