
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেক্ষাগৃহে চুসক উৎসবের ছুটিতে দর্শকের ঢল নেমেছে। আর সেই বাড়তি দর্শকের সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছে দুটি স্থানীয় সিনেমা—হুর জিন-হোর রাজনৈতিক অপরাধ-থ্রিলার ‘দ্য অ্যাসাসিনস’ এবং জনপ্রিয় জুয়াকেন্দ্রিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘তাজ্জা ৪: দ্য সং অব বিলজেবুব’। ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের তিন দিনে কোরিয়ার বক্স অফিসে দুই সিনেমাই উল্লেখযোগ্য ব্যবসা করেছে।
কোরিয়ান ফিল্ম কাউন্সিলের বক্স অফিস ট্র্যাকিং সেবা কেওবিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে শীর্ষে ছিল ‘দ্য অ্যাসাসিনস’। তিন দিনে সিনেমাটি আয় করেছে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার। দর্শকসংখ্যা ছিল ১১ লাখ ১৯ হাজার ১৫৬। ১ হাজার ৫৩২টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত সিনেমাটি সপ্তাহান্তের মোট বাজারের ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ দখল করেছে।
২৩ সেপ্টেম্বর মুক্তির পর মাত্র কয়েক দিনেই সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার (১৩৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা)। মোট দর্শকসংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৫ লাখ ৬৬ হাজার।
১৯৭৪ সালের হত্যাচেষ্টার রহস্য
‘দ্য অ্যাসাসিনস’ পরিচালনা করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান নির্মাতা হুর জিন-হো। সিনেমাটির গল্পের পটভূমি ১৯৭৪ সালের ১৫ আগস্ট। সেদিন দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হির ওপর হত্যাচেষ্টা চালানো হয়। জাতীয় মুক্তি দিবসের অনুষ্ঠানে চালানো ওই হামলায় নিহত হন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ইউক ইয়ং-সু।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। তবে এটি নিছক ইতিহাস পুনর্নির্মাণ নয়; বরং হত্যাচেষ্টার পর তদন্তের আড়ালে থাকা প্রশ্নগুলোকে সামনে এনেছে সিনেমাটি।
গল্পে একজন গোয়েন্দা, একটি সংবাদপত্রের অভিজ্ঞ সমাজবিষয়ক বিভাগের প্রধান এবং একজন নবীন সাংবাদিককে দেখা যায়। গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইউ হে-জিন, সংবাদপত্রের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের চরিত্রে পার্ক হে-ইল এবং নবীন প্রতিবেদকের ভূমিকায় রয়েছেন লি মিন-হো।
তদন্ত করতে গিয়ে তাঁরা এমন কিছু ব্যালিস্টিক প্রমাণের সন্ধান পান, যা সরকারের প্রচার করা ‘একক বন্দুকধারী’র তত্ত্বের সঙ্গে মেলে না। এরপর শুরু হয় সত্য অনুসন্ধানের লড়াই। হারিয়ে যাওয়া গুলির প্রমাণ, সরকারি ভাষ্য এবং তদন্তকারীদের হাতে আসা নতুন তথ্য—সব মিলিয়ে তৈরি হয় রাজনৈতিক রহস্য।
ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হওয়ায় সিনেমাটিতে কেবল অপরাধ অনুসন্ধান নয়, তৎকালীন দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় স্থানে ‘তাজ্জা ৪’
বক্স অফিসে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেকটি স্থানীয় সিনেমা ‘তাজ্জা ৪: দ্য সং অব বিলজেবুব’। চোই কুক-হি পরিচালিত সিনেমাটি ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর তিন দিনে আয় করেছে ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার। দর্শকসংখ্যা ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫২৬। ১ হাজার ৪৫টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত সিনেমাটি সপ্তাহান্তের বাজারের ২১ দশমিক ৩ শতাংশ দখল করেছে।
২৩ সেপ্টেম্বর মুক্তির পর প্রিভিউ ও চুসকের ছুটির দর্শক মিলিয়ে সিনেমাটির আয় দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার। দর্শকসংখ্যা ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৩০।
জনপ্রিয় কমিকস অবলম্বনে নির্মিত ‘তাজ্জা’ ফ্র্যাঞ্চাইজির এটি চতুর্থ কিস্তি। এতে অভিনয় করেছেন ব্যুন ইয়ো-হান, নো জে-ওন ও জাপানি অভিনেত্রী আয়াকা মিয়োশি।
প্রতিশোধের গল্প, আন্তর্জাতিক পোকার টেবিল
‘তাজ্জা ৪’-এর গল্পে সাবেক এক অনলাইন ক্যাসিনো অপারেটরকে কেন্দ্র করে কাহিনি এগিয়েছে। বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে সে আন্তর্জাতিক পোকার সার্কিটে প্রবেশ করে। এরপর শুরু হয় বড় অঙ্কের জুয়া, কৌশল, প্রতারণা ও প্রতিশোধের খেলা।
‘তাজ্জা’ সিরিজের আগের সিনেমাগুলোর মতো নতুন কিস্তিতেও জুয়াকে কেন্দ্র করে মানুষের লোভ, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং প্রতিশোধের গল্পকে সামনে আনা হয়েছে। তবে এবারের কাহিনির পরিসর আরও আন্তর্জাতিক—স্থানীয় জুয়ার আসর পেরিয়ে গল্প পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক পোকার সার্কিটে।
চুসকের ছুটিতে জমে উঠেছে হল
দক্ষিণ কোরিয়ায় চুসক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। পরিবার নিয়ে ছুটি কাটানো, বাড়ি ফেরা এবং অবসর সময় কাটানোর কারণে এই সময় সাধারণত সিনেমা হলগুলোতেও দর্শক বাড়ে। ফলে স্থানীয় প্রযোজকদের কাছে চুসক বক্স অফিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এবার সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে ‘দ্য অ্যাসাসিনস’ ও ‘তাজ্জা ৪’। বিশেষ করে ‘দ্য অ্যাসাসিনস’ মুক্তির পরপরই দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে। রাজনৈতিক ইতিহাস, রহস্য ও অপরাধ তদন্তের মিশ্রণ সিনেমাটিকে আলাদা করে তুলেছে।
অন্যদিকে ‘তাজ্জা ৪’ পেয়েছে প্রতিষ্ঠিত একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সুবিধা। আগের কিস্তিগুলোর পরিচিতি এবং জুয়া, প্রতিশোধ ও অপরাধের গল্পের সঙ্গে নতুন চরিত্র যুক্ত হওয়ায় সিনেমাটি চুসকের ছুটিতে বড় দর্শক টেনেছে।
স্থানীয় সিনেমার দাপট
চুসকের এই সপ্তাহান্তে কোরিয়ার বক্স অফিসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো স্থানীয় দুটি সিনেমার দাপট। একদিকে বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনার ছায়ায় নির্মিত ‘দ্য অ্যাসাসিনস’, অন্যদিকে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন কিস্তি ‘তাজ্জা ৪’—দুটি সিনেমার গল্প ও ধরন আলাদা হলেও দর্শক টানার ক্ষেত্রে দুটিই সফল হয়েছে।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে