১
খবরটা শুনে চমকে গেলাম। ডলারের দাম নাকি বেড়েছে। দেরি করলাম না আর, ব্যাংকে ফোন দিয়ে দিলাম। জানি না ব্যাংকগুলোর লোকজনকে আদবকায়দা কে শিখিয়েছে! কথা বললেই মনে হয়, ইশ্, লোকটার সাথে যদি সারা দিন কথা বলতে পারতাম! বিনয়ে গলতে গলতে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আপনাকে কীভাবে সহায়তা করতে পারি?’
‘আজকে ডলারের দাম কত?’
‘১২৪ টাকা ২০ পয়সা।’
‘সামনে কি আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে?’
‘এ ব্যাপারে আমরা আগে থেকে বলতে পারি না, স্যার। এ ছাড়া আর কোনো সাহায্য করতে পারি আপনাকে?’
বেশি চাপাচাপি করলাম না, রেখে দিলাম। যে সম্মান দেয়, তার সম্মান রক্ষা করাও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ফোনটা রেখে হিসাব করলাম, ভালোই লাগছে।
পরদিন আবার ব্যাংকে ফোন দিলাম।
‘আজকে ডলারের রেট কত চলতেছে?’
‘১২৪ টাকা ৭০ পয়সা স্যার।’
‘সেরা!’
‘জি, স্যার?’
‘না, কিছু না। সামনে কি রেট আরও বাড়বে?’
‘এ ব্যাপারে আগে থেকে কিছু জানাতে পারব না, স্যার।’
ফোন কেটে ডলারের হিসাবটা মেলালাম, ভালোই লাগছে।
সেদিনও ফোন দিলাম, সম্মান আর আদবের সাথেই ব্যাংকের লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘যদি স্যার কিছু মনে না করেন, একটা প্রশ্ন করতে পারি?’
‘করুন।’
‘প্রতিদিন আপনি ডলারের রেট জিজ্ঞেস করেন কেন? আপনি কি ডলার নেবেন, স্যার? কিছুই তো বলেন না।’
‘প্রতিদিন কই? শুধু যেদিন ট্রাম্প উল্টাপাল্টা কথা বলে, শুধু সেদিন, আর একটা–দুইটা মিসাইল পড়লে, সেদিন আর ট্রাম্প টুইট করলে, সেদিন একটু ফোন দিই।’
‘জি না স্যার, আপনি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটকালেও ফোন দেন, আবার বাংলাদেশের জাহাজের অনুমতি দিলেও ফোন দেন। এটার কারণ কী?’
‘বলেন তো, কোনটায় ডলারের রেট বাড়ে? হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটকালে, নাকি জাহাজ চললে?’
‘ঘটনা খুলে বলবেন, স্যার?’
‘তেমন কিছু না। আমার কাছে কিছু ডলার আছে। সেগুলো ভাঙালে কত টাকা আসে, জানার চেষ্টা করছি।’
‘কত ডলার আছে আপনার কাছে স্যার?’
‘৩.৩২ ডলার।’
‘স্যার, আমাদের নিজে থেকে ফোন কেটে দেওয়ার নিয়ম নেই। কিছু মনে না করলে স্যার, আপনি কি নিজে আমার মুখের ওপর ফোনটা কেটে দেবেন?’
