‘ইয়েলো লেটার্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি
‘ইয়েলো লেটার্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

‘স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান হওয়া উচিত, ভিন্নমত পোষণকারী শিল্পীদের বিরুদ্ধে নয়’

৭৬তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণভালুক জিতলেন জার্মান নির্মাতা ইলকার চাতাক। গেল শনিবার রাতে উৎসবের সমাপনী দিনে তাঁর হাতে উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার তুলে দেন জুরিপ্রধান ভিম ভেন্ডার্স। ‘ইয়েলো লেটার্স’ সিনেমার জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। কিন্তু কী আছে এই সিনেমায়? কেনই–বা এতটা প্রশংসা পাচ্ছে সমালোচকদের কাছ থেকে?

বার্লিন যখন আঙ্কারা

রাষ্ট্রের রোষে এক পরিবারের ভাঙন বার্লিনকে যদি একদিন হঠাৎ আঙ্কারা বলে ঘোষণা করা হয়? শহরের সাইনবোর্ড জার্মান, ভাষা তুর্কি, রাজনীতি তুরস্কের—আর নাগরিকেরা হঠাৎ রাষ্ট্রের নজরে সন্দেহভাজন। এমন এক অদ্ভুত, ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিকৃত’ ভূগোলের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছে ‘ইয়েলো লেটার্স’। তুরস্কের প্রেক্ষাপটে হলেও ছবিটির শুটিং হয়েছে বার্লিনে।

ছবির শুরুতেই বিশাল অক্ষরে লেখা—‘বার্লিন এখানে আঙ্কারা’। যেন নির্মাতা নিজেই ঘোষণা করছেন, এটি এক রাজনৈতিক নির্বাসনের গল্প। রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের কাহিনি, কিন্তু তার প্রেক্ষাপট এমনভাবে বদলে দেওয়া হয়েছে যে গল্পটি কেবল তুরস্কের থাকে না, হয়ে ওঠে সর্বজনীন।

‘ইয়েলো লেটার্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

মঞ্চ থেকে শুরু রাষ্ট্রের নাটক
গল্পের শুরু মঞ্চে। মধ্যবয়সী অভিনেত্রী দেরিয়া প্রতিরোধের বিমূর্ত ভাষ্য নিয়ে একটি আবেগঘন পারফরম্যান্স শেষ করছেন। নাটকটি লিখেছেন তাঁর স্বামী আজিজ—বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার অধ্যাপক। দর্শক হাততালি দিচ্ছেন, দম্পতির সাফল্য যেন উজ্জ্বল।

কিন্তু এই আলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অন্ধকার। দর্শকসারিতে বসে থাকা এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যার উপস্থিতি কয়েক সেকেন্ডের বেশি নয়, পরে হয়ে ওঠেন পুরো বিপর্যয়ের সূত্রপাত। নাটক বাতিল হয়, আজিজ ও তাঁর সহকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে সাময়িক বরখাস্ত হন। এরপর আসে সেই ‘হলুদ চিঠি’ সরকারি খামে ভরা আইনি নোটিস। শিরোনামের অর্থ তখন স্পষ্ট হয়। এটি শুধু একটি চিঠি নয়, রাষ্ট্রের সতর্কবার্তা, কিংবা একরকম রায়।

পরিবার, প্রতিবাদ আর সন্দেহ

দেরিয়া ও আজিজের কিশোরী মেয়ে এজগিকে নিয়ে ছোট–উষ্ণ একটি পরিবার। দ্রুতগতির সংলাপ, স্বাভাবিক হাসিঠাট্টা—পরিচালক চাতাক এই পারিবারিক রসায়নকে খুব স্বাভাবিক ছোঁয়ায় ধরেছেন। জানালার বাইরে বিক্ষোভ চলছে। কোথাও যুদ্ধবিরোধী স্লোগান, কোথাও রংধনু পতাকা, কোথাও ফিলিস্তিন ও ইউক্রেনের পতাকা। দৃশ্যগুলো ইঙ্গিত দেয় এই গল্প কেবল তুরস্কের নয়, বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আছে।
ছবিটি তাই ‘ইস্যুভিত্তিক’ সিনেমা হয়েও বিমূর্ততায় হারিয়ে যায় না। বরং বাস্তবতার নির্দিষ্ট ছাপ তাকে মাটিতে রাখে।

শিল্প কি বদলায় পৃথিবী?

ছবিটি এবারের উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতেছে এমন এক সময়ে, যখন বার্লিন উৎসব ঘিরেও তখন রাজনৈতিক বিতর্ক, শিল্পের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। চাতাক যেন সেই প্রশ্নেরই জবাব খুঁজছেন। সিনেমায় আজিজ তাঁর ছাত্রদের বলেন, ‘রাষ্ট্রের নাটক যদি না দেখো, তবে নাট্যরচনা বোঝা যাবে না।’ এখানে শিল্প কেবল নান্দনিক অভিব্যক্তি নয়, বরং প্রতিরোধের অস্ত্র। কিন্তু রাষ্ট্রের রোষে যখন শিল্পীই কোণঠাসা, তখন প্রশ্ন জাগে-শিল্প কি যথেষ্ট?

বার্লিন-আঙ্কারা, হামবুর্গ-ইস্তাম্বুল
চাপ বাড়তে থাকে। আজিজের বিচার ঝুলে থাকে। কাজ নেই, আয় নেই। পরিবারটি শেষ পর্যন্ত ইস্তাম্বুলে চলে যায় (ছবিতে জার্মানির একটি শহরে শুটিং হয়েছে)। এই ভৌগোলিক অমিলই ছবির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রূপক। চরিত্রগুলো তুর্কি ভাষায় তুরস্কের রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু চারপাশে জার্মান সাইনবোর্ড। যেন যেকোনো শহরই এমন হতে পারে—বার্লিন, বুদাপেস্ট, মিনিয়াপোলিস বা মুম্বাই।
রাষ্ট্রের চাপে তারা গাদাগাদি করে থাকতে শুরু করে আজিজের মায়ের বাড়িতে। অর্থকষ্ট, অপমান, সন্দেহ—সব মিলিয়ে পরিবারে ফাটল ধরে। ছবিটি দেখায়, রাজনৈতিক নিপীড়ন শুধু আদালত বা চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও বিষ ঢালে।

স্বর্ণভালুক হাতে ইলকার চাতাক। এএফপি

গত শনিবার ‘ইয়েলো লেটার্স’-এর জন্য নির্মাতার হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে বার্লিন উৎসবের প্রধান জুরি ভিম ভেন্ডার্স ছবিটিকে আখ্যা দেন ‘ভীতিকর এক পূর্বাভাস’ হিসেবে, যা নিকট ভবিষ্যতে যেকোনো দেশেই ঘটতে পারে। তাঁর মতে, এটি কেবল একটি দেশের গল্প নয়, বরং সমকালীন বিশ্বের উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি। ৪২ বছর বয়সী ইলকার চাতাকের জন্য এটি বড় সাফল্য। তাঁর আগের ছবি ‘দ্য টিচার্স লাউঞ্জ’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিল এবং অস্কার মনোনয়নও পেয়েছিল। পুরস্কার গ্রহণ করে ইলকার বলেন, ‘এই পৃথিবীর স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধেই আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত, ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণকারী শিল্পীদের বিরুদ্ধে নয়। আমরা যেন একে অপরের সঙ্গে লড়াই না করি। লড়াইটা হোক তাদের (স্বৈরশাসক) বিরুদ্ধে।’

ভ্যারাইটি অবলম্বনে