সেরা ১০ কোরীয় সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ
সেরা ১০ কোরীয় সিনেমা কোনগুলো। কোলাজ

সিরিয়াল কিলার থেকে হরর , সেরা ১০ কোরীয় সিনেমা কোনগুলো

চলতি শতকের শুরুতেই বিশ্ব সিনেমার মানচিত্রে এক নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র। ইন্টারনেট–পরবর্তী সময়ে যখন দর্শকের সামনে খুলে যায় বিশ্বের নানা দেশের সিনেমার দরজা, তখনই দক্ষিণ কোরীয় চলচ্চিত্র এর অভিনব গল্প বলার ধরন, নির্মাণশৈলীর বৈচিত্র্য ও সাহসী সামাজিক ভাষ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকের মন জয় করে নেয়। থ্রিলার, হরর, গ্যাংস্টার ড্রামা, সামাজিক ব্যঙ্গ কিংবা গভীর মানবিক গল্প—সব ধরনের সিনেমাতেই তারা এমন এক স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছে, যা আজ বিশ্ব সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২১ শতকের দক্ষিণ কোরিয়ার সেরা ১০টি চলচ্চিত্রের তালিকা তৈরি করেছে চলচ্চিত্রবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘কোলাইডার’।

‘ফ্রেন্ড’ (২০০১)

‘ফ্রেন্ড’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

দক্ষিণ কোরীয় সিনেমার নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে যে কয়েকটি চলচ্চিত্র শিল্পটিকে নতুন পরিচয় এনে দেয়, তার মধ্যে অন্যতম ‘ফ্রেন্ড’। পরিচালক কোয়াক কিউং-তায়েক নিজের বাস্তব জীবনের বন্ধুদের অভিজ্ঞতা থেকে নির্মাণ করেন এই গ্যাংস্টার ড্রামা, যা মুক্তির পরপরই কোরিয়ায় আলোচনা তৈরি হয়। বাসান শহরের চার বন্ধুর শৈশব, কৈশোর, স্বপ্ন, বিচ্ছেদ এবং অপরাধজগতের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে সিনেমাটি বন্ধুত্ব ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক শক্তিশালী প্রতিকৃতি তৈরি করে।

এই চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তি ছিল এর বাস্তবতা। বাসান উপভাষার ব্যবহার, লোকেশন নির্বাচন এবং চরিত্রগুলোর মানবিক দ্বন্দ্ব দর্শকদের কাছে গল্পটিকে খুবই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। চলচ্চিত্রটি দেখায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব কীভাবে বদলে যায়, আর সামাজিক বাস্তবতা মানুষকে আলাদা পথে ঠেলে দেয়। কোরিয়ান গ্যাংস্টার চলচ্চিত্রের পরবর্তী ধারায় এই ছবির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। সিনেমাটিতে অভিনয় করেন ইউ ওহ-সিওং, জ্যাং ডং-গান, সেও তাই-হওয়া প্রমুখ।

‘পোয়েট্রি’ (২০১০)

‘পোয়েট্রি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

লি চ্যাং-ডং নির্মিত একেবারেই ভিন্ন স্বাদের চলচ্চিত্র। এখানে নেই চড়া নাটকীয়তা বা দ্রুতগতির প্লট; বরং রয়েছে ধীর, গভীর এবং বেদনাময় এক মানবিক যাত্রা। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন এক বৃদ্ধ নারী, যিনি আলঝেইমারে আক্রান্ত হওয়ার পর জীবনের অর্থ খুঁজতে কবিতা শেখার পথে হাঁটেন।

কিন্তু এই সহজ যাত্রার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সামাজিক অপরাধ, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আত্মসম্মানের প্রশ্ন। অভিনেত্রী ইউন জিয়ং-হির অসাধারণ অভিনয় চলচ্চিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে তোলে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পাওয়া এই ছবি দেখায়—জীবনের শেষ প্রান্তেও সৌন্দর্য ও শিল্প কীভাবে মানুষকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখাতে পারে।

সিনেমাটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ইউন জিওং-হি।

‘দ্য ওয়েলিং’ (২০১৬)

‘দ্য ওয়েলিং’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

না হং-জিনের সিনেমাটি দক্ষিণ কোরিয়ান হরর ঘরানাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। একটি প্রত্যন্ত গ্রামে রহস্যময় রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় ভয়ের এক অদ্ভুত যাত্রা, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

