টা ট কা র স

বিশ্বাসের বাজারে সব মাল ভেজাল

আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এ আমার চরম অভিজ্ঞতার ফল বলা যায়।

আমার স্ত্রী হাসপাতালে। আমার জীবন হাসপাতাল, ওষুধ, পরীক্ষা, রিপোর্ট, বিল আর কঠিন টেনশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মাথায় সারাক্ষণ মিটিং চলছে—কী হবে, কী করা যায়, এত টাকা কোত্থেকে আসবে, এসব।

এমন এলোপাথাড়ি অবস্থায় গাড়ির ড্রাইভার ফোন করে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল, ‘স্যার, গাড়ির শক অ্যাবজরভার ভেঙে গেছে। গাড়ি রাস্তায় বসে গেছে।’

আঁতকে উঠে বললাম, ‘বসে গেছে!’

ড্রাইভার বলল, ‘জি স্যার। একেবারে বসে গেছে।’

তখন আমার গাড়ির চেয়ে নিজের মাথা বেশি বসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্ত্রী হাসপাতালে, তার ওপর গাড়ি নষ্ট। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে গেল গ্যারেজে।

খানিক পরে ফোন এল, ‘স্যার, গাড়ি ঠিক করতে হবে। অনেক কাজ আছে।’

‘কত?’

‘৯০ হাজার টাকার কিছু বেশি হবে।’

ফোন কানে নিয়ে চুপ করে থাকলাম। কানে আর কোনো শব্দ ঢুকছে না। ৯০ হাজার টাকা! বুঝলাম গাড়ির শক অ্যাবজরভার ভাঙলে মানুষের নিজের শকও কম হয় না। শক আরও বেড়ে গেল যখন জানতে পারলাম সেই ৯০ হাজার টাকার ভেতর বড় অংশ আছে ড্রাইভারের কমিশন। এই ঘটনা জানার আগেই গাড়ি মেরামত করা হয়েছে। বিলও পরিশোধ করে দিয়েছি।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম। গাড়ি দেখে আমার সন্দেহ হলো। গাড়ি অন্য এক গ্যারেজে দেখালাম। দিব্যি আছে গাড়ি! কোনো শক অ্যাবজরভার লাগানো হয়নি। আগেরটাই আছে। গাড়ি কোনোদিন রাস্তায় বসেও যায়নি। আদতে বসে গেছি আমি!

এই ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, গাড়ির ব্যাপারে আর কাউকে বিশ্বাস করব না। কিন্তু মানুষের জীবনের সমস্যা হলো, কোনো এক জায়গায় অবিশ্বাস জন্মালে অন্য জায়গায় বিশ্বাস করতেই হয়।

বাজার থেকে স্ত্রীর জন্য ইলিশ মাছ কিনব। কেনার সময় ইলিশ মাছ দেখে সন্দেহ হলো। আঁশ ছোট ছোট মনে হচ্ছে। মাছওয়ালাকে বললাম, ‘ভাই, ইলিশ ভালো হবে তো?’

মাছওয়ালা এমন মুখ করলেন, যেন এই ইলিশের সার্টিফিকেট তিনি নিজে লিখে দিয়েছেন। মাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘পদ্মার ইলিশ। চোখ বন্ধ করে নিয়ে যান।’

চোখ খুলেই মাছ কিনে বাসায় ফিরলাম। ভাবলাম, আজ অন্তত একটা জায়গায় শান্তি পেয়েছি। পদ্মার ইলিশ কিনতে পেরেছি!

মাছ দেখে স্ত্রী বলল, ‘এটা তো ইলিশ না!’

চমকে উঠে বললাম, ‘কী!’

স্ত্রী বলল, ‘সুরমা মাছ। ইলিশের মতো দেখতে।’

অসহায় চোখে মাছের দিকে তাকালাম। মাছটাও আমার দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে আছে। তার চেহারা দেখে মনে হলো, সে নিজেও জানে না তার কী পরিচয়!

বুঝতে পারলাম, আমার জীবনে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হলো। মাথার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েছি। ফার্মেসি থেকে মাথার যন্ত্রণানাশক মহৌষধ ঝান্ডু বাম কিনে আনলাম। 

ঝান্ডু বাম আছে দুই রকমের। লাল রংয়ের ঝান্ডু বাম অনেক শক্তিশালী। কপালে জোরদার ঝান্ডু বাম লাগানোয় উদ্যোগ নিলাম।

মোচড় দিতেই কৌটার ক্যাপ খোলার আগে তলা খুলে গেল। এ রকম হওয়ার কথা নয়। ভেতরে লাল রঙের জেলির মতো জিনিস। তাতে হালকা কর্পূরের গন্ধ ছাড়া অতিরিক্ত আর কিছু নেই। জেলির মতো এই পদার্থ মাথার যন্ত্রণা কমানোর ক্ষমতা রাখে না, জ্বালাপোড়া বাড়িয়ে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

মাথার দুপাশ শক্তভাবে চেপে ধরে অনেক ক্ষণ চুপচাপ বসে আছি। যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বাঁচতে হলে বিশ্বাস হারানো যায় না। বিশ্বাসের জায়গা খুঁজছি। বিশ্বাসের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হচ্ছে, ‘সন্দেহ’। বুঝতে পারছি, এখন কেবলমাত্র সন্দেহকেই বিশ্বাস করা যায়!