একবার কেউ সম্মান, আদবকায়দা শিখে গেলে, সে গালিও দেয় সম্মানের সাথে। সম্মানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফোন কেটে দিলাম।
২
ঘটনা শুরু আরও আগে। যখন শুনেছি কনটেন্ট মনিটাইজেশন করে নাকি হাজার হাজার যুবক-যুবতী-বয়-বৃদ্ধ নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছে। কাছ থেকেই দু-একজনকে দেখেছি। তাদের অনেককেই কিছুই করতে হয় না, কাউকে নাচতে হয়, কাউকে অভিনয় করতে হয়, কাউকে কৌতুক পরিবেশন করতে হয়, কাউকে মোটিভেশন দিতে হয়, কাউকে বা কুকুর পানিতে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু আমি কী করব? দু-একটা স্ট্যাটাস দেওয়া ছাড়া তো আর কিছুই নেই গতরে। তবু মনিটাইজেশনের জন্য অ্যাপ্লাই করে ফেললাম। এক সন্ধ্যায় নোটিফিকেশন পেলাম, মনিটাইজেশন অন হয়েছে। সাথে সাথে একটা পোস্ট লিখে পোস্ট করলাম আর সারাটা দিন তাকিয়ে থাকলাম ড্যাশবোর্ডের সেই বক্সটার দিকে, যে বক্সে একটা S-এর শরীর বরাবর দাগ টানা আর নিচে লেখা, Approximate Earnings, আর এদের মাঝখানে 0.00! সারা দিন তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গেলাম। মধ্যরাতে প্রকৃতির ডাকে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি পুরা দুই সেন্ট উপার্জন করে ফেলেছি। খুশিতে দ্রুত ইন্টারনেটে দুই সেন্টকে টাকায় কনভার্ট করে ফেললাম, কিন্তু মাত্র ২ টাকা ২৬ পয়সা। মনটাই খারাপ হয়ে গেল, বাথরুমে না গিয়ে জাকারবার্গকে মনে মনে তুলাধুনা করে ঘুমিয়ে পড়লাম, ফকিররেও আমরা এর থেকে বেশি টাকা দিই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, ৩৬ সেন্ট হয়ে গেছে। অফিসে, কাজের ফাঁকে, ঘরে বসে, ভাত খেতে খেতে, বাথরুমে, গোসল করার ফাঁকে শুধু ড্যাশবোর্ডের সেই বক্সের দিকে তাকিয়ে থাকি। ৩৬ সেন্ট থেকে প্রথম যেবার ১ ডলার হলো, ভিক্ষুককে ১০ টাকা দিয়ে বললাম, ‘মন খুলে দোয়া কইরেন। ১০০ ডলার হইলে ১০০ টাকা দেব।’ কথাটা বলে ঘাড় ঘোরাতেই আরেক ভিক্ষুক এসে বলল, ‘আমারেও দেন, আমিও দোয়া করব।’ নিতান্তই বিপদে পড়ে তাকেও ১০ টাকা দিলাম। সে টাকা পেয়ে আকাশের দিকে মোনাজাত ধরল, ‘হে পরওয়ারদিগার, হে মহান ত্রাণকর্তা, তুমি ভাইয়ের জীবনটা ডলারে ডলারে ভরায়ে দাও, আমিন।’ বলেই সে সরে গেল। দেখলাম অদূরে ক্যামেরাম্যান দাঁড়িয়ে আছে, আর সেই ভিক্ষুক ক্যামেরার সামনে গিয়ে বলছে, ‘হ্যালো গাইজ, আজকে আমি ভিক্ষুক সেজে পথে নেমেছি, দেখতে সারা দিনে আমি কত টাকা ভিক্ষা পাই। এই ১০ টাকাসহ হলো ১৭০ টাকা। দিন শেষে কত টাকা পাই, দেখতে সাথে থাকুন।’
১০ টাকা রীতিমতো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাছে গেল! মন খারাপ নিয়ে রিকশা ডাকলাম, ‘যাবেন নাকি মালিবাগ?’
‘হ, যামু।’
‘কয় সেন্ট?’