চলচ্চিত্রটির শক্তি হলো এর অনিশ্চয়তা। দর্শক কখনো নিশ্চিত হতে পারেন না—অশুভ শক্তি কোথায়, কিংবা সত্যিই তা অতিপ্রাকৃত কি না। ধীরে ধীরে গল্প এমন জায়গায় পৌঁছে, যেখানে ভয় মানে শুধু দানব নয়, বরং মানুষের ভেতরের অন্ধকার। মুক্তির পর ছবির শেষ দৃশ্য ও ব্যাখ্যা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়, যা আজও চলমান। এতে অভিনয় করেন কোয়াক দো-ওন, হুয়াং জুং-মিন ও চুন উ-হি।

‘আই স দ্য ডেভিল’ (২০১০)

‘আই স দ্য ডেভিল’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

প্রতিশোধের গল্প সিনেমায় নতুন নয়; কিন্তু পরিচালক কিম জি–উন তাঁর এই সিনেমায় পরিচিত ধারণাকে ভয়ংকর মাত্রায় নিয়ে যায়। এক গোপন এজেন্ট তার প্রেমিকার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে; কিন্তু তাকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা না করে ক্রমাগত যন্ত্রণা দিতে থাকে।

এখানেই চলচ্চিত্রটির মৌলিকতা—শিকার আর শিকারি বারবার জায়গা বদলায়। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নায়ক নিজেই ক্রমে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, আর দর্শক বুঝতে পারেন মানবিকতার সীমা কত সহজে ভেঙে পড়তে পারে। চই মিন-সিক ও লি বিং-হুনের অভিনয় এই সহিংস থ্রিলারকে মানসিকভাবে আরও তীব্র করে তোলে। এতে অভিনয় করেন লি বিয়ং-হান, ছোয়ে মিন-শিক ও সান-হা।

‘আ বিটারসুইট লাইফ’ (২০০৫)

‘আ বিটারসুইট লাইফ’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

কিম জি-উনের আরেকটি ক্ল্যাসিক সৃষ্টি। এখানে লি বিং-হুন অভিনয় করেছেন এক মব এনফোর্সারের চরিত্রে, যার জীবন কঠোর শৃঙ্খলায় চললেও প্রেমের আবির্ভাবে সবকিছু ভেঙে পড়ে।

চলচ্চিত্রটি স্টাইলিশ অ্যাকশন, নিঃসঙ্গতা ও বিশ্বাসঘাতকতার গল্প একসঙ্গে তুলে ধরে। ভিজ্যুয়াল ভাষা ও আবহসংগীত ছবিটিকে একধরনের কাব্যিক সহিংসতায় রূপ দেয়। কোরিয়ান সিনেমার আন্তর্জাতিক ভক্তদের কাছে এটি এখনো কাল্ট মর্যাদা ধরে রেখেছে।

‘ট্রেন টু বুসান’

‘ট্রেন টু বুসান’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ইওন সাং-হোর ‘ট্রেন টু বুসান’ শুধু জম্বি সিনেমা নয়; বরং একটি মানবিক থ্রিলার। উচ্চগতির ট্রেনে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হয়, আর তার ভেতরে উঠে আসে মানুষের স্বার্থপরতা, সাহস ও আত্মত্যাগের গল্প।

এক বাবা ও মেয়ের সম্পর্ক ছবিটির আবেগঘন কেন্দ্র। জম্বি আক্রমণের উত্তেজনার মধে৵ও চলচ্চিত্রটি দর্শককে আবেগতাড়িত করে, যা হরর ঘরানায় বিরল সাফল্য। সীমিত বাজেটেও বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে ব্যাপক সাড়া ফেলে এই ছবি কোরিয়ান সিনেমাকে নতুন দর্শক এনে দেয়। এতে অভিনয় করেছেন গং ইউ, জং ইউ-মি, মা দং-সিওক , কিম সু-আন।

‘দ্য চেজার’ (২০০৮)

‘দ্য চেজার’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

না হং-জিনের প্রথম চলচ্চিত্রই ছিল বিস্ফোরক। এটা শুরু হয় এক সিরিয়াল কিলারকে সামনে রেখে, ফলে দর্শকের মনোযোগ থাকে—তাকে ধরা যাবে কি না। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এক পিম্পের ভূমিকায় থাকা প্রধান চরিত্র নিজের নিখোঁজ কর্মীদের খুঁজতে গিয়ে ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হয়।

