
আজ শুরু হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৯তম আসর। পিয়েরে সালভাদোরির রোমান্টিক কমেডি ‘দ্য ইলেকট্রিক কিস’–এর প্রদর্শনী দিয়ে শুরু হবে উৎসব।
মে মাস এলেই ফরাসি রিভিয়েরার ছোট্ট শহর কান হয়ে ওঠে সিনেমানগরী। গত কয়েক বছরে কান উৎসব মানেই ছিল হলিউডি চাকচিক্যের আরেক নাম। লালগালিচায় টম ক্রুজের উপস্থিতি, হ্যারিসন ফোর্ডের বিদায়ী মুহূর্ত কিংবা বড় স্টুডিওর বহু প্রতীক্ষিত ছবির বিশ্ব প্রিমিয়ার—সব মিলিয়ে কান যেন ইউরোপীয় শিল্প–সিনেমা আর আমেরিকান বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের এক মিলনমেলা। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই চেনা দৃশ্যটাই বদলে গেছে। এবারের কানে নেই কোনো বড় হলিউড ব্লকবাস্টার। এমনকি গত এক দশকে কানে নিয়মিত জায়গা পাওয়া ‘স্টার ওয়ারস’–এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিও এবার অনুপস্থিত। এবারের লাইনআপে চোখে পড়ছে এক ভিন্ন প্রবণতা—হলিউডের ঝলমলে উপস্থিতির বদলে জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান নির্মাতারা, যাঁদের কাজ মূলত গল্পনির্ভর ও শিল্পঘেঁষা। প্রতিযোগিতার ময়দানে রয়েছেন বিশ্ব সিনেমার সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্মাতারা, ফিরছেন বিতর্কিত পরিচালকেরা, থাকছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে নতুন বিতর্ক আর যথারীতি আছে তারকাদের ঝলমলে সমাবেশ।
স্বর্ণপামের লড়াই
এবারের কানের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা পেয়েছে ২২টি ছবি। এখান থেকে নির্বাচিত ছবিই পাবে উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান স্বর্ণপাম। ২৩ মে উৎসবের সমাপনী দিনে ঘোষিত হবে বিজয়ীর নাম।
প্রতিযোগিতায় আছেন স্পেনের পেদ্রো আলমোদোভার, জাপানের সংবেদনশীল গল্পকার হিরোকাজু কোরে-এদা এবং রোমানিয়ান পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুঙ্গিউ। পাশাপাশি রয়েছেন নতুন প্রজন্মের আলোচিত নির্মাতা লুকাস দন্ত ও লিয়া মাইসিয়াস। থাকছেন আলোচিত ইরানি নির্মাতা আসগর ফরহাদি।
তবে উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরীয় পরিচালক না হং–জিনের ‘হোপ’। বাস্তব জীবনের দম্পতি মাইকেল ফাসবেন্ডার ও অ্যালিসিয়া ভিকান্দর অভিনীত ছবিটি নিয়ে ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রের মহলে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। আরেকটি আলোচনার কেন্দ্র ‘শিপ ইন দ্য বক্স’। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এই চলচ্চিত্রে ভবিষ্যতের সমাজকে নতুনভাবে কল্পনা করেছেন হিরোকাজু কোরে-এদা। মনে করা হচ্ছে, এঁদের কারও হাতেই উঠবে স্বর্ণপাম। উৎসব পরিচালক থিঁয়োরি ফ্রেমো জানিয়েছেন, এবারের আসরে ২ হাজার ৫৪১টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র জমা পড়ে—এক দশক আগের তুলনায় যা এক হাজারটির বেশি। ১৪১টি দেশ থেকে আসা এই বিপুলসংখ্যক চলচ্চিত্র প্রমাণ করে, বিশ্ব সিনেমার পরিসর কতটা বিস্তৃত হচ্ছে।
এবারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক, ফরাসিভাষী ছবির আধিক্য। প্রতিযোগিতা বিভাগে বেশ কয়েকটি ফরাসি ভাষার ছবি রয়েছে, যার মধ্যে কিছু ছবির নির্মাতা আবার বিদেশি। একই সঙ্গে তিনজন ফরাসি নারী নির্মাতার ছবিও জায়গা পেয়েছে মূল প্রতিযোগিতায়—যা নারী পরিচালকদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির ইঙ্গিত।
এবারের উৎসবে প্রধান জুরির দায়িত্ব পালন করবেন নন্দিত কোরীয় নির্মাতা পার্ক–চান উক।
এআই: আশীর্বাদ নাকি হুমকি
এবারের কান উৎসবের অন্যতম আলোচ্য এআই। বিশেষ করে পরিচালক স্টিভেন সোডারবার্গের তথ্যচিত্র ‘জন লেনন: দ্য লাস্ট ইন্টারভিউ’ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। ছবিটিতে মৃত্যুর আগে জন লেননের দেওয়া এক অডিও সাক্ষাৎকারকে দৃশ্যমান করতে ব্যবহার করা হয়েছে এআই–জেনারেটেড ছবি। প্রযুক্তির এমন ব্যবহারকে কেউ দেখছেন সৃজনশীল উদ্ভাবন হিসেবে, আবার কেউ বলছেন—এটি মৃত শিল্পীর স্মৃতির বাণিজ্যিক ব্যবহার।
মজার বিষয় হলো, সম্প্রতি গোল্ডেন গ্লোব কর্তৃপক্ষও এআই ব্যবহারের নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ থাকলে এআই ব্যবহৃত চলচ্চিত্র অযোগ্য হবে না। ফলে কান উৎসবেও এআই নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