মামার বোঝার কথা নয়। তবে তাদের বুঝ দিয়ে আমি কী করব, অভ্যাস তো করতে হবে। তাই তরমুজ, কমলা, এমনকি পাঙাশ মাছও আমি ডলারে দামাদামি শুরু করলাম। কিন্তু উপলব্ধি করলাম, এক কেজি পাঙাশ কেনার মতো ডলার এখনো জমেনি। শুধু জমেনি বললে ভুল হবে, ১.২৩ ডলারে আটকে আছে। এদিকে ফেসবুক আমাকে ডলার কামানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করতে বলে। বলে, ‘বেশি বেশি করে রিলস বানাও, বেশি বেশি করে ভিডিও স্টোরি দাও।’ এক অসীম কনটেন্ট মনিটাইজেশনের মধ্যে পড়ে গেলাম।
৩
মোটামুটি দুচোখে যা দেখি, তা-ই ভিডিও করি। এই বাজারে বলা যায় না, কোনটা ভাইরাল হয়ে যায়। আমি নিজেই রাত জেগে গত তিন-চার দিন গর্ত খোঁড়া দেখছি। এর আগে দেখছি ভাত খাওয়া। একটা মেয়ে সকাল-বিকাল ভাত খায়, আমি সেটা দেখি। একটা পরিবারের সবাই মিলে কাঁচা সবজি খাচ্ছে। আমি নিজে একদিন ক্যামেরা অন করে ভাত খেলাম। একটু স্টাইল করে খেয়েছি, কাঁচা মরিচটা আলতো করে কামড় দিয়েছি, ভাত চিবানোটা যাতে স্মার্ট হয়, সে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভিডিওতে দেখে মনে হচ্ছে, একটা কামলা সারা দিন ঠেলাগাড়ি ঠেলে ভাত খাচ্ছে। ওরা ভাত খেলে কত সুন্দর লাগে, আমাকে এমন লাগছে কেন? ওরা কোন চালের ভাত খায়? চাল পাল্টালেই কি ভিডিও সুন্দর হবে? এরপর শুধু চাল না, সবজি খেয়েছি, বৃষ্টির ভিডিও করেছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অপেক্ষা করেছি। ভাইরাল হওয়ার মতো কিছু যদি পাই হাতের কাছে, অমনি ধরে গাপুসগুপুস।
কিন্তু আমার কিছুই হলো না। চুল পাকছে, অথচ ৬.৪৭ ডলারে এসে সেই যে থেমেছে, মনে হয় সে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন না করলে যাবে না। উপায়ও দেখছি না। একা একা রিলস বানাতে ভাল্লাগে না। কিন্তু আমার বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী কেউ আমার সাথে রিলস বানাতে রাজি হচ্ছে না। আমরা আসলে এমন একটা সমাজে বাস করি, সামান্য একটা রিল বানাতেও মানুষ এগিয়ে আসে না। আমার রিচ, আমার ভিউ, আমার ফলোয়ার দেখে মনে হয়, আমি এই কনটেন্টের জগতের একলা এক কাঠুরিয়া। এদিকে ১০০ ডলার না হলে আবার টাকাটা তোলা যায় না। ছেড়ে দিলে এই ৬.৪৭ ডলারই লস। তাই সব লজ্জার মাথা খেয়ে একদিন নিজে নেচে ভিডিও করে পোস্ট করলাম। ইচ্ছা হলো, এই ভিডিওতে ১০০ ডলার এলে অবসর নিয়ে নেব। সেই ভিডিওর রেজাল্ট হলো অসাধারণ, শুধু ভাইরাল হলাম তা নয়, হয়ে গেলাম বিদ্যা সিনহা মিম… ইয়ে সরি, শুধু meme। আমাকে সবাই চেনে, বাজারে দেখলে হাসে, কেউ কেউ চিমটি কাটে।
এদিকে এক ভিডিওতে ডলার যোগ হয়েছে ১৬০, ডলারের বিনিময়ে এই সব হাসিঠাট্টা সহ্য করাই যায়। এটাকে বলে মানিটাইজেশন।
৪
পকেটে ডলার ভাঙা টাকা, মুখ দিয়ে বাংলা কথা বেরুচ্ছেই না। নিজেকে বহু কষ্টে দমিয়ে মাছওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, পাঙাশ কি নদীর? নাকি চাষের?
দোকানদার বলল, ‘বিলের, স্যার। কিশোরগঞ্জের।’
—কেজি কত ডলার?
মাছওয়ালা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘এমনি ৫ ডলার বেচি, আপনার জন্য ৪ ডলার ৩০ সেন্ট। একদম ফ্রেশ বিলের মাছ। ধইরা দেখেন।’
মাছ দেখব কী, মাছওয়ালার থেকে চোখ ফেরাতেই পারছি না। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কীভাবে ডলারের হিসাব বললেন?
মাছওয়ালা তার মোছ খুলতে খুলতে বলল, ‘আমি কনটেন্ট ক্রিয়েটর, আজকে মাছওয়ালা সেজে মাছ বেচতেছি। দেখি, কত টাকার মাছ বেচতে পারি।’