চলচ্চিত্রটি দেখায়, অপরাধ থামাতে শুধু সাহস নয়, প্রশাসনিক দক্ষতাও জরুরি, আর যেখানে সেটি অনুপস্থিত, সেখানে বিপর্যয় অনিবার্য। দ্রুতগতির সম্পাদনা, বাস্তবধর্মী অভিনয় এবং চাপা উত্তেজনা ছবিটিকে দক্ষিণ কোরিয়ান ক্রাইম থ্রিলারের অন্যতম মাইলফলক বানিয়েছে। এটি নির্মিত হয়েছে কোরিয়ান সিরিয়াল কিলার ইউ ইয়ং-চুলের সত্য ঘটনা অবলম্বনে। এতে অভিনয় করেছেন কিম ইউন-সিওক, হা জুং-উ, এসইও ইয়ং-হি।

‘ওল্ডবয়’ (২০০৩)

‘ওল্ডবয়’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

পরিচালক পার্ক চান–উকের এ সিনেমা দক্ষিণ কোরীয় সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তোলে। এক ব্যক্তি হঠাৎ ১৫ বছর বন্দী থাকার পর মুক্তি পেয়ে জানতে চান—কেন তাঁকে বন্দী করা হয়েছিল। সেই অনুসন্ধানই তাঁকে নিয়ে যায় এক ভয়াবহ সত্যের দিকে।

চলচ্চিত্রটির ভিজ্যুয়াল স্টাইল, বিখ্যাত করিডর ফাইট দৃশ্য এবং চমকে দেওয়া ক্লাইম্যাক্স এটিকে বিশ্ব সিনেমার ক্ল্যাসিক করে তুলেছে। প্রতিশোধের গল্প হলেও এখানে ট্র্যাজেডির গভীরতা এতটাই তীব্র যে সিনেমাটি শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। এতে অভিনয় করেছেন চোই মিন-সিক, ইও জি-তাই ও কাং হাই-জুং।

‘মেমোরিজ অব মার্ডার’ ২০০৩

‘মেমোরিজ অব মার্ডার’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

পরিচালক বং জুন–হোর এই চলচ্চিত্রকে অনেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রাইম থ্রিলারগুলোর একটি মনে করেন অনেক সমালোচক। বাস্তব সিরিয়াল কিলার কেস থেকে অনুপ্রাণিত গল্পে দেখা যায়, ছোট শহরের পুলিশ সদস্যরা কীভাবে সীমিত দক্ষতা ও ভুলপদ্ধতির কারণে বারবার ব্যর্থ হন।

চলচ্চিত্রটির বড় শক্তি হলো এটি অপরাধের গল্প বললেও আসলে এটি মানুষের অসহায়ত্ব ও ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার গল্প। হাস্যরস, হতাশা ও আতঙ্ক একসঙ্গে মিশে এমন এক আবহ তৈরি করে, যেখানে সত্য ধরা দিতেও দেরি হয়; আর কখনো কখনো হয়তো ধরা দেয়ই না। এতে অভিনয় করেছেন সং কাং-হো, কিম সাং-কিউং, কিম রোই-হা।

‘প্যারাসাইট’ (২০১৯)

‘প্যারাসাইট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

২১ শতকের দক্ষিণ কোরীয় সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাগুলোর একটি। বং জুন-হোর এই চলচ্চিত্র ইংরেজি ভাষার বাইরের প্রথম ছবি হিসেবে অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে ইতিহাস তৈরি করে। দরিদ্র এক পরিবার ধনী পরিবারের জীবনে ধীরে ধীরে প্রবেশ করে—এই সাধারণ গল্পই একসময় ভয়াবহ সামাজিক ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত হয়।

চলচ্চিত্রটি শ্রেণিবৈষম্য, পুঁজিবাদ ও সামাজিক ব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা এমনভাবে তুলে ধরে যে তা বিশ্বের সব দেশের দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। হাস্যরস থেকে থ্রিলার, থ্রিলার থেকে ট্র্যাজেডি—ঘরানার এমন নিখুঁত মিশ্রণ খুব কম চলচ্চিত্রেই দেখা যায়। সিনেমাটি প্রমাণ করে দিয়েছে, ভাষা নয়—গল্পই সিনেমার আসল শক্তি।

এতে অভিনয় করেছেন সং কাং-হো, লি সুন-কিউন, চো ইয়ো-জেওং।