হলিউডের অনুপস্থিতি
গত কয়েক বছরে কানে বড় হলিউডি সিনেমার প্রিমিয়ার ছিল অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু এবার বড় কোনো মার্কিন স্টুডিও তাদের ব্লকবাস্টার নিয়ে হাজির হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারণায় ঝুঁকে পড়া, খরচ কমানো এবং কানের কঠোর সমালোচকদের ভয়—এই তিন কারণেই হলিউড এবার অনেকটা দূরে থেকেছে।
জন ট্রাভোল্টার প্রত্যাবর্তন
তবে হলিউড একেবারে অনুপস্থিত নয়। নিজের পরিচালিত প্রথম ছবি ‘প্রপেলার ওয়ান–ওয়ে নাইট কোচ’ নিয়ে হাজির হচ্ছেন জন ট্রাভোলটা। বিমানপ্রেমী এই অভিনেতার ছবিটি ‘বিমানযাত্রার স্বর্ণযুগ’ নিয়ে নির্মিত। ১৯৯৭ সালে জন ট্রাভোলটার লেখা একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে এটি তৈরি হয়েছে। এতে অভিনয় করেছেন ক্লার্ক শটওয়েল, কেলি এভিস্টন–কুইনেট, এলা ব্লেউ, ওলগা হফম্যান। এক মা ও সন্তানের সাধারণ এক ভ্রমণ কীভাবে অদ্ভুত এক অ্যাডভেঞ্চারে রূপ নেয়, তা নিয়েই সিনেমাটির গল্প। এটি উৎসবে ক্যামেরা দ’অর বিভাগেও মনোনয়ন পেয়েছে। দীর্ঘদিন পর কানে ট্রাভোলটা উপস্থিতি নিয়েও ভক্তদের আগ্রহ তুঙ্গে।
তারকাদের মেলা
হলিউডের বড় স্টুডিওর সিনেমা না থাকলেও কানে তারকা সমাবেশ কিন্তু কম হবে না। স্কারলেট জোহানসন ও অ্যাডাম ড্রাইভার আসছে ‘পেপার টাইগার’–এর প্রচারে। রামি মালিকও থাকছেন তাঁর অভিনীত ‘দ্য ম্যান আই লাভ’ সিনেমা নিয়ে। এ ছাড়া লালগালিচায় দেখা যাবে হাভিয়ের বারদেম, ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, উডি হ্যারেলসন, কেট ব্লাঞ্চেট ও জুলিয়ান মুরকে। এবার বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন পিটার জ্যাকসন ও বারব্রা স্ট্রেইস্যান্ড।
যুদ্ধের ছায়া নিয়ে ফিরছেন রুশ পরিচালক
রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা আন্দ্রেই পেট্রোভিচ জাভ্যাগিনসেভের প্রত্যাবর্তনও এবারের উৎসবের বড় ঘটনা। কোভিডে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ছাড়ার পর এটাই তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র। নতুন সিনেমা ‘মিনোটর’–এ তিনি দেখিয়েছেন—ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার মধ্যবিত্ত সমাজ কীভাবে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের সংকটে পড়ে।
ফুটবলও থাকছে কানে
সিনেমার উৎসব হলেও এবারের কানে ফুটবলও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।এরিক কাঁতোয়াঁকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘কাঁতোয়াঁ’ যেমন থাকছে, তেমনি আছে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সেই বিতর্কিত ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ে তথ্যচিত্র ‘দ্য ম্যাচ’। সেখানে উঠে আসবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের গল্পও।
ইরান, আফ্রিকা ও রাজনৈতিক সিনেমা
বিশ্বরাজনীতির টানাপোড়েনও এবার জায়গা করে নিয়েছে কানের পর্দায়। ইরানের রাজনৈতিক দমন–পীড়ন নিয়ে নির্মিত ‘রিহার্সেল ফর আ রেভোল্যুশন’ এখন থেকেই আলোচনায়। নাইজেরিয়ার চলচ্চিত্রশিল্প ‘নলিউড’ থেকেও এসেছে নতুন চমক। যমজ নির্মাতা অ্যারি এসিরি ও চুকো এসিরির সিনেমা ‘ক্লারিসা’য় অভিনয় করেছেন আয়ো এদেবিরি ও ডেভিড ওয়েলোও।
আঁ সার্তে রিগায় চমক নেপাল
আঁ সার্তে রিগায় এবারের অন্যতম চমক নেপালি ছবি ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’। অবিনাশ বিক্রম শাহর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি। বনঘেরা নেপালি গ্রামে বসবাসকারী কিন্নর সম্প্রদায়ের গল্প নিয়ে তৈরি ছবিটি। কেন্দ্রীয় চরিত্র পিরাতি, যিনি ভালোবাসা আর নিজের সম্প্রদায়ের দায়বদ্ধতার মধ্যে আটকে যান। নিখোঁজ এক তরুণীকে খুঁজতে গিয়ে তিনি মুখোমুখি হন সমাজের নির্মম বাস্তবতার। দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনকে এত গভীরভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার ঘটনা বিরল। ফলে ছবিটি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের নজর কেড়েছে।
এএফপি অবলম্বনে