চলছে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব। রয়টার্স
চলছে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব। রয়টার্স

গাজা প্রশ্নে বার্লিন উৎসবের নীরবতা, অস্কারজয়ী শিল্পীদের চিঠি

ইসরায়েলের গাজা অভিযান নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট না করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে চলমান বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব। ৮০ জনের বেশি অভিনেতা ও পরিচালক একটি খোলা চিঠিতে উৎসব কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘ফিলিস্তিনিবিরোধী’ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতার অভিযোগ তুলেছেন।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন অস্কারজয়ী স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম ও ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিলডা সুইনটন। তাঁরা উৎসব আয়োজকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে।

ভিম ভেন্ডার্সের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক
ঘটনার শুরু ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে; উৎসবের উদ্বোধনী আলোচনায়। সেখানে গাজায় চলমান গণহত্যায় জার্মান সরকারের সমর্থন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে উৎসবের জুরিপ্রধান প্রখ্যাত জার্মান নির্মাতা ভিম ভেন্ডার্স মন্তব্য করেন, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত। তাঁর ভাষায়, ‘সিনেমা মানুষের কাজ করবে, রাজনীতিবিদদের কাজ নয়। শিল্প যদি সরাসরি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, তবে তা শিল্পের নিজস্ব পরিসর থেকে সরে যাবে।’ একই আলোচনায় জুরি সদস্য পোলিশ প্রযোজক ইভা পুশচিনকা বলেন, পৃথিবীতে আরও বহু যুদ্ধ চলছে। নির্দিষ্ট একটি সংঘাত নিয়ে জুরিদের মতামত চাওয়া সমীচীন নয়।

এবারের উৎসবের জুরিপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রখ্যাত জার্মান নির্মাতা ভিম ভেন্ডার্স। এএফপি

‘শিল্পীদের কণ্ঠরোধ’-এর অভিযোগ
চিঠিতে গত বছরের উৎসবের কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ করা হয়, এক নির্মাতার বক্তব্যকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়ে পুলিশি তদন্তের মুখে ফেলা হয়েছিল।
স্বাক্ষরকারীরা এটিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়ন’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, তাঁরা এই আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

অরুন্ধতী রায়ের সরে দাঁড়ানো
এই বিতর্কের মধ্যেই ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় চলতি বছরের উৎসব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। জুরি সদস্যদের ‘অবিবেচক মন্তব্য’-এর প্রতিবাদে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন।

অস্কারজয়ী স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম। এএফপি

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রজগতের বাড়তে থাকা চাপ
চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের বড় অংশ ইতিমধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক বয়কটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত বছর বিশ্বের বৃহত্তম প্রামাণ্যচিত্র উৎসবসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উৎসব ইসরায়েলি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পাঁচ হাজারের বেশি চলচ্চিত্রকর্মী ইসরায়েলি প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ না করার অঙ্গীকারও করেছেন।

তবে সমালোচকদের মতে, বার্লিনালে এখন পর্যন্ত তাঁদের সম্প্রদায়ের ন্যূনতম দাবিও পূরণ করেনি—যেমন ফিলিস্তিনিদের জীবন, মর্যাদা ও স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া।

উৎসবের নৈতিক দায়
১২ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এবারের বার্লিনালে ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে। স্বাক্ষরকারীরা তাঁদের চিঠির শেষে বলেন, ‘যেমনভাবে উৎসব অতীতে ইউক্রেন ও ইরানের মানুষের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে, তেমনি গাজায় সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধেও তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করা উচিত।’

চলচ্চিত্র, শিল্প আর রাজনীতি—এই তিনের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই চিঠি। বার্লিনালের নীরবতা এখন আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আল–জাজিরা অবলম্বনে