কামরুজ্জামান বালার্ক। ছবি: সংগৃহীত
কামরুজ্জামান বালার্ক। ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘ওএএম’ পেলেন বাংলাদেশের কামরুজ্জামান বালার্ক

অস্ট্রেলিয়ার জনজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি ‘অস্ট্রেলিয়া ডে’—দেশটির জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ঘোষণা করা হয়। এ বছর শিল্পকলা এবং মেলবোর্নের বাঙালি সম্প্রদায়ের সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’র সাধারণ বিভাগে ‘মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ (ওএএম) পদকে ভূষিত হয়েছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বালার্ক। গভর্নর জেনারেলের পক্ষ থেকে ঘোষিত ২০২৬ সালের এই সম্মাননা তালিকায় স্থান পাওয়া ৯৪৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মধ্যে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সিডনি, মেলবোর্নসহ পুরো অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী বাঙালি সমাজে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মেলবোর্নের প্যাকেনহ্যামের বাসিন্দা কামরুজ্জামান বালার্ক তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রবাসে বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতির প্রসারে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগেই ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মেলবোর্নের অন্যতম নিয়মিত নাট্য সংগঠন ‘রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি মেলবোর্ন’। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি টানা দুই দশক সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির শৈল্পিক নির্দেশক।

কামরুজ্জামানের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ ১৬টি নাটকের মধ্যে ‘কঞ্জুস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘এলেকশান ক্যারিকেচার’, ‘শকুন্তলা’, ‘মাউসট্র্যাপ’ ও ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’—সিডনি ও মেলবোর্নের মঞ্চে দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নাট্যকলার পাশাপাশি সাহিত্যের অঙ্গনেও কামরুজ্জামানের বিচরণ উল্লেখযোগ্য।

কামরুজ্জামান বালার্ক। ছবি: সংগৃহীত

তিনি মেলবোর্নের ‘বাংলা সাহিত্য সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘শেকড়’-এর সম্পাদক হিসেবে টানা সাত বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালে তাঁর উদ্যোগে রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অচলায়তন’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে, যা প্রবাসী বাঙালি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত প্রামাণ্যচিত্র ‘তৃতীয় ভুবন’-এ অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের অভিনয়–দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে কামরুজ্জামান বালার্ক একজন প্রকৌশলী। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সন্তান তিনি। বর্তমানে টিপিজি টেলিকমে ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও শিল্পচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি নিজের প্রশান্তির জন্যই সৃজনশীল কাজগুলো করি। যদি আমার কাজের মাধ্যমে কেউ আনন্দ পান বা কারও উপকারে আসে, তবেই আমার সার্থকতা। এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কাজের অনুপ্রেরণা আরও বাড়াবে।’

শিল্পচর্চার বাইরে মানবিক কর্মকাণ্ডেও কামরুজ্জামানের অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ডিজাস্টার রিলিফ ফান্ড, মেলবোর্ন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সহসভাপতি হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। এর আগে ২০১৯ সালে ভিক্টোরিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ‘বর্ষসেরা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ সম্মাননায় ভূষিত করে।

স্বপ্নদলের জাহিদ রিপন ও কামরুজ্জামান বালার্ক। ছবি: সংগৃহীত

এই সম্মাননায় অভিনন্দন জানিয়ে সিডনির প্রবীণ নাট্যজন গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার মূলধারায় আমাদের নাট্যচর্চার এই স্বীকৃতি অত্যন্ত গর্বের। তিনি কেবল নাটকই করেননি, সিডনি ও মেলবোর্নের নাট্যকর্মীদের মধ্যে একটি শক্ত যোগসূত্রও তৈরি করেছেন।’

এ ছাড়া কামরুজ্জামান বালার্কের দল ‘রেনেসাঁ ড্রামা সোসাইটি মেলবোর্ন’-এর আমন্ত্রণে ২০২৩ সালে ‘অচলায়তন’ নাটকের নির্দেশনা দেন বাংলাদেশের নাট্য সংগঠন স্বপ্নদলের জাহিদ রিপন। তিনি বলেন, ‘কামরুজ্জামান বালার্কের এই রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রাপ্তি প্রমাণ করে—শিকড় থেকে দূরে থাকলেও মেধা, শ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে বিদেশের মাটিতেও নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’